📄 মেহমানের সাথে কথা বলা সুন্নাত
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর নিকট এক ব্যক্তি আসতেন। সে কথা বলতে খুব পছন্দ করতো। যখনই আসতো তখনই এদিক সেদিকের কথা শুরু করে দিতো এবং থামতো না। আমাদের সব বুযুর্গেরই নিয়ম ছিলো যখন কোনো মেহমান তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতো তাকে তারা ইকরাম করতেন, তার কথা শুনতেন এবং যথাসাধ্য তার চাহিদা পুরা করার চেষ্টা করতেন। একজন ব্যস্ত মানুষের জন্য এ কাজ খুব কঠিন। যাদের কাজ ব্যস্ততায় ভরা তারা বুঝবেন যে, এ কাজ কতো কঠিন। কিন্তু হাদীস শরীফে এসেছে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম এই ছিলো যে, যখন তাঁর নিকট কেউ সাক্ষাৎ করতে আসতো এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করতো তখন তিনি অন্যদিকে মুখ ফেরাতেন না। সে নিজে মুখ না ফেরানো পর্যন্ত তার কথা শুনতে থাকতেন। সুতরাং হাদীস শরীফের শব্দ হলো-
حَتَّى يَكُونَ هُوَ الْمُنْصَرِفُ
'সে নিজে চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।”
এ কাজটি খুবই কঠিন। কারণ, কতক মানুষ লম্বা কথা বলতে অভ্যস্ত হয়। তাদের কথা পুরা মনযোগ সহকারে শোনা এক কঠিন কাজ। কিন্তু হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণে আমাদের বুযুর্গগণ আগমনকারীদের কথা শুনতেন এবং তাদেরকে পরিতৃপ্ত করতেন。
টিকাঃ
১. আশশামাইলুল মুহাম্মাদিয়া, ইমাম তিরমিযী কৃত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৭৭, হাদীস নং ৩৩১, কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা-১৬৪, হাদীস নং ১৮৫৩৫, আশশিফা বি-তা'রীফি হুকুকিল মুস্তাফা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১২০, দালাইলুন নুবুওয়্যাত, বাইহাকী কৃত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৬৯, শু'আবুল ঈমান, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৫৪, আল মু'জামুল কাবীর, তবরানী কৃত, খণ্ড-১৬, পৃষ্ঠা-৩০
📄 ইসলাহের একটি পদ্ধতি
কিন্তু কোনো মানুষ ইসলাহের উদ্দেশ্যে আসলে তখন তাকে ধরতেন। মোটকথা, সে ব্যক্তি এসে কথা বলতে আরম্ভ করতো। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বিনম্রভাবে তার কথা শুনতেন। একদিন সে ব্যক্তি এসে হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের নিকট বায়াতের আবেদন করলো যে, হযরত আমি আপনার সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক করতে চাই। আমার জন্য কোনো ওযীফা এবং কোনো তাসবীহ বলে দিন। হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, তোমার জন্য কোনো ওযীফা এবং কোনো তাসবীহ নেই। তোমার কাজ হলো, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো। এর উপর তালা লাগাও। তুমি যে সবসময় কথা বলতে থাকো, তোমার জিহ্বা থামে না, এটা ঠিক নয়। আগামীতে যখনই আসবে একেবারে চুপ করে বসে থাকবে। কোনো কথাই মুখ দিয়ে বের করবে না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ঐ ব্যক্তির উপর তো কিয়ামত বয়ে যায়। তার জন্য চুপ করে বসে থাকার এই মুজাহাদা হাজার মুজাহাদার চেয়েও কঠিন ছিলো। এখন বার বার তার মনের মধ্যে কথা বলার চাহিদা সৃষ্টি হয়, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সে চুপ থাকতে বাধ্য হয়। এই চিকিৎসার ফলে আল্লাহ তা'আলা তার তরীকতের পুরো পথ অতিক্রম করিয়ে দেন। কারণ, হযরত ওয়ালেদ ছাহেব বুঝেছিলেন যে, তার মূল রোগ এটাই। যখন এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আসবে তখন সব কাজ সহজ হয়ে যাবে। সুতরাং কিছুদিন পর আল্লাহ তা'আলা তাকে অনেক উপরে পৌছে দেন। প্রত্যেকের রোগ ভিন্ন হয়ে থাকে। এজন্য মুরীদের অবস্থা দেখে শাইখ চিকিৎসা নির্ধারণ করেন যে, তার জন্য কোন চিকিৎসা উপকারী। যাইহোক, কথা কম বলাও একটা মুজাহাদা।
📄 কম ঘুমানোও মুজাহাদা
তৃতীয় মুজাহাদা হলো কম ঘুমানো। পূর্ব যুগে না ঘুমানোর মুজাহাদা করা হতো। সুতরাং প্রসিদ্ধ আছে যে, ইমাম আবু হানিফা রহ. ইশার ওযু দিয়ে ফজরের নামায পড়তেন। কিন্তু বুযুর্গগণ বলেন, কম ঘুমানোর সীমানা হলো মানুষের দিন রাতে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা অবশ্যই ঘুমানো উচিত। ৬ ঘণ্টার চেয়ে কম করবে না। অন্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং হযরত থানভী রহ. বলতেন, অসময়ে ঘুমানোর যদি অভ্যাস থাকে তাহলে তা বন্ধ করে দিবে। এটাও কম ঘুমানোর অন্তর্ভুক্ত। এটাও মুজাহাদা।
📄 মানুষের সাথে সম্পর্ক কমানো
চতুর্থ মুজাহাদা হলো মানুষের সাথে মেলামেশা কমানো। কারণ, মানুষের সম্পর্ক যতো বাড়ে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ততো বাড়ে। অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেখে নাও। আজকাল তো সম্পর্ক বাড়ানো যথানিয়মে একটি শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যাকে পাবলিক রিলেশন বলা হয়। যার উদ্দেশ্য হলো, মানুষের সাথে অধিক সম্পর্ক গড়ো, নিজের ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব বিস্তার করো এবং নিজের কাজ হাসিল করো। কিন্তু আমাদের বুযুর্গগণ বলতেন, অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক বাড়াবে না, বরং কমাবে।