📘 তাতারীদের ইতিহাস > 📄 সকল কুফরি শক্তি এক ও অভিন্ন

📄 সকল কুফরি শক্তি এক ও অভিন্ন


আল্লাহ তা'আলার রীতি হলো, তিনি শক্তিধরদের মাঝে পরস্পর যুদ্ধ লাগিয়ে রাখেন। বিভিন্ন দল একে অপরকে প্রতিহত করতে থাকে। অনুরূপ শক্তিশালীরা তাদের পাশে দুর্বলদের অস্তিত্ব বরদাশত করতে পারে না। এটিও আল্লাহর নীতি যে, বাতেল ও ভ্রান্ত যত আকৃতিতেই তাদের আত্মপ্রকাশ করুক না কেন, তারা হকের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহর আরেকটি নীতি হলো, কেয়ামত পর্যন্ত হক ও বাতিলের সংঘাত চলতে থাকবে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক প্রবর্তিত উল্লেখিত অমোঘ নীতিমালাগুলোর আলোকে আমরা একথা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তাতার জাতি ও ক্রুশেড বাহিনী তাদের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একে অপরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা কোনো পরিকল্পিত বিষয় নয়; বরং সকল কুফরি শক্তি এক ও অভিন্ন!!

ক্রুশেডরা একদল শক্তিশালী সৈন্য ইউরোপ থেকে মঙ্গোলিয়া প্রেরণ করে। উদ্দেশ্য — মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাতারীদের সহযোগিতা করা, (ইউরোপ থেকে মঙ্গোলিয়ার দূরত্ব বারো হাজার কিলোমিটারের বেশি) আব্বাসী খেলাফতকে ধ্বংস করা এবং তৎকালীন বিশ্বের ইসলামী প্রাণকেন্দ্র বাগদাদে অনুপ্রবেশ করা। তখন তারা তাতারীদের সামনে ইসলামী সাম্রাজ্যের শক্তি উল্লেখ করে তাদের এই আশ্বাস প্রদান করে যে, ক্রুশেড বাহিনী মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সহযোগিতা প্রদান করবে এবং তাদের পক্ষে গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করবে। এতে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করতে এবং তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে তারা আরও প্ররোচিত হয়।

আহ! ক্রুশেড বাহিনীর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হলো। আব্বাসী খেলাফতের ওপর তাতারীদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ল। তাদের মুখের লালায় ভেসে গেল আব্বাসী খেলাফত। কল্যাণে ভরপুর বিপুল সম্পত্তির আধার, বিশাল বিস্তৃত আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে তারা সম্মিলিত প্রয়াসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখনো তাতারী বাহিনী ও ক্রুশেড বাহিনীর মাঝে পরস্পর বহু বিষয়ে দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিল। এমনকি পরবর্তী সময় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তারা পরস্পর বহুবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু যখন তারা (উভয় দল) মুসলমানদের মুখোমুখি হলো, ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে এক কাতারবদ্ধ হলো। এটি কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়; বরং এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাতেল দলগুলোর চিরায়ত রীতি।

এর পূর্বে ইহুদীরা মুশরিকদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সহযোগিতা করেছিল। অথচ তাদের পরস্পরে আকিদাগত শক্ত বিরোধ বিদ্যমান ছিল।

রোম ও পারস্যের মাঝে দীর্ঘ যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও চরম বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে পারসিকরা রোমানদের সহযোগিতা করেছিল।

ওসমানী সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করতে এবং ফিলিস্তিনের অধঃপতনের জন্য ইংল্যান্ড ইহুদীদের পক্ষপাতিত্ব করেছিল। ইহুদী খ্রিস্টানদের মাঝে চরম শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের বরকতময় ভূমিতে ইসরাঈলীদের বীজ বপনের জন্য ইংল্যান্ড ইহুদীদের সহযোগিতা করেছিল।

আর সাম্প্রতিককালে 'ইসলামী জঙ্গিবাদ' ধ্বংসের নামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাশিয়া আমেরিকাকে সাহায্য প্রদান করছে। ফলে রাশিয়া আফগানিস্তান, ইরাক ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে সাহায্য করছে এই উদ্দেশ্যে যে, আমেরিকা যেন রাশিয়াকে চেচনিয়ার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করে। উভয় স্থানেই মুসলমানরা তাদের বলিতে পরিণত হচ্ছে!!

বোঝা গেল, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাতেল শক্তির ঐক্য একটি প্রাচীনতম চিরায়ত রীতি।

কাজেই 'আমার শত্রু, না আমার বন্ধু' এ জাতীয় দ্বন্দ্বে না থেকে কে শত্রু কে মিত্র, তা ভালোভাবে জানা দরকার এবং শত্রুর শত্রুকেও চেনা আবশ্যক। কারণ, কখনো শত্রুর শত্রুরাও শত্রুতে পরিণত হয়। তবে হ্যাঁ, নির্দিষ্ট মেয়াদে বিশেষ উদ্দেশ্যে কখনো কখনো মুসলমান ও শত্রুদের মাঝে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন হয়েছিল। তবে মনে রাখবেন, তা ছিল শিথিলতা বিবর্জিত, মুসলমানদের হক আদায়ে অকুণ্ঠ, পূর্ণ সজাগ-সতর্ক এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। মুসলমানদের এরূপ সম্পাদিত সন্ধি কখনো বন্ধুত্বে পরিণত হয়নি এবং তারা কখনো মুসলমানদের অধিকার ও হক ভুলে যায়নি। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন—

وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ

“(হে নবী,) ইহুদী ও খ্রিস্টানরা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশি হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে।"১২

একসময় তাতারীরা মুসলিম সাম্রাজ্য দখল করার জন্য গভীর চিন্তা-গবেষণা শুরু করল এবং আব্বাসী খেলাফত ধ্বংস করার এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী বাগদাদে প্রবেশের ছক আঁকতে শুরু করল।

টিকাঃ
১২ সুরা বাকারা: ১২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00