📄 জান্নাত কার জন্য?
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং নিজের নফসকে মন্দ কামনা বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, জান্নাতই হবে তার ঠিকানা।"
কি বিস্ময়কর শব্দ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন! তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তার পরওয়ারদেগারের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করলো যে, আমাকে একদিন আমার প্রভুর সামনে দাঁড়াতে হবে তখন কোন মুখ নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়াবো। আর এই ভয় তার এতো তীব্র হলো যে, এই ভয়ের ফলে সে তার নফসের অবৈধ চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকলো, তাহলে এমন ব্যক্তির ঠিকানা হবে জান্নাত। এমন ব্যক্তির জন্যই জান্নাত তৈরী করা হয়েছে。
জান্নাতের চর্তুদিকে কষ্টের আবরণ রয়েছে
এক হাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إِنَّ الْجَنَّةَ حُقَّتْ بِالْمَكَارِهِ
'জান্নাতকে আল্লাহ তা'আলা এমন সব জিনিস দ্বারা পরিবেষ্টন করেছেন যা মানুষের কাছে খারাপ লাগে।'১
অর্থাৎ, কষ্টকর ও পরিশ্রমের কাজ যা মনের উপর চাপ সৃষ্টি করে, এমন সব জিনিস দ্বারা জান্নাতকে পরিবেষ্টন করা হয়েছে। আপনি এসব কষ্টকর কাজ করলে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন। এজন্য বলা হয়েছে যে, অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করুন, এর ফলে নাজায়েয কামনা বাসনার উপর আমল করা থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। পরিণতিতে জান্নাত লাভ হবে। এই ভয় এই পর্যায়ের হতে হবে, যেন নিজের সব কাজ, সব কথার মধ্যে এই ভয় লেগে থাকে যে, এটা আমার মালিকের মর্জির খেলাফ যেন না হয়। সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের ভয়ের অবস্থা এই ছিলো যে, তাদের ঐ সময় পর্যন্ত শান্তি লাভ হতো না, যতক্ষণ পর্যন্ত হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে নিজের উপর শান্তি বাস্তবায়ন না করাতেন。
টিকাঃ
১. সূরা নাযেয়াত, আয়াত: ৪০-৪১
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫০৪৯, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৮২
📄 ইবাদতের উপরেও ইস্তিগফার করা উচিত
এই ভয় যখন আরো উন্নতি করে তখন তা শুধু গোনাহ না করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এই বিষয়েও ভয় সৃষ্টি হয় যে, আমরা যে ইবাদত করছি তা আল্লাহ তা'আলার শান মোতাবেক হচ্ছে কি? ইবাদত আল্লাহর তা'আলার সামনে পেশ করার উপযুক্ত হচ্ছে কি? এ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিমূলক আমল করেও ভয় করছে যে, এ আমল আল্লাহ তা'আলার শান মোতাবেক যদি না হয়, তার মধ্যে যদি কোনো বেয়াদবি হয়ে যায়! এজন্য বুযুর্গগণ বলেছেন, একজন মুমিনের কাজ হলো, আমল করতে থাকবে এবং ভয় করতে থাকবে। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا
'তাদের পার্শ্বদেশ রাতের বেলায় বিছানা থেকে আলাগ থাকে এবং তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায়।'২
তারা আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত যখন করতে থাকে, তখনও তাদের আত্মা আল্লাহর ভয় থেকে খালি থাকে না। বরং ভয়ের সাথে নিজের প্রভুকে ডাকতে থাকে যে, জানা তো নেই আমার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করার যোগ্য হলো কি না?
টিকাঃ
২. সূরা সাজদা, আয়াত-১৬
📄 নেক বান্দাগণের অবস্থা
অপর এক জায়গায় নেক বান্দাগণের আলোচনা করে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
كَانُوا قَلِيْلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
'আল্লাহর নেক বান্দাগণ রাতের বেলায় কম ঘুমিয়ে থাকেন, আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে থাকেন, তাহাজ্জুদ আদায় করতে থাকেন, কিন্তু যখন ভোর বেলা হয় তখন তারা ইস্তেগফার করেন।'
হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আয়েশা রাযি. হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ভোর রাত তো ইস্তিগফার করার সময় নয়, কারণ ইস্তিগফার তো হয় কোনো গোনাহের পর। এরা তো সারারাত আল্লাহ তা'আলার দরবারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত করেছেন। কোনো গোনাহ তো করেননি। তাহলে এরা ইস্তিগফার করতেন কেন? উত্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এসব লোক নিজের ইবাদতের ব্যাপারেই ইস্তিগফার করতেন। যেমন ইবাদত করা উচিত ছিলো তেমন ইবাদত করা আমার দ্বারা হয়নি। ইবাদতের যেই হক আদায় করা উচিত ছিলো, আমার দ্বারা সেই হক আদায় করা সম্ভব হয়নি।
মোটকথা, আল্লাহর এসব নেক বান্দাদের শুধু গোনাহের ভয় হয় না বরং ইবাদত ভুল হওয়ারও ভয় হয়ে থাকে যে, এই ইবাদত আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টির কারণ না হয়ে যায়。
টিকাঃ
১. সূরা যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮
📄 মারেফাত অনুপাতে আল্লাহর ভয় হয়ে থাকে
ভয়ের ব্যাপারে মূলনীতি এই যে, আল্লাহ তা'আলার মারেফাত যতো বেশি হবে আল্লাহ তা'আলার ভয়ও ততো বেশি হবে। আর অজ্ঞতা যে পরিমাণ থাকবে, ভয়ও সেই পরিমাণ কম হবে। দেখুন! ছোট একটি বাচ্চা, যে এখনো নির্বোধ, তার সামনে যদি বাদশা আসে, উজির আসে বা বাঘ আসে, সে কোনো প্রকার ভয় করবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি বাদশার মর্যাদা জানে, সে বাদশার সামনে যেতে কাঁপতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলার মারেফাত হযরত সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে নবীগণের পর সবচে' বেশি ছিলো। এজন্য তাঁদের মধ্যে আল্লাহর তা'আলার ভয়ও বেশি ছিলো।