📄 নেক বান্দাগণের অবস্থা
অপর এক জায়গায় নেক বান্দাগণের আলোচনা করে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
كَانُوا قَلِيْلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আল্লাহর নেক বান্দাগণ রাতের বেলায় কম ঘুমিয়ে থাকেন, আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে থাকেন, তাহাজ্জুদ আদায় করতে থাকেন, কিন্তু যখন ভোর বেলা হয় তখন তারা ইস্তেগফার করেন।'
হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আয়েশা রাযি. হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ভোর রাত তো ইস্তিগফার করার সময় নয়, কারণ ইস্তিগফার তো হয় কোনো গোনাহের পর। এরা তো সারারাত আল্লাহ তা'আলার দরবারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত করেছেন। কোনো গোনাহ তো করেননি। তাহলে এরা ইস্তিগফার করতেন কেন? উত্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এসব লোক নিজের ইবাদতের ব্যাপারেই ইস্তিগফার করতেন। যেমন ইবাদত করা উচিত ছিলো তেমন ইবাদত করা আমার দ্বারা হয়নি। ইবাদতের যেই হক আদায় করা উচিত ছিলো, আমার দ্বারা সেই হক আদায় করা সম্ভব হয়নি।
মোটকথা, আল্লাহর এসব নেক বান্দাদের শুধু গোনাহের ভয় হয় না বরং ইবাদত ভুল হওয়ারও ভয় হয়ে থাকে যে, এই ইবাদত আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ না হয়ে যায়。
টিকাঃ
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮
📄 মারেফাত অনুপাতে আল্লাহর ভয় হয়ে থাকে
ভয়ের ব্যাপারে মূলনীতি এই যে, আল্লাহ তা'আলার মারেফাত যতো বেশি হবে আল্লাহ তা'আলার ভয়ও ততো বেশি হবে। আর অজ্ঞতা যে পরিমাণ থাকবে, ভয়ও সেই পরিমাণ কম হবে। দেখুন! ছোট একটি বাচ্চা, যে এখনো নির্বোধ, তার সামনে যদি বাদশা আসে, উজির আসে বা বাঘ আসে, সে কোনো প্রকার ভয় করবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি বাদশার মর্যাদা জানে, সে বাদশার সামনে যেতে কাঁপতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলার মারেফাত হযরত সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে নবীগণের পর সবচে' বেশি ছিলো। এজন্য তাঁদের মধ্যে আল্লাহর তা'আলার ভয়ও বেশি ছিলো।
📄 হযরত হানযালা রাযি.-এর ভয়
হযরত হানযালা রাযি. একবার পেরেশান হয়ে দৌড়াতে থাকলেন। কাঁপতে কাঁপতে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে নিবেদন করলেন,
نَافَقَ حَنْظَلَةُ ، يَا رَسُولَ اللَّهِ !
'হে আল্লাহর রাসূল! হানযালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে।'
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে মুনাফিক হলে? হযরত হানযালা রাযি. নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যখন আপনার মজলিসে বসা থাকি এবং জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা শুনি, আখেরাতের আলোচনা শুনি, তখন অন্তরে নম্রতা সৃষ্টি হয়। আত্মা বিগলিত হয়। দুনিয়া বিমুখতা সৃষ্টি হয়। আখেরাতের ফিকির পয়দা হয়। কিন্তু যখন বাড়িতে যাই, স্ত্রী ও সন্তান সন্ততির সাথে মিলিত হই, জীবনের কাজ কর্মে লিপ্ত হই, তখন মনের সেই অবস্থা অবশিষ্ট থাকে না। বরং দুনিয়ার মহব্বত আমাদের আত্মার উপর আচ্ছন্ন করে নেয়। তাই এখানে এসে এক অবস্থা, আর বাইরে গিয়ে অন্য অবস্থা, এটা তো মুনাফিক হওয়ার আলামত। উত্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً
অর্থাৎ, হে হানযালা! ভয় করার কিছু নেই। সময় ভেদে এমন হয়ে থাকে। আত্মা কখনো বেশি বিগলিত হয়, আর কখনো কম হয়। আল্লাহ তা'আলার দরবারে এর উপর ভিত্তি নয়। আসল ভিত্তি হলো আমলের উপর। মানুষের কোনো আমল যেন শরীয়ত বিরোধী না হয়।"
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৯৩৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৯৪৯
📄 হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর ভয়
হযরত ফারুকে আযম রাযি. নিজকানে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী শুনেছিলেন,
عُمَرُ فِي الْجَنَّةِ
'ওমর জান্নাতে যাবে।"
তিনি এ ঘটনাও শুনেছেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি যখন মেরাজে যান এবং সেখানে জান্নাত ভ্রমণ করেন তো জান্নাতের মধ্যে আমি একটা শানদার মহল দেখি। সেই মহলের পাশে এক মহিলা বসে ওযু করছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এই মহল কার? আমাকে বলা হলো, এটা ওমরের মহল। সেই মহল এতো শানদার ছিলো যে, আমার মন চাচ্ছিলো ভিতরে গিয়ে মহলটি দেখি। কিন্তু হে ওমর! তোমার আত্মমর্যাদবোধের কথা আমর স্মরণ হলো যে, তুমি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষ। এজন্য আমি ঐ মহলে আর প্রবেশ করলাম না। ফিরে এলাম। হযরত ওমর ফারুক রাযি. এ কথা শুনে কেঁদে ফেললেন, এবং নিবেদন করলেন,
وَعَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَغَارُ !
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারেও কি আমি আত্মসম্মানবোধ দেখাবো!'২
দেখুন! হযরত ওমর ফারুক রাযি. হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে নিজে জান্নাতের সুসংবাদ শুনেছেন। জান্নাতের মধ্যে নিজের মহলের বিবরণ শুনেছেন। এরপরও তাঁর অবস্থা এই ছিলো যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর তিনি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-এর খেদমতে তাশরীফ নিয়ে যান। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে মুনাফিকদের তালিকা বলে দিয়েছিলেন যে, মদীনায় অমুক অমুক ব্যক্তি মুনাফিক। হযরত ওমর ফারুক রাযি. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে হুযাইফা! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলুন, এই তালিকার মধ্যে আমার নাম নেই তো?৩
তাঁর চিন্তা জেগে ছিলো যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আমাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু এমন আবার না হয়ে থাকে যে, আমার পরবর্তী আমলের কারণে এসব সুসংবাদ হাতছাড়া হয়ে গেছে। দেখুন! হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর এই আশঙ্কা লেগে আছে। যাইহোক, যে ব্যক্তির মারেফাত যতো বেশি হবে, তার ভয়ও ততো বেশি হবে। ন্যূনতম এই ভয় অন্তরে অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তাকওয়া অর্জন হতে পারে না。
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৮০, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৩১, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৫৪৩
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪০৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮১১৫
৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯