📄 এই গোনাহ সগীরা, না কবীরা?
হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, মানুষ খুব আগ্রহের সাথে জিজ্ঞাসা করে যে, অমুক গোনাহটি সগীরা, না কবীরা? এভাবে জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্য এই হয়ে থাকে যে, সগীরা গোনাহ হলে করবে। আর কবীরা হলে তা করতে কিছুটা ভয় অনুভব হয়। হযরত বলতেন, সগীরা ও কবীরা গোনাহের দৃষ্টান্ত হলো একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও একটি বড়ো অঙ্গার। কাউকে কি কখনো দেখেছেন, ছোট অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে ছোট মনে করে সিন্দুকের ভিতর রেখে দিয়েছে? কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এ কাজ করবে না। কারণ, সিন্দুকের মধ্যে রাখার পর তা আগুনে পরিণত হবে। সিন্দুকের সবকিছু জ্বালিয়ে দিবে এবং সিন্দুককেও জ্বালিয়ে দিবে। বরং পুরো বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গোনাহের অবস্থাও একই। গোনাহ ছোট হোক, বা বড়ো; তা আগুনের স্ফুলিঙ্গের ন্যায়। স্বেচ্ছায় যদি তুমি একটি গোনাহ করো তাহলে হতে পারে ঐ একটি গোনাহ তোমার সারা জীবনের পুঁজিকে ভষ্ম করে দিবে। এজন্য এই চিন্তায় পড়ো না যে, গোনাহ ছোট না বড়ো। বরং এটা দেখো যে, গোনাহ কি না? এ কাজ নাজায়েয কি না? আল্লাহ তা'আলা এটা নিষেধ করেছেন কি না? যখন জানতে পারবে যে, আল্লাহ তা'আলা এটা নিষেধ করেছেন, তখন আল্লাহর সামনে জওয়াব দেওয়ার অনুভূতিকে জাগ্রত করে চিন্তা করো যে, এই গোনাহ করে আমি আল্লাহ তা'আলার সামনে কিভাবে মুখ দেখাবো? মোটকথা, এই আয়াতের ফযীলত লাভ করার পদ্ধতি এই যে, যখনই মানুষের অন্তরে গোনাহের চাহিদা সৃষ্টি হবে, তখনই আল্লাহ তা'আলার সামনে উপস্থিত হওয়ার কথা অন্তরে চিন্তা করবে এবং এর মাধ্যমে গোনাহ ছেড়ে দিবে।
📄 গোনাহের চাহিদা হলে এ কথা চিন্তা করুন!
আমাদের হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই ছাহেব রহ. বলতেন, মানুষ যদি আল্লাহর কথা চিন্তা করতে চায় তাহলে অনেক সময় আল্লাহর চিন্তা ও কল্পনা অন্তরে আসতে চায় না। কারণ, মানুষ তো কখনো আল্লাহকে দেখেনি। আর কল্পনা করা যায় এমন জিনিসের, যাকে মানুষ দেখেছে। এ কারণে আল্লাহর কথা কল্পনা করতে কষ্ট হয়। এজন্য যখন গোনাহের চাহিদা সৃষ্টি হবে তখন অন্য একটি জিনিসের কথা কল্পনা করবে। আর তা হলো, আমি যেই গোনাহ করার ইচ্ছা করছি ঐ গোনাহ করার সময় যদি আমার বাবা আমাকে দেখে বা আমার সন্তান আমাকে দেখে বা আমার ওস্তাদ আমাকে দেখে বা আমার ছাত্র আমাকে দেখে বা আমার বন্ধু-বান্ধব আমাকে দেখে, তাহলে তখনও কি এই গোনাহের কাজ আমি করবো?
উদাহরণস্বরূপ, নাজায়েয জায়গায় দৃষ্টিপাত করার চিন্তা অন্তরে জাগছে। তখন চিন্তা করবে যে, এ সময় যদি আমার শাইখ আমাকে দেখেন বা আমার বাবা আমাকে দেখেন বা আমার সন্তান আমাকে দেখে তাহলে কি তখনও নাজায়েয জায়গায় দৃষ্টিপাত করবো। বলাবাহুল্য যে, দৃষ্টিপাত করবো না। কারণ, আমার ভয় রয়েছে যে, এদের কেউ যদি আমাকে এ অবস্থায় দেখে তাহলে তারা আমাকে খারাপ মনে করবে। তাহলে যখন সাধারণ পর্যায়ের মানুষের সামনে লজ্জিত হওয়ার ভয়ে নিজের কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করি, দৃষ্টিকে সংযত করি; তাহলে প্রত্যেক গোনাহের সময় এ কথা চিন্তা করুন যে, আল্লাহ তা'আলা, যিনি মালিকুল মুল্ক, যিনি তাদের সকলের স্রষ্টা ও মালিক, তিনি আমাকে দেখছেন। এ কথা চিন্তা করার দ্বারা ইনশাআল্লাহ অন্তরে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।
📄 গোনাহের স্বাদ ক্ষণস্থায়ী
মানুষ যখন গোনাহে অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন প্রথম প্রথম গোনাহ থেকে বাঁচতে তার কষ্ট হয়। গোনাহ থেকে বাঁচা সহজ হয় না। কিন্তু গোনাহ থেকে বাঁচার চিকিৎসা এটাই যে, জোরপূর্বক নিজেকে গোনাহ থেকে দূরে রাখবে। আল্লাহর খাতিরে গোনাহের বাসনাকে নিষ্পেষিত করবে। যখন সে আল্লাহর খাতিরে নিজের কামনাকে দমন করবে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে ঈমানের এমন মধুরতা দান করবেন যে, তার তুলনায় গোনাহের স্বাদ কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে গোনাহ থেকে বাঁচার মধুরতা দান করুন。
হযরত হাকীমুল উম্মত রহ. বলতেন, গোনাহের স্বাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন চুলকানিগ্রস্থ ব্যক্তির চুলকানিতে স্বাদ লাগে। কিন্ত তা সুস্থতার স্বাদ নয়। অসুস্থতার স্বাদ। অধিক চুলকানোর কারণে ঐ জায়গায় ক্ষতের সৃষ্টি হবে। ক্ষত এবং জ্বলার কারণে যেই কষ্ট হবে, তার তুলনায় চুলকানির স্বাদের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু চুলকানো থেকে যদি দূরে থাকে আর চিন্তা করে যে, চুলকানোর পর অধিক কষ্ট হবে। এজন্য না চুলকিয়ে যদি তার উপর মলম লাগাই এবং তিতা ঔষধ সেবন করি তাহলে ঔষধ সেবনে কষ্ট হলেও পরিণতিতে চুলকানি থেকে মুক্তি লাভ হবে। তারপর সুস্থতার স্বাদ অর্জন হবে। সুস্থতার স্বাদ চুলকানির স্বাদের চেয়ে হাজার গুণ উন্নত হবে। ঠিক একইভাবে গোনাহের স্বাদ একেবারেই মূল্যহীন। ধোঁকার জিনিস। এই স্বাদকে আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিন। এর পরিবর্তে তাকওয়ার স্বাদ অর্জন করুন। তারপর দেখুন, আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কতো উর্ধ্বে নিয়ে যান। প্রবৃত্তির এসব চাহিদা সৃষ্টিই করা হয়েছে নিষ্পেষিত করার জন্য এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দয়া ও অনুগ্রহে এ কথার হাকীকত আমাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দিন।
📄 যৌবনকালে ভয় ও বৃদ্ধকালে আশা
একজন মুমিন আল্লাহর প্রতি ভয়ও পোষণ করবে, আবার একই সঙ্গে আশাও পোষণ করবে। তবে বুযুর্গগণ বলেছেন, যৌবনকালে ভয়ের প্রাবল্য ভালো। কারণ, যৌবনকালে যখন হাত-পা সচল থাকে, শক্তি সবল থাকে, সব ধরনের কাজ করতে মানুষ সক্ষম হয়, তখন অন্তরে গোনাহের চাহিদা হয় বেশি। গোনাহের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী জিনিস বেশি হয়ে থাকে। এজন্য এসময় তার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকা অধিক কল্যাণকর। যাতে এ ভয় তাকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে। তবে যখন মানুষ বৃদ্ধ হয়ে শেষ বয়সে উপনীত হয় তখন আল্লাহ তা'আলার রহমতের আশা প্রবল হওয়া উচিত। যাতে সে নিরাশার শিকার না হয়।