📄 বুযুর্গদের সাথে বেয়াদবি করার বিপদ
এমনিভাবে আল্লাহওয়ালাদের অসম্মান করা, তাদের শানে বেয়াদবি করা, তাদের অন্তরে কষ্ট দেয়া এটা এমন এক জিনিস, যা অনেক সময় মানুষের মত ও চেতনাকে বদলে দেয়। এজন্য কোনো আল্লাহওয়ালার সাথে আপনার মতোবিরোধ থাকলে সেই মতোবিরোধকে তার সীমানার মধ্যে রাখুন। কিন্তু আপনি যদি তাঁর শানে গোস্তাখি করেন, বেয়াদবি আরম্ভ করেন, তাহলে এর অশুভ পরিণতিতে আপনি গোনাহের মধ্যে ফেসে যেতে পারেন।
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ.-এর একটি পুস্তিকা রয়েছে, যার নাম 'দরসে ইবরাত'। এর মধ্যে তিনি অনেক বড়ো এক বুযুর্গের শিক্ষণীয় একটি ঘটনা লিখেছেন। যিনি সারাজীবন শাইখ, বুযুর্গ ও আল্লাহওয়ালা ছিলেন, হঠাৎ করে তার মনের গতি ফিরে যায়। ফলে তিনি খারাপ কাজে লিপ্ত হন। তো অনেক সময় এই ছোট গোনাহের আপদে এরূপ হয়ে থাকে। এজন্য বলা হয় যে, কোনো গোনাহকেই ছোট মনে করে করো না। কারণ, এমন যেন না হয় যে, ঐ গোনাহের পরিণতিতে আপনার শেষ অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। এজন্য সকল বুযুর্গ সব সময় শেষ পরিণতি ভালো হওয়ার জন্য দু'আ করেছেন।
📄 নেক আমলের বরকত
পক্ষান্তরে অনেক সময় এমন হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তির আমল খারাপ, গোনাহের মধ্যে লিপ্ত, হঠাৎ আল্লাহ তা'আলা নেক আমলের তাওফীক দিলেন এবং এই তাওফীকও লাভ হয় কোনো নেক আমলের পরিণতিতে। যেমন প্রথমে কোনো ছোট নেক আমলের তাওফীক লাভ হলো। তারপর তার বরকতে আল্লাহ তা'আলা অধিক নেক আমলের তাওফীক দান করলেন এবং এর পরিণতিতে তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে গেলো। এ কারণেই হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا
'তোমাদের মধ্যে কেউই যেন, কোনো নেক আমলকে ছোট মনে না করে।"
জানা তো নেই, হয়তো সেই নেক আমলটিই আপনার জীবনে বিপ্লব ঘটিয়ে দিবে। তার কারণে আপনি সব ঘাঁটি পার হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে মাফ করে দিবেন। আল্লাহওয়ালাদের এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যে, ছোট একটি নেক আমলের বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা তার জীবনে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। এজন্য ছোট আমলকেও তুচ্ছ মনে করতে নেই। আমি একটি পুস্তিকা লিখেছি, 'আসান নেকিয়াঁ' নাম দিয়ে। যার মধ্যে আমি এমন ছোট ছোট আমল লিখে দিয়েছি, হাদীস শরীফে যেগুলোর অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। কোনো মানুষ এসব নেক আমল করলে পরিণতিতে তার নেক আমলের মধ্যে অনেক বৃদ্ধি ঘটতে পারে। প্রত্যেক মুসলমানেরই এই পুস্তিকাটি অবশ্যই পড়া উচিত এবং নিজের জীবনে এসব নেক আমল করার চেষ্টা করা উচিত。
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৬০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৩৮৯
📄 তাকদীরের হাকীকত
কতক মানুষ এই হাদীসের ভিত্তিতে বলে যে, তাকদীরে যখন লিখে দেয়া হয়েছে কোন ব্যক্তি বেহেশতী এবং কোন ব্যক্তি জাহান্নামী, তাহলে আমল করার দ্বারা লাভ কি? তাই তো হবে যা তাকদীরে লেখা আছে। ভালো করে বুঝুন এই হাদীসের অর্থ এটা নয় যে, আপনি সেই আমলই করবেন যা তাকদীরে লেখা আছে। বরং এই হাদীসের অর্থ হলো, তাকদীরে তাই লেখা আছে যা আপনি স্বেচ্ছায় করবেন। কারণ তাকদীর হলো আল্লাহর ইলমের নাম। আর আল্লাহ তা'আলার আগে থেকেই জানা আছে আপনি স্বেচ্ছায় কোন কাজ করবেন। তাই আল্লাহ তা'আলা সে সবই লাওহে মাহফুযে লিখে দিয়েছেন। কিন্তু আপনার জান্নাতে যাওয়া বা জাহান্নামে যাওয়া মূলত আপনার ইচ্ছাকৃত আমলের ভিত্তিতেই হবে। আল্লাহ তা'আলা মানুষকে ইচ্ছা শক্তি দিয়েছেন। সেই ইচ্ছার ভিত্তিতে মানুষ আমল করতে থাকে। এখন চিন্তা করার বিষয় হলো তাকদীরে তো সব কিছুই লিখে দেয়া হয়েছে এজন্য হাত বেঁধে বসে থাকা ঠিক নয়।
সুতরাং যখন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীস বর্ণনা করলেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন,
فَفِيْنَا الْعَمَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ !
'যখন এই ফয়সালা হয়ে গেছে যে, অমুক ব্যক্তি জান্নাতী আর অমুক ব্যক্তি জাহান্নামী তো আমল করে কি লাভ?' তখন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
اعْمَلُوا فَكُلِّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
'আমল করতে থাকো, কারণ প্রত্যেক মানুষ সেই আমলই করবে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্য তোমরা নিজ ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমল করতে থাকো।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৬৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৮৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৭৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯
📄 নিশ্চিন্ত হবেন না
এই হাদীস এখানে বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন এ কথা চিন্তা না করে যে, আমি বড়ো বড়ো ওযীফা ও তাসবীহ পাঠ করছি, নফল পড়ছি পুরো শরীয়তের উপর আমল করে চলছি, এজন্য আমি নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। আরে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। বরং সব সময় এই ভয় লেগে থাকা উচিত যে, এমন আবার না হয় যে, আমার অবস্থা বদলে গেলো। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
اندریں راه می تراش و می خراش تادم آخر دم فارغ مباش
অর্থাৎ, এ পথে সব সময় পরিশ্রম করতে থাকতে হবে। সব সময় নিজের নফসের নেগরানী করতে থাকতে হবে যে, এ নফস ভুল পথে আবার না চলে। বড়ো বড়ো মানুষ নিশ্চিন্ত হওয়ার ফলে তাদের পদস্খলন ঘটেছে। এজন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের বেফিকির হওয়া উচিত নয়।