📄 দুধের মধ্যে পানি মিশানোর ঘটনা
ঘটনা বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ফারুক রাযি. তাঁর খেলাফত কালে মানুষের অবস্থা জানার জন্য রাতের বেলা ঘুরে বেড়াতেন। কারো সম্পর্কে যদি জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি উপবাসে আছে তাহলে তার সাহায্য করতেন। যদি জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ তাহলে তার বিপদ দূর করতেন। কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখলে তাকে সংশোধন করতেন। একদিন তিনি তাহাজ্জুদের সময় মদীনার অলীগলিতে ঘুরছিলেন।
এমন সময় এক ঘর থেকে দুই মহিলার কথার আওয়াজ এলো। আওয়াজে বোঝা গেলো, তাদের একজন বুড়ি এবং একজন যুবতি। বুড়ি মহিলা তার যুবতি মেয়েকে বলছে, তুমি যেই দুধ দোহন করেছো তার মধ্যে পানি মেশাও। তাহলে দুধ বেড়ে যাবে। বেশি দুধ বিক্রয় করতে পারবে। মেয়ে উত্তর দিলো, আমীরুল মু'মিনীন হযরত ওমর ফারুক রাযি. নির্দেশ জারি করেছেন, কেনো দুধ বিক্রেতা যেন দুধের মধ্যে পানি না মেশায়। তাই আমাদের পানি মেশানো উচিত নয়। উত্তরে মা বললো, আমীরুল মু'মিনীন তো এখানে বসে নেই। তুমি দুধের মধ্যে পানি মেশালে কে দেখবে? এখন অন্ধকার রাত, দেখার মতো কেউ নেই। তিনি তো তার বাড়িতে অবস্থান করছেন। তিনি কি করে জানতে পারবেন তুমি পানি মিশিয়েছো? উত্তরে মেয়ে বললো, আম্মাজান! আমীরুল মু'মিনীন তো দেখছেন না, কিন্তু আমীরুল মু'মিনীনের শাসক আল্লাহ তা'আলা দেখছেন, তাই এ কাজ আমি করবো না।
দরজার বাইরে হযরত ওমর রাযি. তাদের এ কথাবার্তা শুনছিলেন। সকাল বেলা তিনি তথ্য সংগ্রহ করলেন এ মহিলা কে এবং এই মেয়ে কে? তথ্য সংগ্রহ করার পর ঐ মেয়ের সঙ্গে তার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি.-এর বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। এবং ঐ মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিবাহ করালেন। এই বিবাহের ফলে ঐ মেয়ের বংশে তার নাতি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয জন্ম গ্রহণ করেন। যাকে মুসলিমদের পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ বলা হয়। যাইহোক, ঐ মেয়ের অন্তরে এ কথা জাগে যে, যদিও আমীরুল মু'মিনীন দেখছেন না, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন। নির্জন নিরিবিলি জায়গায় রাতের অন্ধকারে অন্য কেউ না দেখলেও আল্লাহ তা'আলা ঠিকই দেখছেন। এরই নাম হলো 'তাকওয়া'।
📄 একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. কিছু সঙ্গী সহ মদীনা শরীফের বাইরে কোনো এক অঞ্চলে যান। এক ছাগলের রাখাল তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। সে রোযা রেখেছিলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. তার দ্বীনদারি পরীক্ষা করার জন্য তাকে বললেন যে, এই ছাগল পাল থেকে যদি একটি ছাগল তুমি আমার কাছে বিক্রি করো তাহলে তার মূল্যও তোমাকে পরিশোধ করবো এবং এই পরিমাণ গোস্তও তোমাকে দেবো যা দিয়ে তুমি ইফতার করতে পারবে। উত্তরে সে বললো, এই ছাগলগুলো আমার নয়, আমার মনিবের। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি বললেন, তার একটি ছাগল যদি হারিয়ে যায় তাহলে সে কী করবে? এ কথা শুনতেই রাখাল মুখ ঘুরিয়ে নিলো এবং আসমানের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে বললো, فأين الله؟ 'আল্লাহ কোথায় গেছেন? এ কথা বলে সে রওয়ানা হয়ে গেলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. রাখালের এই বাক্য আওড়াতে থাকলেন। মদীনা শরীফ গিয়ে রাখালের মনিবের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তার থেকে ছাগলগুলো কিনে নিলেন, এবং রাখালকেও কিনে নিলেন। তারপর রাখালকে মুক্ত করে দিয়ে সবগুলো ছাগল তাকে উপঢৌকন দিলেন।'
টিকাঃ
১. উদুল গাবা ফী মা'রিফাতিস সাহাবা, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২২৮
📄 অপরাধ নির্মূল করার উত্তম পন্থা
মনে রাখবেন! যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তরে সেই অনুভূতি না জাগবে যা ঐ রাখালের অন্তরে ছিলো যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দুনিয়া থেকে অপরাধ নির্মূল হতে পারে না। অন্যায় ও অরাজকতা বিলুপ্ত হতে পারে না। অপরাধ নির্মূলের জন্য পুলিশের পাহারা বসানো হোক, বিভিন্ন অধিদপ্তর খোলা হোক, কিন্তু কোনো লাভ হবে না। কারণ পুলিশ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বেশির চেয়ে বেশি দিনের আলোতে ও লোকালয়ে মানুষকে অপরাধ থেকে বাধা দিতে পারে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে এবং বনের নির্জনতায় অপরাধীকে বাধা দেওয়ার জিনিস মাত্র একটিই আর তা হলো আল্লাহর ভয়। এছাড়া অন্য কোনো জিনিসই বাধা দিতে পারে না। এই ভয় যখন আত্মা থেকে মিটে যায় তখন সমাজের পরিণতি মারাত্মক খারাপ হয়। আজ দেখুন! অপরাধ প্রতিরোধের জন্য পুলিশের পর পুলিশ দেয়া হচ্ছে, অধিদপ্তরের পর অধিদপ্তর বানানো হচ্ছে, আইনের পর আইন বানানো হচ্ছে, কিন্তু আইন আজ বাজারে পানির মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আদালত কাজ করছে, পুলিশ কাজ করছে, দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে, এগুলোর পিছনে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় হচ্ছে, অপরদিকে ঘুষের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঘুষ বন্ধের জন্য যেই কমিশন গঠন করা হয়েছে তারাই ঘুষের শিকার। কতো আর এসব অধিদপ্তর ও কমিশন প্রতিষ্ঠিত করবে। সব আইন ও সব ব্যবস্থা ভাঙ্গার ব্যবস্থা রয়েছে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোনো ফর্মূলা আবিষ্কৃত হয়নি যা অপরাধ নির্মূল করতে পারে। হ্যাঁ, আল্লাহর ভয় এবং আখেরাতের ফিকির এমন এক জিনিস যার মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল হতে পারে, জুলুম-অত্যাচার বন্ধ হতে পারে।
📄 সাহাবায়ে কেরামের তাকওয়া
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভয় ও অনুভূতিই সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে জাগ্রত করেছিলেন। এর ফলে কারো দ্বারা কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন এবং নিজের উপর শরীয়ত নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে কাকুতি মিনতি করে মাফ না চাওয়া পর্যন্ত এবং তাওবা না করা পর্যন্ত তারা শান্তি পেতেন না। অপরাধী নিজে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে নিজের উপর শাস্তি বাস্তবায়ন করাতো। বলতো, হে আল্লাহর রাসূল! যে কোনো উপায়ে হোক আমাকে পাক করুন। এজন্য যে পর্যন্ত অন্তরে আল্লাহর ভয় এবং আখারাতের ফিকির না জন্মাবে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি না জাগবে সে পর্যন্ত দুনিয়া থেকে অপরাধ নির্মূল হতে পারে না। এর জন্য যতো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হোক না কেন।