📄 জায়েয কাজে মুজাহাদা কেন?
হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব ছাহেব রহ.-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে যে, হযরত এটা কেমন কথা যে, সূফীয়ায়ে কেরাম কতক জায়েয কাজেও বাধা দিয়ে থাকেন এবং সেগুলো ছাড়িয়ে থাকেন? অথচ আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে জায়েয সাব্যস্ত করেছেন। হযরত উত্তরে বললেন, দেখো! এর দৃষ্টান্ত এমন, যেমন এই কিতাবের পৃষ্ঠা। এটাকে মোড়াও। সে মোড়ালো। এর পর বললেন, এটাকে সোজা করো। এখন ঐ পৃষ্ঠা আর সোজা হচ্ছিলো না। অনেক চেষ্টা করা হলো কিন্তু ঐটা আবারো ঘুরে যাচ্ছিলো। তখন হযরত বললেন, একে সিধা করার পদ্ধতি এই যে, পৃষ্ঠাটাকে উল্টা দিকে মোড়াও। তাহলে সে সিধা হয়ে যাবে, সোজা হয়ে যাবে। অতঃপর বললেন, এই নফসের কাগজও গোনাহের দিকে ঘুরে আছে, নাফরমানীর দিকে ঘুরে আছে, একে যদি সোজা করতে চাও তাহলে সোজা হবে না। একে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দাও, অল্প একটু জায়েয কাজও ছাড়িয়ে দাও। যার ফলে এটা সোজা হয়ে যাবে এবং পথে আসবে। এটাও মুজাহাদা।
📄 চারটি মুজাহাদা
সূফীয়ায়ে কেরামের নিকট চারটি জিনিসের মুজাহাদা খুব বিখ্যাত।
১. খানা কম খাওয়া।
📄 কম খাওয়া একটি মুজাহাদা
২. কথা কম বলা।
৩. কম ঘুমানো।
৪. মানুষের সঙ্গে কম মেলামেশা করা।
এক নম্বর, কম খাওয়া। পূর্বের যুগের সূফীয়ায়ে কেরাম কম খাওয়ার ব্যাপারে অনেক সাধনা করতেন। মুজাহাদা করাতেন। এমনকি উপবাসে থাকতে হতো। কিন্তু হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, বর্তমান যামানা এই ধরনের মুজাহদার উপযোগী নয়। মানুষ এমনিতেই কমজোর। এখন যদি মানুষ কম খায় তাহলে আরো রোগ ব্যাধি দেখা দিবে। ফলে আগে যেসব ইবাদত করতো তা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য তিনি বলেন, এ যুগে মানুষ যদি একটি নিয়ম যথারীতি মেনে চলে তাহলে কম খাওয়ার উদ্দেশ্য লাভ হবে। তা হলো, খানা খাওয়ার সময় এমন একটা অবস্থা হয় যখন মনের মধ্যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, আর খাবো কি খাবো না? ঐ দ্বিধা দ্বন্দ্ব যখন দেখা দিবে তখনই খানা ছেড়ে দিবে, এতে করে কম খাওয়ার মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে।
এই যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয় যে, আর খাবো কি খাবো না এটা মূলত বিবেক ও স্বভাবের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কারণ, খানা খেতে মজা লাগছে তাই নফস আরো মজা নিতে চায়। আর বিবেক চায়, অতিরিক্ত খানা আর না খাক। এখন অতিরিক্ত খানা খেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবৃত্তি ও বিবেকের মাঝে তখন লড়াই হয়ে থাকে। এই লড়াইয়ের নাম হলো 'দ্বিধা-দ্বন্দ্ব'। তাই এমন ক্ষেত্রে নফসের চাহিদার বিরুদ্ধাচরণ করে বিবেকের চাহিদা অনুপাতে কাজ করবে।
📄 ওজনও কম হলো এবং আল্লাহও রাজী হলেন
এ বিষয়টি আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ. এবং হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব রহ.-এর নিকট অনেক বার শুনেছি। ওয়াযের মধ্যেও পড়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের লেখা চোখে পড়লো। তাতে তিনি লিখেছেন,
আজকাল মানুষ নিজেদের শরীরের ওজন কমানের জন্য বিভিন্ন প্রকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। কেউ রুটি ছেড়ে দেয়, কেউ বা দুপুরে খানা ছেড়ে দেয়। বর্তমান যুগের পরিভাষায় যাকে ডায়েটিং বলা হয়। ইউরোপে এর খুব প্রচলন। এটা সেখানে মহামারীর মতো বিস্তার লাভ করেছে। এর উদ্দেশ্য হয় দেহের ওজন কমানো। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে ঔষধ খেয়ে ওজন কমানোর প্রচলন খুব বেশি। এর ফলে অনেক সময় মানুষ মারাও যায়।
এরপর ঐ ডাক্তার লিখেছেন, আমার মতে ওজন কমানোর সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি এই যে, মানুষ কোনো বেলার খানা খাওয়া একেবারে ছেড়ে দিবে না এবং পরিমাণ কম করবে না, বরং সারা জীবন এই নিয়ম মেনে চলবে যে, ক্ষুধার চেয়ে একটু কম খেয়ে খাওয়া বন্ধ করে দিবে। এরপর ঐ ডাক্তার ঠিক একথাই লিখেছেন যে, খানা খেতে খেতে যখন এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয় যে, আর খাবো কি খাবো না, ঐ সময় খাওয়া ছেড়ে দিবে। যে ব্যক্তি এ অনুপাতে কাজ করবে তার কখনোই শরীরে ওজন বৃদ্ধি পাবে না এবং পাকস্থলীর রোগ হবে না এবং তার ডায়েটিং করার প্রয়োজনও দেখা দিবে না।
এ কথাটি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. অনেক বছর পূর্বে লিখে গেছিলেন। এখন ওজন কমানোর জন্য এর উপর আমল করুক বা আল্লাহ তা'আলাকে রাজী করার জন্য এ মশওয়ারা মোতাবেক কাজ করুক। কিন্তু নফসের চিকিৎসাস্বরূপ আল্লাহ তা'আলাকে খুশি করার জন্য যদি এ কাজ করেন তাহলে এ কাজে আপনি সফল হবেন, পুরস্কার পাবেন এবং ওজনও কমে যাবে। আর যদি শুধু ওজন কমানোর জন্য এ কাজ করেন তাহলে ওজন হয়তো কমবে, কিন্তু ছওয়াব পাবেন না।