📄 লেখকের ভূমিকা
إن الحمد لله، نحمده ونستعين به ونستهديه ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، إنه من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل الله فلا هادي له، أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأن محمداً عبده ورسوله، أما بعد...
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন সৃষ্টিজীবের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে পৃথিবী পরিচালনার এমন কতিপয় নীতিমালা স্থাপন করেছেন, যা অপরিবর্তনশীল। এসব নীতিমালার ভিত্তিতেই মানবজীবন টিকে থাকে এবং মানুষ নিজ কাজ-কর্ম ও চলাফেরায় এসব নীতিমালার ওপরই নির্ভর করে থাকে। যদি প্রত্যেক যুগ কিংবা প্রত্যেক স্থানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র নীতিমালা থাকত, তবে মানবজীবন অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত এবং পূর্ববর্তী সকল ইতিহাস ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো।
কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও কৃপায় ইতিহাস কখনো ধ্বংস হয় না; বরং গতকাল আপনার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে আজ তার পুনরাবৃত্তি ঘটে, আজ যা সংঘটিত হচ্ছে কাল তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে।
📄 ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি
সুতরাং পূর্ববর্তী ঘটনাসমূহ বারংবার পুনরাবৃত্ত হতে থাকে এবং বাহ্যত তা কখনো কখনো একই রকম হয়ে থাকে। যেন তা ভূ-পৃষ্ঠে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাই আমরা যখন ইতিহাস পাঠ করে এ কথা জানতে পারি যে, বর্তমান সময়ের কোনো ঘটনা পূর্ববর্তী কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল, তখন আমাদের পক্ষে ঘটনাটির শেষ পরিণতি ও ফলাফল উদ্ঘাটন করা সম্ভব। সুতরাং সংঘটিত ঘটনাটি যদি কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক হয়, তবে আমরা সেই পথ ও পন্থা অবলম্বন করব, যেই পথে পরিচালিত হয়েছেন পূর্ববর্তীগণ।
পক্ষান্তরে সংঘটিত ঘটনাটি যদি লজ্জাজনক, অশুভ ও পরাজয়মূলক হয়, তবে আমরা পূর্ববর্তীদের ভুল কর্মপন্থা থেকে বিরত থাকব এবং তাদের পরাজয় ও লজ্জার পথ পরিহার করব।
এই পদ্ধতিতে ইতিহাস পাঠ করলে ইতিহাস প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে ওঠে। আপনি ইতিহাস পাঠ করবেন প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার জন্য; কেবল সান্ত্বনালাভ কিংবা ইতিহাসবিদ হওয়ার জন্য ইতিহাস পাঠ করবেন না। এই পদ্ধতিতে ইতিহাস পাঠের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হলো ইতিহাসের ফাঁকে ফাঁকে ছত্রে ছত্রে ইবরত ও শিক্ষা অনুসন্ধান করা। এই বিষয়টি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন কোরআনে কারীমে এভাবে এরশাদ করেন-
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
'নিশ্চয় তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে শিক্ষা গ্রহণের উপাদান।'৪
এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা কোরআনে কারীমের এক-তৃতীয়াংশে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। যাতে পূর্ববর্তী জাতিদের সঙ্গে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রীতিনীতি সম্পর্কে মুসলমানগণ অবগত হন এবং একথা নিশ্চিত বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা'আলার এ সকল রীতিনীতি অবধারিত ও অপরিহার্য। এর ফলে তারা কোনো ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার পরিণাম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে এবং তা থেকে উপকৃত হতে পারবে। তবে প্রতিটি ঘটনা যাবতীয় দিক পাঠ করা এবং তা দিয়ে উপকৃত হওয়ার এবং শিক্ষা গ্রহণের এই মহামূল্যবান দক্ষতা অর্জন অসম্ভব। এ কারণেই মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
'সুতরাং (হে নবী,) তুমি তাদের এসব ঘটনা শোনাতে থাকো, যাতে তারা কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করে।'৫
বক্ষ্যমাণ কিতাবটিতে আমাদের সামনে রয়েছে মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইতিহাস; বরং এভাবে বললে অত্যুক্তি হবে না যে, সর্বদিক বিবেচনায় পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আমাদের সামনে বিদ্যমান।
তা হলো হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে ভূপৃষ্ঠে আবির্ভূত একটি শক্তিধর নব পরাশক্তির উত্থানের ইতিহাস। এই পরাশক্তির আবির্ভাব পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন সাধন করে, বিশেষত মুসলিম সাম্রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে।
টিকাঃ
৪ সুরা ইউসুফ: ১১১।
৫ সুরা আ'রাফ: ১৭৬।
📄 যেই পরাশক্তির নাম তাতারী সাম্রাজ্য
আপনি যেভাবেই তুলনা করুন না কেন, বস্তুত তাতারী ইতিহাস এমন এক ইতিহাস, ইতিহাসশাস্ত্রে যদি তা সংরক্ষিত না থাকত এবং পৃথিবীর অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে যদি তার কোনোরূপ মিল না থাকত, তাহলে আমরা তাতারীদের ইতিহাসকে কল্পনাপ্রসূত কিংবা কল্পনার ঊর্ধ্বে মনে করতাম।
সত্যিই তাতারীদের ইতিহাস এক বিস্ময়কর ইতিহাস। কারণ, সে সময় খুব অল্প সময়ে একটি দুর্বল জাতি পৃথিবীর পরাশক্তিতে পরিণত হয় অথবা একটি পরাশক্তি দুর্বল জাতিতে পরিণত হয়। মাত্র কয়েক বছরের মাঝে আল্লাহ রব্বুল আলামীন একটি সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করেন এবং আরেকটি সাম্রাজ্যকে অপদস্থ করেন। অতঃপর কয়েক বছর অতিবাহিত হতে না-হতেই পূর্ববর্তী সম্মানিত সাম্রাজ্যকে অপদস্থ করেন এবং দ্বিতীয় জাতিকে সম্মানিত করেন!!
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“(হে নবী,) বলো, হে আল্লাহ, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক! তুমি যাকে চাও ক্ষমতা প্রদান করো, যার থেকে চাও ক্ষমতা কেড়ে নাও। যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করো এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করো। সমস্ত কল্যাণ তোমারই হাতে। নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।"৬
সংখ্যাধিক্যের অতিশয়তার দিক থেকেও তাতারীদের ইতিহাস অতি বিস্ময়কর। যথা—নিহতের সংখ্যা, সৈন্যসংখ্যা, অধঃপতিত শহরের সংখ্যা, দখলকৃত বিস্তীর্ণ ভূমির সংখ্যা এবং জুলুম ও অত্যাচারের সংখ্যা ইত্যাদি।
অনুরূপ তাতারীদের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যকার পূর্ণাঙ্গ সামঞ্জস্যের দিক থেকেও তাতারীদের ইতিহাস অতি আশ্চর্যজনক।
সুবহানাল্লাহ!
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন পৃথিবী পরিচালনার রীতিনীতি এবং ইতিহাস পুনরাবৃত্তির রহস্য স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। ফলে বর্তমান সময়ের সংঘটিত ঘটনাসমূহকে হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ বানিয়েছেন। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করলে অন্যান্য ঘটনার সঙ্গেও আমরা বর্তমান পৃথিবীর মিল খুঁজে পাব।
এ কারনেই ইতিহাসের পাঠকমাত্রই খুব সহজে ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারে এবং ভূপৃষ্ঠ ও সৃষ্টিজীব পরিচালনায় মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের রীতিনীতি উদ্ঘাটন করতে পারে।
তাতারীদের ইতিহাস সবিস্তার আলোচনা করা এবং তাতারী জাতির সকল দিক উল্লেখ করা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটির উদ্দেশ্য নয়; কারণ এতে গ্রন্থ দীর্ঘাকার ধারণ করবে; বরং আমি কেবল শিক্ষণীয় ঘটনাবলি, সেকাল ও একালের সামঞ্জস্যপূর্ণ দিক এবং দ্রুত অধঃপতন ও সাহায্য লাভের কারণসমূহ আলোচনা করব। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়াশুনা করতে ইচ্ছুক, সে যেন এ বিষয়ে লিখিত ইতিহাসশাস্ত্রের বিশাল ও বিপুল তথ্যসমগ্রের শরণাপন্ন হয়, যা দিয়ে ইসলামী পাঠাগারসমূহ ভরপুর।
আল্লাহ রব্বুল আলামীনের কাছে আমি দোয়া করি, তিনি যেন এই বিস্ময়কর ইতিহাসের প্রতিটি পাতা, প্রতিটি বাক্য; এমনকি প্রতিটি অক্ষরের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত করেন। -আমীন ॥
টিকাঃ
৬ আলে ইমরান: ২৬।