📄 ইসলাহের একটি পদ্ধতি
কিন্তু কোনো মানুষ ইসলাহের উদ্দেশ্যে আসলে তখন তাকে ধরতেন। মোটকথা, সে ব্যক্তি এসে কথা বলতে আরম্ভ করতো। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বিনম্রভাবে তার কথা শুনতেন। একদিন সে ব্যক্তি এসে হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের নিকট বায়াতের আবেদন করলো যে, হযরত আমি আপনার সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক করতে চাই। আমার জন্য কোনো ওযীফা এবং কোনো তাসবীহ বলে দিন। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, তোমার জন্য কোনো ওযীফা এবং কোনো তাসবীহ নেই। তোমার কাজ হলো, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো। এর উপর তালা লাগাও। তুমি যে সবসময় কথা বলতে থাকো, তোমার জিহ্বা থামে না, এটা ঠিক নয়। আগামীতে যখনই আসবে একেবারে চুপ করে বসে থাকবে। কোনো কথাই মুখ দিয়ে বের করবে না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ঐ ব্যক্তির উপর তো কিয়ামত বয়ে যায়। তার জন্য চুপ করে বসে থাকার এই মুজাহাদা হাজার মুজাহাদার চেয়েও কঠিন ছিলো। এখন বার বার তার মনের মধ্যে কথা বলার চাহিদা সৃষ্টি হয়, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সে চুপ থাকতে বাধ্য হয়। এই চিকিৎসার ফলে আল্লাহ তা'আলা তার তরীকতের পুরো পথ অতিক্রম করিয়ে দেন। কারণ, হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বুঝেছিলেন যে, তার মূল রোগ এটাই। যখন এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আসবে তখন সব কাজ সহজ হয়ে যাবে। সুতরাং কিছুদিন পর আল্লাহ তা'আলা তাকে অনেক উপরে পৌছে দেন। প্রত্যেকের রোগ ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্য মুরীদের অবস্থা দেখে শাইখ চিকিৎসা নির্ধারণ করেন যে, তার জন্য কোন চিকিৎসা উপকারী। যাইহোক, কথা কম বলাও একটা মুজাহাদা।
📄 কম ঘুমানোও মুজাহাদা
তৃতীয় মুজাহাদা হলো কম ঘুমানো। পূর্ব যুগে না ঘুমানোর মুজাহাদা করা হতো। সুতরাং প্রসিদ্ধ আছে যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. ইশার ওযু দিয়ে ফজরের নামায পড়তেন। কিন্তু বুযুর্গগণ বলেন, কম ঘুমানোর সীমানা হলো মানুষের দিন রাতে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা অবশ্যই ঘুমানো উচিত। ৬ ঘণ্টার চেয়ে কম করবে না। অন্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং হযরত থানভী রহ. বলতেন, অসময়ে ঘুমানোর যদি অভ্যাস থাকে তাহলে তা বন্ধ করে দিবে। এটাও কম ঘুমানোর অন্তর্ভুক্ত। এটাও মুজাহাদা।
📄 মানুষের সাথে সম্পর্ক কমানো
চতুর্থ মুজাহাদা হলো মানুষের সাথে মেলামেশা কমানো। কারণ, মানুষের সম্পর্ক যতো বাড়ে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ততো বাড়ে। অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেখে নাও। আজকাল তো সম্পর্ক বাড়ানো যথানিয়মে একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যাকে পাবলিক রিলেশন বলা হয়। যার উদ্দেশ্য হলো, মানুষের সাথে অধিক সম্পর্ক গড়ো, নিজের ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব বিস্তার করো এবং নিজের কাজ হাসিল করো। কিন্তু আমাদের বুযুর্গগণ বলতেন, অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক বাড়াবে না, বরং কমাবে।
📄 দিল একটি আয়না
আল্লাহ তা'আলা মানুষের আত্মাকে একটি আয়না স্বরূপ বানিয়েছেন। যেই ছবি মানুষের সামনে অতিবাহিত হয় তার প্রতিচ্ছবি অন্তরে বসে যায়। মানুষের সাথে সম্পর্ক যখন বৃদ্ধি পায়, তখন তার সামনে ভালো মানুষও আসে, খারাপ মানুষও আসে। খারাপ কাজে লিপ্ত মানুষের সঙ্গে মিলিত হলে তার প্রতিবিম্ব মানুষের অন্তরে পড়ে। এতে আত্মা খারাপ হয়ে যায়। এজন্য বলেন যে, অন্য মানুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মিশবে না। অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক যতো কম হবে আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সম্পর্ক ততো বৃদ্ধি পাবে। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
تعلق حجاب است و بی حاصلی چون پیوند با کسلی و اصلی
অর্থাৎ, মাখলুকের সাথে অধিক সম্পর্ক আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্ক কায়েম করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক ও পর্দা। দুনিয়ার মহব্বত যতো বৃদ্ধি পাবে এর সঙ্গে মহব্বত, ওর সঙ্গে মহব্বত, আল্লাহ তা'আলার সাথে মহব্বত ততো কমে যাবে। তবে বান্দার যেসব হক রয়েছে তা অবশ্যই আদায় করবে। তার মধ্যে ত্রুটি করবে না। কিন্তু বিনা কারণে সম্পর্ক বাড়ানো উচিত নয়। এরই নাম হলো কম মেলামেশা করা।
যাইহোক, এসব মুজাহাদা এজন্য করানো হয়, যাতে আমাদের প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নাজায়েয কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা ছেড়ে দেয়। এজন্য প্রত্যেক মানুষের এসব মুজাহাদা করা উচিত। মুজাহাদা কোনো রাহবারের তত্ত্বাবধানে করা উত্তম। নিজের মর্জি মতো এবং নিজের সিদ্ধান্ত মোতাবেক করা ঠিক নয়। কারণ, মানুষ যদি নিজেই সিন্ধান্ত গ্রহণ করে যে, সে কতটুকু খাবে আর কতটুকু খাবে না, কতটুকু ঘুমাবে আর কতটুকু ঘুমাবে না, কতো মানুষের সাথে মেলামেশা করবে, আর কতো মানুষের সাথে মেলামেশা করবে না। তাহলে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিবে। কিন্তু যখন কোনো রাহবারের পথ প্রদর্শনে এ কাজ করবে তখন ইনশাআল্লাহ এর উপকারিতা লাভ হবে এবং প্রত্যেক কাজ ভারসাম্যের মধ্যে হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ