📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর ভয়
হযরত ফারুকে আযম রাযি. নিজকানে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী শুনেছিলেন,
عُمَرُ فِي الْجَنَّةِ
'ওমর জান্নাতে যাবে।"
তিনি এ ঘটনাও শুনেছেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি যখন মেরাজে যান এবং সেখানে জান্নাত ভ্রমণ করেন তো জান্নাতের মধ্যে আমি একটা শানদার মহল দেখি। সেই মহলের পাশে এক মহিলা বসে ওযু করছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এই মহল কার? আমাকে বলা হলো, এটা ওমরের মহল। সেই মহল এতো শানদার ছিলো যে, আমার মন চাচ্ছিলো ভিতরে গিয়ে মহলটি দেখি। কিন্তু হে ওমর! তোমার আত্মমর্যাদবোধের কথা আমর স্মরণ হলো যে, তুমি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষ। এজন্য আমি ঐ মহলে আর প্রবেশ করলাম না। ফিরে এলাম। হযরত ওমর ফারুক রাযি. এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন, এবং নিবেদন করলেন,
وَعَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغَارُ !
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারেও কি আমি আত্মসম্মানবোধ দেখাবো!'২
দেখুন! হযরত ওমর ফারুক রাযি. হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে নিজে জান্নাতের সুসংবাদ শুনেছেন। জান্নাতের মধ্যে নিজের মহলের বিবরণ শুনেছেন। এরপরও তাঁর অবস্থা এই ছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর তিনি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-এর খেদমতে তাশরীফ নিয়ে যান। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে মুনাফিকদের তালিকা বলে দিয়েছিলেন যে, মদীনায় অমুক অমুক ব্যক্তি মুনাফিক। হযরত ওমর ফারুক রাযি. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে হুযাইফা! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলুন, এই তালিকার মধ্যে আমার নাম নেই তো?৩
তাঁর চিন্তা জেগে ছিলো যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আমাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু এমন আবার না হয়ে থাকে যে, আমার পরবর্তী আমলের কারণে এসব সুসংবাদ হাতছাড়া হয়ে গেছে। দেখুন! হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর এই আশঙ্কা লেগে আছে। যাইহোক, যে ব্যক্তির মারেফাত যতো বেশি হবে, তার ভয়ও ততো বেশি হবে। ন্যূনতম এই ভয় অন্তরে অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তাকওয়া অর্জন হতে পারে না。
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৮০, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৩১, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৪৩
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮১১৫
৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯
📄 ভয় সৃষ্টি করার উপায়
এই ভয় সৃষ্টি করার পদ্ধতি এই যে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে থেকে ফজরের নামাযের পর অথবা রাতে ঘুমানোর পূর্বে কিছু সময় নির্ধারণ করবে। তখন এ কথা চিন্তা করবে যে, আমি মৃত্যু বরণ করছি, মৃত্যু-শয্যায় শায়িত আছি। আপনজন আত্মীয়-স্বজন আমার চর্তুপাশে জমায়েত হয়ে আছে। আমার প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। আমাকে কাফন পরানোর পর দাফন করা হচ্ছে। ফেরেশতারা প্রশ্নোত্তর করার জন্য আসছে। আল্লাহ তা'আলার সামনে আমাকে পেশ করা হয়েছে। এসব কথা মনযোগ দিয়ে চিন্তা করতে থাকবে। যখন মানুষ প্রতিদিন এসব কথা চিন্তা করবে, তখন ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে আত্মা থেকে গাফলতের পর্দা সরে যেতে আরম্ভ করবে। আমরা মৃত্যুর ব্যাপারে গাফেল তাই আমাদের উপর গাফলত ছেয়ে আছে। নিজ হাতে নিজের প্রিয় লোকদেরকে মাটি দিয়ে আসছি। নিজের কাঁধে জানাযা বহন করছি। স্বচক্ষে দেখছি যে অমুক ব্যক্তি বসে বসে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো। নিজ চোখে দেখি যে, যেই দুনিয়া সঞ্চয় ও অর্জন করতে সকাল সন্ধ্যা দৌড় ঝাপ করছিলো, পরিশ্রম করছিলো, কষ্ট করছিলো, কিন্তু যখন দুনিয়া থেকে চলে গেলো, তখন তার দিকে মুখ ফিরিয়েও তাকালো না। এসব কিছু দেখা সত্ত্বেও আমরা মনে করি যে, মৃত্যুর এ ঘটনা তার সাথেই ঘটেছে, আমাকেও যে একদিন এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে, সে দিকে মনযোগ যায় না। এজন্য হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
أَكْثِرُوا ذِكْرَهَا ذِهِ اللَّذَّاتِ الْمَوْتِ
অর্থাৎ, সমস্ত স্বাদকে বিনাশকারী মৃত্যুকে অধিকহারে স্মরণ করো। মৃত্যুকে ভুলো না, বরং তাকে বেশি বেশি স্মরণ করো। মোটকথা, প্রতিদিন সকাল বা সন্ধ্যায় সামান্য সময় এ বিষয়গুলো চিন্তা করবে, তাহলে এর মাধ্যমে কিছু না কিছু পরিমাণ কাঙ্খিত সেই ভয় অবশ্যই জন্ম নিবে।'
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২২২৯, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১৮০১
📄 তাকদীয় প্রবল হয়ে দেখা দেয়
এক হাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে একজন জান্নাতের আমল করতে থাকে, এমনকি তার মাঝে আর জান্নাতের মাঝে এক হাতের দূরত্ব থাকে। তখন তার উপর ভাগ্যের লিখন প্রবল হয়ে দেখা দেয়, আর সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের কাজ শুরু করে দেয়, এমনকি সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। অপরদিকে একব্যক্তি সারাজীবন জাহান্নামীদের কাজ করতে থাকে অবশেষে তার আর জাহান্নামের মাঝে এক হাতের দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে, তখন তার উপর ভাগ্যের লিখন প্রবল হয়ে দেখা দেয়, ফলে সে জান্নাতের আমল করতে শুরু করে, এমনকি সে জান্নাতে চলে যায়।'
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৫৬৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৮৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৬২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৭৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯
📄 নিজের আমল নিয়ে গর্ব করবেন না
এই হাদীস দ্বারা শিক্ষা লাভ হয় যে, কোনো ব্যক্তি নিজের আমল নিয়ে গর্ব করবে না যে, আমি অমুক আমল করছি। কারণ, এসব আমল ধর্তব্য নয়। ধর্তব্য হলো জীবনের শেষ আমল'। যেমন এক হাদীসে এসেছে,
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالْخَوَاتِيمِ
'শেষ অবস্থায় সে কেমন আমল করেছিলো তাই র্ধতব্য।"২
অর্থাৎ, কোনো আমলের অশুভ পরিণতি যেন জাহান্নামীদের আমলের দিকে নিয়ে না যায়। এজন্য নেক আমল করা অবস্থায়ও ভয় করা উচিত。
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০১২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২১৭৬৮