📄 এটি দুনিয়ার জগত
তৃতীয় জগত ঐটা, যার মধ্যে মনের অনুকূল কাজও হয়, আবার মনের প্রতিকূল কাজও হয়। আনন্দও লাভ হয়, বেদনাও লাভ হয়।, কষ্টও পাওয়া যায়, আরামও পাওয়া যায়। এ জগতে কারো কষ্টও নিখাদ নয় এবং কারো আরামও নিখাদ নয়। প্রত্যেক আরামের মধ্যে কষ্টের কোনো না কোনো কাঁটা লেগে আছে এবং প্রত্যেক কষ্টের মধ্যে আরামের কোনো না কোনো দিক রয়েছে। এটা হলো দুনিয়ার জগত। এই দুনিয়ায় আপনি বড়ো থেকে বড়ো পুঁজিপতি, বড়ো থেকে বড়ো সম্পদশালী, বড়ো থেকে বড়ো উপকরণের অধিকারীকে জিজ্ঞাসা করুন, তোমার কখনো কোনো কষ্ট হয়েছে কি? বা তুমি সারা জীবন কি আরাম ও শান্তিতে আছো? একজন ব্যক্তিও এমন পাওয়া যাবে না, যে বলবে যে, আমার কখনোই কোনো কষ্ট হয়নি। কখনোই কোনো কাজ আমার মনের বিরুদ্ধে হয়নি। আরে! এটা হলো দুনিয়ার জগত, জান্নাত নয়। এখানে আরামও থাকবে, কষ্টও থাকবে। এই দুনিয়াকে এ জন্যই বানানো হয়েছে। কেউ যদি চায় আমার কেবলই আরাম লাভ হোক, কোনো প্রকারের কষ্টই না হোক; তাহলে এটা কখনোই হবে না। সারা জীবনেও হবে না। এক কবি বলেন,
قید حیات و بند غم اصل میں دونوں ایک ہیں موت سے پہلے آدمی غم سے نجات پائے کیوں
'জীবন ও বেদনার বন্ধন মূলত অভিন্ন। মৃত্যুর পূর্বে মানুষ বেদনা থেকে মুক্তি লাভ করবে কি করে?'
এই দুনিয়াকে আল্লাহ তা'আলা এ কাজের জন্যই বানিয়েছেন। এখানে আপনার অন্তরে শান্তিও লাভ হবে আবার আত্মা বিদীর্ণকারী অবস্থাও সৃষ্টি হবে। এজন্য মৃত্যু পর্যন্ত বেদনা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। অন্যেরা তো পরের কথা, আম্বিয়া কেরাম - যাঁরা আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, তাঁদেরও কষ্ট হয়েছে। বরং কতক সময় সাধারণ মানুষের চেয়ে তাঁদের বেশি কষ্ট হয়েছে। তাদেরও মনের বিরুদ্ধে ঘটনা দেখা দিয়েছে। এ দুনিয়াতে কোনো মানুষই এ থেকে বাঁচতে পারে না। মানুষ কাফের হলেও মনের বিরুদ্ধে কাজ হবে, মুমিন হলেও মনের বিরুদ্ধে কাজ হবে।
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করুন
এ দুনিয়াতে মনের বিরুদ্ধে অবস্থা আসবেই। মনের বিরুদ্ধে কাজ করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি পদ্ধতি তো এই যে, মনের বিরুদ্ধে কাজ করেও, ব্যথা উঠিয়েও এবং কষ্ট সহ্য করেও আখেরাতে তার বিনিময়ে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। আখেরাতে কোনো প্রতিদান লাভ হবে না। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।
দ্বিতীয় পদ্ধতি এই যে, মানুষ নিজের মনের বিরুদ্ধে কাজ করবে এবং নফসের চাহিদাকে নিষ্পেষিত করবে, যাতে তার আখেরাত গঠিত হয় এবং আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। সুতরাং আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত হলো, এ দুনিয়াতে তো মনের বিরুদ্ধে কাজ হয়েই থাকে, তাই এই অঙ্গীকার করুন যে, মনের বিরুদ্ধে সেই কাজ করবো, যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হন।
যেমন, নামাযের সময় হয়েছে, মসজিদ থেকে ডাক আসছে, কিন্তু মসজিদে যেতে মন চাচ্ছে না। অলসতা জাগছে। এমতাবস্থায় আপনি মনের চাহিদা অনুপাতে আমল করলেন। বিছানায় শুয়ে থাকলেন। ইতিমধ্যে দরজায় করাঘাত হলো। জানা গেলো, দরজায় এমন এক ব্যক্তি এসেছে, যার জন্য বাইরে যাওয়া জরুরী। তার খাতিরে বিছানা ছাড়লেন। বাইরে বের হলেন। ফলে মনের বিরুদ্ধে কাজ করতে হলো। চাহিদার বিরুদ্ধে কাজ করতে হলো। কষ্ট করতে হলো। আরাম লাভ হলো না। তাই মানুষ চিন্তা করবে যে, কষ্ট থেকে বাঁচা তো আমার ক্ষমতাধীন নয়। তাহলে আমি কেন আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট সহ্য করবো না? একথা চিন্তা করে উঠে নামাযের জন্য যাবে।
📄 এ সময় যদি বাদশাহের পয়গাম আসে
আমাদের হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব (কু.সি.) আমাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী কথা বলতেন। একবার বলেন, ভাই, তোমার যদি নামাযে যেতে অলসতা লাগে বা দ্বীনের অন্য কোনো কাজ করতে অলসতা লাগে, যেমন ফজরের নামাযের জন্য বা তাহাজ্জুদের নামাযের জন্য উঠতে অলসতা লাগছে, চোখ খুলে গেছে কিন্তু ঘুমের প্রাবল্য রয়েছে। বিছানা ছাড়তে মন চাচ্ছে না। তাহলে একটু চিন্তা করে দেখো যে, এই ঘুমের প্রাবল্যের অবস্থায় যদি তোমার নিকট রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষ থেকে এই পয়গাম আসে যে, তিনি তোমাকে এই মুহূর্তে অনেক বড়ো সম্মাননা দিতে চান। তাহলে কি তখন ঐ ঘুম এবং অলসতা থাকবে? বলা বাহুল্য যে, ঐ ঘুম ও অলসতা দূর হয়ে যাবে। কেন? এ জন্য যে, তোমার অন্তরে ঐ সম্মাননার মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে। যার ফলে তুমি মনের বিরুদ্ধে কাজ করতে তৈরী হয়ে যাবে এবং চিন্তা করবে যে, কিসের গাফলতি! কিসের ঘুম! এই সম্মান লাভের জন্য দৌড়ে যাও। এই মওকা যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে আর পাওয়া যাবে না। সুতরাং এর জন্য ঘুম ও বিশ্রাম ত্যাগ করে সাথে সাথে বের হয়ে পড়বে। এজন্য যখন তুমি দুনিয়ার একজন বাদশাহের পক্ষ থেকে সম্মান লাভের জন্য ঘুম ছাড়তে পারো, আরাম ছাড়তে পারো, তাহলে আহকামুল হাকেমীন আল্লাহ তা'আলাকে রাজী করার জন্য, তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরাম ও ঘুম ছাড়তে পারবে না কেন? কোনো না কোনো কারণে যখন ঘুম এবং আরাম ছাড়তেই হয় তাহলে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য তা ছাড়বো না কেন?
📄 আল্লাহর সান্নিধ্য চেষ্টাকারীদের জন্য
হযরাতে আম্বিয়ায়ে কেরাম এই পয়গামই দিয়েছেন যে, নিজেকে নফসের বিরুদ্ধে এমন কাজ করতে অভ্যস্ত করো যা আল্লাহ তা'আলাকে রাজী করবে। এর নামই হলো 'মুজাহাদা'। যেসব কষ্ট এবং যেসব ব্যথা অনিচ্ছাকৃতভাবে আসে, বাহ্যিকভাবে তার দ্বারা কোনো লাভ হয় না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা রয়েছে যারা আমার খাতিরে মুজাহাদা করবে এবং আমার খাতিরে নফসের বিরুদ্ধে কাজ করবে, অবশ্যই আমি তাদের হাত ধরে আমার রাস্তায় পরিচালিত করবো।
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
'এবং যেসব লোক আমার জন্য চেষ্টা করবে আমি অবশ্য অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পৌছে দেবো এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীলদের সাথে রয়েছেন।"
অর্থাৎ, পথে সে একা থাকবে না, বরং যে ব্যক্তি এ পথে চলবে, সে মুহসিনীনদের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ তা'আলা মুহসিনীনদের সঙ্গী হয়ে যান。
টিকাঃ
১. সূরা আনকাবুত, আয়াত-৬৯