📄 নেক কাজ এবং গোনাহের ইচ্ছার উপর পুরস্কার
যাইহোক, এ হাদীসের সার কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলার দরবারে আত্মার চিন্তার উপর পাকড়াও করা হবে না। কারণ, আল্লাহর রহমত বিস্ময়কর। তিনি গোনাহের বিষয়ে এই মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন যে, যদি অন্তরে গোনাহ করার আগ্রহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং মনে মনে ইচ্ছাও করে যে, আমি এই গোনাহ করবো, তবে সে ইচ্ছা সংকল্প ও পোক্ত না হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলার দরবারে তার জন্য পাকড়াও করা হবে না। বরং যদি বারবার গোনাহের খেয়াল আসতে থাকে আর মানুষ সেই খেয়ালকে প্রতিহত করতে থাকে এবং সে অনুপাতে আমল না করে তাহলে ইনশাআল্লাহ গোনাহ না করার কারণে আল্লাহ তা'আলার কাছে ছওয়াব ও পুরস্কার লাভ হবে। কারণ, গোনাহের চিন্তা জাগা সত্ত্বেও সে গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করেছে। এবং নেকীর বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার মূলনীতি এই যে, যদি কোনো নেক কাজের চিন্তা অন্তরে জাগে এবং তা করতে ইচ্ছা করে যে, আমি অমুক নেক কাজটি করবো, যদিও নেক কাজটি করার জন্য পোক্ত ইরাদা করেনি, তবুও শুধু ইচ্ছা করার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাকে ছওয়াব দান করবেন। যেমন ইচ্ছা করলো যে, আমার যদি মাল হয় তাহলে আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় এ পরিমাণ মাল দান করবো। তো এর জন্যেও তাকে ছওয়াব দেওয়া হবে। বা ইচ্ছা করলো যে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সুযোগ হলে জিহাদ করে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবো। তো এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাকেও শহীদদের মধ্যে গণ্য করবেন। হাদীস শরীফে এসেছে,
مَنْ سَئَلَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ بَلَغَهُ اللَّهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ
'কোনো ব্যক্তি যদি আত্মা থেকে শাহাদাত কামনা করে যে, হে আল্লাহ! আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে শহীদদের মধ্যেই গণ্য করবেন, যদিও বিছানাতে তার মৃত্যু হয়।"
যাইহোক, নেক কাজের ব্যাপারে নিয়ম হলো, পোক্ত ইরাদা করার পূর্বেও আল্লাহ তা'আলা নেকী দান করেন এবং গোনাহের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, পোক্ত ইরাদা না করা পর্যন্ত পাকড়াও করা হবে না। এটা আল্লাহ তা'আলার রহমতের ব্যাপার।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫৩২, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৫৭৭, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩১১১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১২৯৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৭৮৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২১০৯৪
📄 বিভিন্ন চিন্তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত
যাইহোক, গোনাহের পোক্ত ইরাদা করা থেকে বাঁচা উচিত। কিন্তু গোনাহের যে সব ওয়াসওয়াসা ও চিন্তা আসে তার পরোয়া করা উচিত নয়। বরং নিজের কাজে লেগে থাকা উচিত। এসব চিন্তার কারণে কাজ ছেড়ে দিবে না। হযরত রহ. বলতেন যে, এসব চিন্তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন এক ব্যক্তিকে বাদশা দাওয়াত দিলো। এখন এই ব্যক্তি দ্রুত বাদশার সাক্ষাতে যাচ্ছে। কোনো ব্যক্তি যদি সে সময় তার জামায় পাড়া দেয় বা হাত ধরে তাকে চলার পথে বাধা দেয় এবং তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করে, তাকে উত্ত্যক্ত করে, তাহলে বলুন, এ ব্যক্তি কি যারা তাকে পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে তাদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হবে, না তার সফর অব্যাহত রাখবে? এ ব্যক্তি যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় তাহলে কখনোই বাদশার দরবারে পৌঁছতে সক্ষম হবে না। আর যদি সে এ কথা চিন্তা করে যে, এ লোক তো পাগল, বেওকুফ, সে আমার রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, আমাকে তো এখনই বাদশার দরবারে যেতে হবে এবং তার সাথে সাক্ষাতের মর্যাদা লাভ করতে হবে, তাহলে সে ওদিকে মনযোগই দিবে না।
📄 ইচ্ছা করে চিন্তা নিয়ে আসা গোনাহ
হযরত থানভী রহ.-কে এক ব্যক্তি চিঠিতে লেখে যে, হযরত! আমি যখন নামাযে দাঁড়াই তখন বিভিন্ন ধরনের চিন্তা আসতে থাকে এবং এ কারণে পেরেশানী হয় যে, আমার নামায তো কিছুই হয় না। হযরত তার উত্তরে লেখেন যে, চিন্তা আসা গোনাহ নয়, চিন্তা আনা গোনাহ। অর্থাৎ, যদি ঐ সব চিন্তা নিজে নিজে আসে তবে এটা গোনাহ নয়। জেনে বুঝে ইচ্ছা করে অন্তরে চিন্তা আনা এটা গোনাহ।
📄 বিভিন্ন চিন্তা আসার প্রতিকার
বিভিন্ন চিন্তা ও ওয়াসওয়াসা আসার প্রতিকার এই যে, এসব চিন্তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না এবং মনযোগ দিবে না। যখন মনযোগ দিবে না তখন ইনশাআল্লাহ এসব চিন্তা আপনা আপনি দূর হয়ে যাবে। নিজের কাজ করতে থাকবে। যখন নামাযের নিয়ত বাঁধবে তখন নিজের মনকে নামাযের দিকে ধাবিত করবে। হযরত থানভী রহ. তাঁর ওয়ায ও মালফুযাতে এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নামায সত্ত্বাগতভাবেই কাম্য। এজন্য যদি অনিচ্ছাকৃত চিন্তা আসতে থাকে তো এ কারণে নামাযের অবমূল্যায়ন করো না। বেশিরভাগ নামাযী প্রশ্ন করে থাকে যে, আমরা নামায পড়ি, কিন্তু নামাযের মধ্যে মজাই আসে না। বা এরকম বলে থাকে যে, আগে তো নামাযের মধ্যে খুব স্বাদ উপভোগ হতো, এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। তার উত্তর এই যে, ভাই! নামায এ জন্য ফরয করা হয়নি যে, এর মধ্যে আপনি মজা পাবেন, স্বাদ উপভোগ করবেন। বরং এটা তো আল্লাহ তা'আলার ইবাদত এবং বন্দেগীর একটি তরীকা। তাই নামাযের মধ্যে স্বাদ উপভোগ হলে তা আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত। আর যদি স্বাদ উপভোগ না হয় তাহলে এ কারণে নামাযের ফযীলত মোটেও কম হবে না। আপনি যদি নামাযের রুকন, শর্ত ও আদবসমূহ পূরণ করেন এবং সুন্নাত মোতাবেক নামায আদায় করেন তাহলে সারাজীবনেও স্বাদ উপভোগ না হলে আপনার কোনো ক্ষতি নেই। নামাযের মধ্যে স্বাদ উপভোগ হলেও নামায পড়তে হবে এবং স্বাদ উপভোগ না হলেও নামায পড়তে হবে।