📄 অধিক আহারের মাতলামী
এমনভাবে পেট পুরে খাওয়া যে, পেটে আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকে না, ফিকহের দৃষ্টিতে যদিও নাজায়েয ও হারাম নয়, কিন্তু এটা মানুষের জন্য দৈহিক ও আত্মিক অনেক রোগ সৃষ্টির কারণ। কারণ, যতো নাফরমানী ও গোনাহের কাজ আছে, সব ভরাপেটে মাথায় আসে। পেট ভরা না থাকলে গোনাহ ও নাফরমানীর কথা মাথায় ঢুকবে না। এজন্য হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, পরিপূর্ণ খাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাবে। এরই নাম হলো কম খাওয়ার মুজাহাদা।
📄 জিহ্বার গোনাহ থেকে বেঁচে যাবে
দ্বিতীয় বিষয় হলো, কম কথা বলা। সকাল থেকে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের জিহ্বা কেঁচির মতো চলতেই থাকে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যা মুখে আসছে; বলছি। এটা ঠিক নয়। এ জন্য জিহ্বাকে লাগাম না লাগানো এবং নিয়ন্ত্রণ না করা পর্যন্ত সে গোনাহ করতে থাকবে। মনে রাখবেন! হাদীস শরীফে এসেছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
'মানুষকে অধঃমুখে জাহান্নামে ফেলার জিনিস হলো এই জিহ্বা।" এ জন্য জিহ্বাকে মুক্ত ছাড়া হলে এবং তাকে বাধা দেওয়া না হলে এ জিহ্বা মিথ্যা বলবে, গীবত করবে, মানুষকে কষ্ট দিবে। কথা দ্বারা মানুষকে কষ্ট দিবে। এসব গোনাহের কারণে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে。
জিহ্বার গোনাহ থেকে বেঁচে যাবে
এ জন্য মানুষকে কথা কম বলার মুজাহাদা করতে হয়। জিহ্বা দিয়ে অহেতুক কথা বলবে না। প্রয়োজন মোতাবেক কথা বলবে এবং কথা বলার পূর্বে চিন্তা করবে যে, এ কথা বলা আমার জন্য সমীচীন কি না? এটা তো কোনো গোনাহের কথা নয়? বিনা কারণে কথা বলা থেকে বিরত থাকবে। এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ কথা কম বলায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তখন কথা বলতে মন চাইবে, কিন্তু নিজের কামনা বাসনাকে দমন করার ফলে তার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে, এখন সে মিথ্যা বলা, গীবত করা এবং অন্যান্য গোনাহে লিপ্ত হবে না。
টিকাঃ
১. আল মু'জামুল কাবীর, খণ্ড-১৫, পৃষ্ঠা-১৪, হাদীস নং ১৬৬২৬
📄 বৈধ বিনোদনের অনুমতি
অহেতুক আসর জমানো, যাকে বর্তমান পরিভাষায় গল্প-শল্প বলা হয়। কোনো দোস্তের সাথে সাক্ষাত হলো, ব্যস তাকে বললো, আসো, একটু গল্প করি। এই গল্পের আসর অবশ্যই মানুষকে গোনাহের দিকে নিয়ে যায়। হ্যাঁ, শরীয়ত আমাদেরকে অল্প-বিস্তর বিনোদনেরও অনুমতি দিয়েছে। বরং শুধু অনুমতিই নয় বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
رَوْحُوا الْقُلُوبَ سَاعَةً فَسَاعَةً
'আত্মাসমূহকে কিছু বিরতি দিয়ে আরাম দাও।”
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার উপর জীবন কোরবান করুন। আমাদের মেজাজ, আমাদের প্রকৃতি, আমাদের প্রয়োজন তাঁর চেয়ে বেশি আর কে চেনে? তিনি জানতেন, মানুষকে যদি বলা হয় আল্লাহর যিকির ছাড়া কিছু করো না, সারাক্ষণ কেবল যিকিরের মধ্যে মশগুল থাকো, তাহলে মানুষ তা করতে পারবে না। কারণ এরা তো ফেরেশতা নয়, এরা তো মানুষ। এদের কিছুটা আরামেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিছুটা বিনোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য বিনোদনের উদ্দেশ্যে কোনো কথা বলা, হাসি মজাক করা শুধু জায়েযই নয়, বরং পছন্দনীয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। কিন্তু এর মধ্যে অধিক ডুবে যাওয়া, এর জন্য ঘণ্টাকে ঘণ্টা বরবাদ করা, মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করা তো মানুষকে অবশ্যই গোনাহের দিকে নিয়ে যাবে। এজন্য বলা হচ্ছে, তোমরা কম কথা বলার অভ্যাস করো, এটাও একটা মুজাহাদা。
টিকাঃ
১. কানযূর উম্মাল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩৭, হাদীস নং ৫৩৫৪, কাশফুল খফা, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩৮৩, হাদীস নং ১৪০০, সবুলুল হুদা অর রশাদ ফী সীরাতিল খায়রিল 'ইবাদ, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩৯৪, জামেউ বায়ানিল 'ইলমি ওয়া ফাযলিহী, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৮, হাদীস নং ৪৮৩, জামেউল আহাদীস, খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-১৪৮, হাদীস নং ১২৭৮৯
📄 মেহমানের সাথে কথা বলা সুন্নাত
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর নিকট এক ব্যক্তি আসতেন। সে কথা বলতে খুব পছন্দ করতো। যখনই আসতো তখনই এদিক সেদিকের কথা শুরু করে দিতো এবং থামতো না। আমাদের সব বুযুর্গেরই নিয়ম ছিলো যখন কোনো মেহমান তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতো তাকে তারা ইকরাম করতেন, তার কথা শুনতেন এবং যথাসাধ্য তার চাহিদা পুরা করার চেষ্টা করতেন। একজন ব্যস্ত মানুষের জন্য এ কাজ খুব কঠিন। যাদের কাজ ব্যস্ততায় ভরা তারা বুঝবেন যে, এ কাজ কতো কঠিন। কিন্তু হাদীস শরীফে এসেছে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম এই ছিলো যে, যখন তাঁর নিকট কেউ সাক্ষাৎ করতে আসতো এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করতো তখন তিনি অন্যদিকে মুখ ফেরাতেন না। সে নিজে মুখ না ফেরানো পর্যন্ত তার কথা শুনতে থাকতেন। সুতরাং হাদীস শরীফের শব্দ হলো-
حَتَّى يَكُونَ هُوَ الْمُنْصَرِفُ
'সে নিজে চলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।”
এ কাজটি খুবই কঠিন। কারণ, কতক মানুষ লম্বা কথা বলতে অভ্যস্ত হয়। তাদের কথা পুরা মনযোগ সহকারে শোনা এক কঠিন কাজ। কিন্তু হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণে আমাদের বুযুর্গগণ আগমনকারীদের কথা শুনতেন এবং তাদেরকে পরিতৃপ্ত করতেন。
টিকাঃ
১. আশশামাইলুল মুহাম্মাদিয়া, ইমাম তিরমিযী কৃত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৭৭, হাদীস নং ৩৩১, কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা-১৬৪, হাদীস নং ১৮৫৩৫, আশশিফা বি-তা'রীফি হুকুকিল মুস্তাফা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১২০, দালাইলুন নুবুওয়্যাত, বাইহাকী কৃত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৬৯, শু'আবুল ঈমান, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৫৪, আল মু'জামুল কাবীর, তবরানী কৃত, খণ্ড-১৬, পৃষ্ঠা-৩০