📄 ১. আব্বাসী শাসনামল
আব্বাসী শাসনামল ছিল মুসলিমবিশ্বের প্রাচীনতম শাসনামল। ১৩২ হিজরীতে উমাইয়া শাসনামলের অধঃপতনের পর আব্বাসী শাসনামল শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর আব্বাসী শাসন হিজরী সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। বস্তুত তখন ইরাক ব্যতীত অন্য কোনো অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব ছিল না। ১৩২ হিজরীতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদকেই আব্বাসী শাসনের শাসনাধীন অঞ্চল মনে করা হতো। তা ছাড়া তখন বাগদাদের চারপাশে আরও আট-দশটি শক্তির উত্থান ঘটেছিল, যারা ইসলামী খেলাফতের অনুগামী ছিল না। তবে তারা স্পষ্টভাবে আব্বাসী খেলাফতের বিরোধিতার ঘোষণাও করত না। আপনি চাইলে বলতে পারেন, আব্বাসী খেলাফত তখন বাহ্যত খেলাফতের আকৃতি ধারণ করেছিল, মূলত তা খেলাফত ছিল না। আব্বাসী খেলাফত সেই প্রতিচ্ছবির আকার ধারণ করেছিল, মুসলমানরা যা স্থায়ী হওয়ার কামনা করত। যদিও তখন তার উল্লেখযোগ্য কোনো সাম্রাজ্য ছিল না। যেমন বর্তমানে ইংল্যান্ডে ইংরেজ জাতির রাজত্ব ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবির আকার ধারণ করেছে, রাজতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। পক্ষান্তরে আব্বাসী খলিফা ইরাকের উত্তর অংশ ব্যতীত কার্যত ইরাক অঞ্চলের রাজত্ব পরিচালনা করত।
ইরাক ভূখণ্ডে বনি আব্বাসের খলিফাগণ পর্যায়ক্রমে একের পর এক রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। তারা 'খলিফা' নামক মহান উপাধি ধারণ করতেন। কিন্তু হিজরী সপ্তম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে আর কখনো তারা এই উপাধি ধারণ করেননি এবং এই মহান উপাধিতে ভূষিত হওয়ার কোনো মনোবাসনা তারা রাখতেন না। ধন-সম্পত্তি পুঞ্জিভূতকরণ ও গোটা দুনিয়া ছেড়ে ইরাকের নির্দিষ্ট একখণ্ড ভূমিতে নিজেদের রাজত্বকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরাই ছিল তাদের একমাত্র মনোবাসনা ও আকাঙ্ক্ষা। তারা একবারের জন্যও নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের দিকে বিশুদ্ধ চোখে তাকায়নি। এ বিষয়ে তাদের জ্ঞানও ছিল না যে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের আমানত পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, সৈন্যবাহিনীকে শক্তিশালী করা, প্রজাদের সম্মানের জীবনযাপন সুনিশ্চিত করা, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, নির্যাতিত নিপীড়িতদের হক আদায় করা, ক্ষতিপূরণ করা, অত্যাচারীদের শাস্তি প্রদান করা, প্রজাদের মাঝে আল্লাহর বিধান কায়েম করা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাপ্রদান করা এবং মানুষের হৃদয়ত্মাকে আল্লাহর একত্ববাদের গুণে গুণান্বিত করা।
তৎকালীন আব্বাসী খলিফাদের মাঝে উল্লেখিত গুণাবলি ছিল অবিদ্যমান। তারা ছিল দায়িত্ববোধহীন। রাজ-সিংহাসনকে যথাসাধ্য স্থায়ীকরণ ও নিজেদের উত্তরসূরিদের রাজত্বের ওয়ারিশ বানানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। অনুরূপ অঢেল ধন-সম্পত্তি ও বিরল দুর্লভ উপহার-উপঢৌকন সংগ্রহের প্রতি তারা ছিল অতি আগ্রহী। পাশাপাশি নৈশ পার্টিতে অংশগ্রহণ, গান-বাজনা, কাওয়ালি শ্রবণ ও খেল-তামাশায় অপব্যয় করার প্রতি তাদের আগ্রহ আসক্তি ছিল বলাবাহুল্য। শাসকবর্গ মুসলমানদের শাসক হওয়া তো দূরের কথা একজন সাধারণ মুসলমান হওয়ারও যোগ্য ছিল না। খেলাফতের ভাবমূর্তি পরিপূর্ণ বিলীন হয়েছিল। খলিফার উচ্চাভিলাষ হ্রাস পেয়েছিল।
📄 ২. মিশর সিরিয়া হেজাজ ইয়ামান
হিজরী সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে এ সমস্ত অঞ্চল সুলতান ছালাহ উদ্দীন আইয়ূবীর বংশধরদের দখলে ছিল। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, তারা তাদের মহান আদর্শ সুলতান ছালাহ উদ্দীনের গুণে গুণান্বিত ছিলেন না। যিনি ক্রুশেডবাহিনীকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করেছিলেন; বরং তারা রাজত্ব নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সুবিশাল আইয়ূবী সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন ছোট ছোট সাম্রাজ্যে বিভক্ত করে ফেলেছিল!!
ফলে সিরিয়া মিশর থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং হেজাজ ও ইয়ামান সিরিয়া ও মিশর থেকে পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। এমনকি সিরিয়া কয়েকটি দ্বন্দ্বমুখর ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। হিমস নগরী আলেপ্পো ও দামেস্ক থেকে পৃথক হয়ে যায়। অনুরূপ ফিলিস্তিন ও জর্দান পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সুলতান ছালাহ উদ্দীন আইয়ূবী যে সকল পুণ্যভূমিকে ক্রুশেডবাহিনীর হাত থেকে স্বাধীন করেছিলেন, এই বিভেদ সৃষ্টির পর সেগুলো বেশিদিন অক্ষত থাকেনি। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আলিইয়িল আজীম।
📄 ৩. পশ্চিমা বিশ্ব ও স্পেন
তৎকালীন পশ্চিমা বিশ্ব ও স্পেনেও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী মুসলমানদের রাজত্ব ছিল। তখন মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল সুবিশাল। পূর্বে লিবিয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমে মরক্কো, উত্তরে স্পেন থেকে শুরু করে দক্ষিণে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। এতদসত্ত্বেও এই সুবিশাল মুসলিম সাম্রাজ্য হিজরী সপ্তম শতাব্দীর শুরুলগ্নে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বিশেষত ৬০৯ হিজরীর ক্রুশেড যুদ্ধের পর মুসলিম সাম্রাজ্য পুরোপুরি প্রাণ হারিয়ে ফেলে।
📄 ৪. খাওয়ারেষম
খাওয়ারেযম সাম্রাজ্য ছিল দিগন্তবিস্তৃত। তা ছিল এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় মুসলিম সাম্রাজ্য। পূর্বে চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পশ্চিমে ইরান পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে বিস্তৃত। আব্বাসী সাম্রাজ্য ও খাওয়ারেযম সাম্রাজ্যের মাঝে শক্ত বিরোধ বিরাজমান ছিল। এই দুই সাম্রাজ্য একে অপরের ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল অবলম্বন করত। কখনো কখনো খাওয়ারেযম সাম্রাজ্য আদর্শিকভাবে শিয়া মতাদর্শীদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের মাঝে নানানরকম ফেতনা-ফ্যাসাদ, আন্দোলন ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। গৌরী, আব্বাসী ও অন্যান্য মুসলিম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তারা বহুবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।