📄 তাকদীরের হাকীকত
কতক মানুষ এই হাদীসের ভিত্তিতে বলে যে, তাকদীরে যখন লিখে দেয়া হয়েছে কোন ব্যক্তি বেহেশতী এবং কোন ব্যক্তি জাহান্নামী, তাহলে আমল করার দ্বারা লাভ কি? তাই তো হবে যা তাকদীরে লেখা আছে। ভালো করে বুঝুন এই হাদীসের অর্থ এটা নয় যে, আপনি সেই আমলই করবেন যা তাকদীরে লেখা আছে। বরং এই হাদীসের অর্থ হলো, তাকদীরে তাই লেখা আছে যা আপনি স্বেচ্ছায় করবেন। কারণ তাকদীর হলো আল্লাহর ইলমের নাম। আর আল্লাহ তা'আলার আগে থেকেই জানা আছে আপনি স্বেচ্ছায় কোন কাজ করবেন। তাই আল্লাহ তা'আলা সে সবই লাওহে মাহফুযে লিখে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার জান্নাতে যাওয়া বা জাহান্নামে যাওয়া মূলত আপনার ইচ্ছাকৃত আমলের ভিত্তিতেই হবে। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন। সেই ইচ্ছার ভিত্তিতে মানুষ আমল করতে থাকে। এখন চিন্তা করার বিষয় হলো তাকদীরে তো সব কিছুই লিখে দেয়া হয়েছে এজন্য হাত বেঁধে বসে থাকা ঠিক নয়।
সুতরাং যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীস বর্ণনা করলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন,
فَفِيْنَا الْعَمَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ !
'যখন এই ফয়সালা হয়ে গেছে যে, অমুক ব্যক্তি জান্নাতী আর অমুক ব্যক্তি জাহান্নামী তো আমল করে কি লাভ?' তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
اعْمَلُوا فَكُلِّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
'আমল করতে থাকো, কারণ প্রত্যেক মানুষ সেই আমলই করবে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্য তোমরা নিজ ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমল করতে থাকো।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৬৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৮৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৭৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯
📄 নিশ্চিন্ত হবেন না
এই হাদীস এখানে বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন এ কথা চিন্তা না করে যে, আমি বড়ো বড়ো ওযীফা ও তাসবীহ পাঠ করছি, নফল পড়ছি পুরো শরীয়তের উপর আমল করে চলছি, এজন্য আমি নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। আরে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। বরং সব সময় এই ভয় লেগে থাকা উচিত যে, এমন আবার না হয় যে, আমার অবস্থা বদলে গেলো। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
اندریں راه می تراش و می خراش تادم آخر دم فارغ مباش
অর্থাৎ, এ পথে সব সময় পরিশ্রম করতে থাকতে হবে। সব সময় নিজের নফসের নেগরানী করতে থাকতে হবে যে, এ নফস ভুল পথে আবার না চলে। বড়ো বড়ো মানুষ নিশ্চিন্ত হওয়ার ফলে তাদের পদস্খলন ঘটেছে। এজন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের বেফিকির হওয়া উচিত নয়।
📄 জাহান্নামের সবচে’ হালকা আযাব
এক হাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে হালকা আযাব যে ব্যক্তির হবে তা হবে এই যে, তার পায়ের তলায় দুটি অঙ্গার রেখে দেওয়া হবে। কিন্তু তার তীব্রতা এতো বেশি হবে যে, এর ফলে তার মগজ বলকাইতে থাকবে। আর সে ব্যক্তি মনে করবে হয়তো বা আমাকেই সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাকে সবচেয়ে হালকা আযাব দেওয়া হচ্ছে।'
কতক বর্ণনায় এসেছে এই আযাব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবের হবে। কারণ তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঈমান আনেননি। এজন্য তাকে এই শাস্তি দেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।
মোটকথা, এই হাদীস দ্বারা এ কথা বলা উদ্দেশ্য যে, যখন সবচেয়ে হালকা আযাবের কারণে এই অবস্থা হবে যে, ঐ অঙ্গারের পরিণতিতে সে ব্যক্তির মগজ টগবগ করতে থাকবে তাহলে যার জন্য কঠিন আযাবের ধমকি আছে তার অবস্থা কি হবে? জাহান্নামের এই আযাবের কথা মানুষ মাঝে মাঝে চিন্তা করবে তাহলে এর ফলে মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হবে এবং অন্তরে তাকওয়া বদ্ধমূল হবে。
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০৭৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬১, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৫২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৫০৪
📄 জাহান্নামীদের স্তর
এক হাদীস শরীফে জাহান্নামীদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কতক জাহান্নামীর অবস্থা এই হবে যে, জাহান্নামের আগুন তার গিরা পর্যন্ত পৌছবে। যে ব্যক্তির শুধু তালুর নিচে অঙ্গার রেখে দেওয়া হবে তার অবস্থা উপরের হাদীসে শুনলেন, তাহলে যার আগুন গিরা পর্যন্ত পৌছবে তার কি অবস্থা হবে? আর কতক জাহান্নামী এমন হবে যে, জাহান্নামের আগুন তার হাঁটু পর্যন্ত পৌছবে। আর কতক জাহান্নামী এমন হবে যে, আগুন তার কোমর পর্যন্ত পৌছবে এবং কতক এমন হবে যে, তার পাঁজর পর্যন্ত আগুন পৌছবে। জাহান্নামীদের এভাবে বিভিন্ন স্তর হবে। আল্লাহ তা'আলা আপন দয়ায় আমাদের সকলকে তা থেকে হেফাজত করুন।