📄 জান্নাতে মুজাহাদা থাকবে না
আল্লাহ তাবারকা ওয়া তা'আলা তিনটি জগত সৃষ্টি করেছেন। একটি জগত এমন, যেখানে আপনার সব চাহিদা পুরা হবে। সেখানে আপনার চাহিদার বিরুদ্ধে কিছু করার প্রয়োজন হবে না। মন যা চাইবে তাই হবে। সেখানে মানুষ নিজের মন মোতাবেক কাজ করার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্বাধীন থাকবে। সেখানে তাকে সব সুযোগ দেওয়া হবে। সেই জগতের নাম জান্নাত। যার সম্পর্কে কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُوْنَ
'যা কিছু তোমাদের মন চাইবে তা পাবে এবং যা কিছু তোমরা দাবী করবে তাও লাভ করবে।"
কতক বর্ণনায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে যে, বসে বসে মন চাইলো আনারের জুস পান করবো। এখন সেখানে না আনার আছে, না আনারের গাছ আছে, না জুস বের করার লোক আছে, কিন্তু বাস্তবে ঘটবে এই যে, যখন আপনার মনে জুস পান করার চিন্তা জাগবে সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার কুদরতে আনারের জুস বের হয়ে আপনার নিকট পৌছে যাবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে এই ক্ষমতা দান করবেন যে, যেই জিনিস মন চাইবে তাই লাভ হবে। সেখানে আপনার কোনো চাহিদা দমন করার প্রয়োজন হবে না। কোনো বাসনার বিরুদ্ধাচরণ করার প্রয়োজন হবে না। কোনো প্রকার মুজাহাদার প্রয়োজন হবে না। সেখানে আপনার কোনো বাসনা নিষ্পেষিত করা, কোনো চাহিদা দমন করা, অথবা কোনো বাসনার বিরুদ্ধাচরণ করার প্রয়োজন হবে না। এককথায়, কোনো প্রকার মুজাহাদার-ই প্রয়োজন হবে না। এই জগত হলো জান্নাত। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে নিজ দয়ায় সেই জগত দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১. সূরা হামীম সাজদা, আয়াত-৩১
📄 জাহান্নামের জগত
দ্বিতীয় জগত এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে সব কাজ মনের বিরুদ্ধে হবে। সব কাজ দুঃখ কষ্ট দিবে। সব কাজ বেদনায় লিপ্ত করবে। সব কাজে বিপদ হবে। কোনো আরাম, কোনো শান্তি, কোনো সন্তুষ্টি ও কোনো আনন্দ থাকবে না। তা হলো দোযখের জগত। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মুসলিমকে তা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
📄 এটি দুনিয়ার জগত
তৃতীয় জগত ঐটা, যার মধ্যে মনের অনুকূল কাজও হয়, আবার মনের প্রতিকূল কাজও হয়। আনন্দও লাভ হয়, বেদনাও লাভ হয়।, কষ্টও পাওয়া যায়, আরামও পাওয়া যায়। এ জগতে কারো কষ্টও নিখাদ নয় এবং কারো আরামও নিখাদ নয়। প্রত্যেক আরামের মধ্যে কষ্টের কোনো না কোনো কাঁটা লেগে আছে এবং প্রত্যেক কষ্টের মধ্যে আরামের কোনো না কোনো দিক রয়েছে। এটা হলো দুনিয়ার জগত। এই দুনিয়ায় আপনি বড়ো থেকে বড়ো পুঁজিপতি, বড়ো থেকে বড়ো সম্পদশালী, বড়ো থেকে বড়ো উপকরণের অধিকারীকে জিজ্ঞাসা করুন, তোমার কখনো কোনো কষ্ট হয়েছে কি? বা তুমি সারা জীবন কি আরাম ও শান্তিতে আছো? একজন ব্যক্তিও এমন পাওয়া যাবে না, যে বলবে যে, আমার কখনোই কোনো কষ্ট হয়নি। কখনোই কোনো কাজ আমার মনের বিরুদ্ধে হয়নি। আরে! এটা হলো দুনিয়ার জগত, জান্নাত নয়। এখানে আরামও থাকবে, কষ্টও থাকবে। এই দুনিয়াকে এ জন্যই বানানো হয়েছে। কেউ যদি চায় আমার কেবলই আরাম লাভ হোক, কোনো প্রকারের কষ্টই না হোক; তাহলে এটা কখনোই হবে না। সারা জীবনেও হবে না। এক কবি বলেন,
قید حیات و بند غم اصل میں دونوں ایک ہیں موت سے پہلے آدمی غم سے نجات پائے کیوں
'জীবন ও বেদনার বন্ধন মূলত অভিন্ন। মৃত্যুর পূর্বে মানুষ বেদনা থেকে মুক্তি লাভ করবে কি করে?'
এই দুনিয়াকে আল্লাহ তা'আলা এ কাজের জন্যই বানিয়েছেন। এখানে আপনার অন্তরে শান্তিও লাভ হবে আবার আত্মা বিদীর্ণকারী অবস্থাও সৃষ্টি হবে। এজন্য মৃত্যু পর্যন্ত বেদনা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। অন্যেরা তো পরের কথা, আম্বিয়া কেরাম - যাঁরা আল্লাহ তা'আলার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, তাঁদেরও কষ্ট হয়েছে। বরং কতক সময় সাধারণ মানুষের চেয়ে তাঁদের বেশি কষ্ট হয়েছে। তাদেরও মনের বিরুদ্ধে ঘটনা দেখা দিয়েছে। এ দুনিয়াতে কোনো মানুষই এ থেকে বাঁচতে পারে না। মানুষ কাফের হলেও মনের বিরুদ্ধে কাজ হবে, মুমিন হলেও মনের বিরুদ্ধে কাজ হবে।
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ কাজটি করুন
এ দুনিয়াতে মনের বিরুদ্ধে অবস্থা আসবেই। মনের বিরুদ্ধে কাজ করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি পদ্ধতি তো এই যে, মনের বিরুদ্ধে কাজ করেও, ব্যথা উঠিয়েও এবং কষ্ট সহ্য করেও আখেরাতে তার বিনিময়ে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। আখেরাতে কোনো প্রতিদান লাভ হবে না। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।
দ্বিতীয় পদ্ধতি এই যে, মানুষ নিজের মনের বিরুদ্ধে কাজ করবে এবং নফসের চাহিদাকে নিষ্পেষিত করবে, যাতে তার আখেরাত গঠিত হয় এবং আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। সুতরাং আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াত হলো, এ দুনিয়াতে তো মনের বিরুদ্ধে কাজ হয়েই থাকে, তাই এই অঙ্গীকার করুন যে, মনের বিরুদ্ধে সেই কাজ করবো, যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্ট হন।
যেমন, নামাযের সময় হয়েছে, মসজিদ থেকে ডাক আসছে, কিন্তু মসজিদে যেতে মন চাচ্ছে না। অলসতা জাগছে। এমতাবস্থায় আপনি মনের চাহিদা অনুপাতে আমল করলেন। বিছানায় শুয়ে থাকলেন। ইতিমধ্যে দরজায় করাঘাত হলো। জানা গেলো, দরজায় এমন এক ব্যক্তি এসেছে, যার জন্য বাইরে যাওয়া জরুরী। তার খাতিরে বিছানা ছাড়লেন। বাইরে বের হলেন। ফলে মনের বিরুদ্ধে কাজ করতে হলো। চাহিদার বিরুদ্ধে কাজ করতে হলো। কষ্ট করতে হলো। আরাম লাভ হলো না। তাই মানুষ চিন্তা করবে যে, কষ্ট থেকে বাঁচা তো আমার ক্ষমতাধীন নয়। তাহলে আমি কেন আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট সহ্য করবো না? একথা চিন্তা করে উঠে নামাযের জন্য যাবে।