📄 এর নাম ‘তাকওয়া’
এর আরো তাফসীর করে বলেন, এক ব্যক্তি নির্জনে অবস্থান করছে। তাকে দেখার মতো সেখানে কেউ নেই। সেখানে কোনো গোনাহ করতে চাইলে বাহ্যিকভাবে কোনো প্রতিবন্ধকতাও নেই। সেই নির্জন জায়গায় তার অন্তরে গোনাহের চাহিদা সৃষ্টি হলো। কিন্তু সে চিন্তা করলো যে, কোনো মানুষ যদিও আমাকে দেখছে না, কিন্তু আমার আল্লাহ তো আমাকে দেখছেন। একদিন আমাকে তার সামনে দাঁড়াতে হবে। এ কথা চিন্তা করে সে ঐ গোনাহের কাজ ছেড়ে দিলো। এমন ব্যক্তির জন্যই এ আয়াতে দুই জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে। আর এরই নাম তাকওয়া। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কথা চিন্তা করে নিজের প্রবৃত্তির শক্তিশালী ও সুদৃঢ় চাহিদাকে ত্যাগ করার নামই তাকওয়া। সে চিন্তা করে যে, দুনিয়ার মানুষ যদিও আমাকে দেখছে না, কিন্তু একজন আমাকে ঠিকই দেখছেন। সমস্ত তরীকত ও শরীয়তেরও সার-নির্যাস এটাই যে, অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হবে যে, আমাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।
📄 আল্লাহ তা‘আলার শ্রেষ্ঠত্ব
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি যে, যে ব্যক্তি জাহান্নামকে ভয় করলো বা আযাবকে ভয় করলো বা আগুনকে ভয় করলো বরং বলেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করলো। যার অর্থ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান। সে চিন্তা করে, এ গোনাহের কারণে আল্লাহ তা'আলা আযাব দেন বা না দেন, কিন্তু আমি আল্লাহর সামনে এই গোনাহ করে কিভাবে দাঁড়াবো? যার অন্তরে কারো প্রতি সমীহ থাকে, তার মারার বা শাস্তি দেওয়ার ভয় না থাকলেও এই সমীহের কারণে তার অন্তরে ভয় সৃষ্টি হয় যে, তার সন্তুষ্টির পরিপন্থী কাজ করে তার সামনে গিয়ে আমি কিভাবে তাকে মুখ দেখাবো? এই ভয়ের নাম তাকওয়া।
📄 আমার অন্তরে আমার ওয়ালেদ মাজেদের প্রতি সমীহ
আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রহ. সারাজীবনে এক-দুইবার ছাড়া আমাকে কখনো মারেননি। এক-দুইবার তার থাপ্পড় খাওয়ার কথা মনে আছে। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থা এমন ছিলো যে, তার কামরার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় পা কেঁপে উঠতো যে, আমি কার নিকট দিয়ে যাচ্ছি? এমনটি কেন হতো? কারণ, আমার অন্তরে এই চিন্তা ছিলো যে, তার চোখের সামনে আমার এমন কোনো কাজ যেন ধরা না পড়ে যা তার মর্যাদা, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও তার আদবের পরিপন্থী। একজন মানুষের জন্য যদি অন্তরে এমন শ্রদ্ধাবোধ থাকতে পারে, তাহলে বিশ্বজগতের স্রষ্টা, যিনি সবকিছুর খালেক এবং মালেক তার ব্যাপারে অন্তরে এই শ্রদ্ধাবোধ অবশ্যই থাকা উচিত যে, মানুষ ভয় করবে আমি তার সামনে এমন কাজ এবং এমন গোনাহ করে কিভাবে দাঁড়াবো, তাকে কিভাবে মুখ দেখাবো? এ সম্পর্ককেই আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে ইরশাদ করেছেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى
'আর যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছিলো এবং নিজের প্রবৃত্তিকে মন্দ চাহিদা থেকে বাধা দিয়েছিলো।”
দেখুন জাহান্নাম এবং আযাবকে এই জন্য ভয় করতে হবে যে, তা আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের প্রকাশস্থল। আসল ভয় তো হতে হবে আল্লাহর শ্রদ্ধার কারণে। এক আরব কবি বলেন,
لا تَسْقِنِي مَاءَ الْحَيَاةِ بِذِلَّةٍ بَلْ تَسْقِنِي بِالْعِزِّكَأْسَ الْحَنْظَلِ
'আমাকে লাঞ্ছিত করে আবেহায়াতও পান করিও না। অর্থাৎ, আমি অপমানিত হয়ে আবেহায়াত পান করতেও রাজি নই। আমাকে তিতা জিনিস পান করাও, কিন্তু সম্মানের সাথে পান করাও।'
মোটকথা, যার অন্তরে আল্লাহর মারেফত রয়েছে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচতে চায়। আর যেহেতু জাহান্নাম ও আযাব আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রকাশস্থল, এজন্য তাকেও ডরায়। অন্যথায় আসল ভয়ের জিনিস তো হলো আল্লাহর অসন্তুষ্টি。
টিকাঃ
১. সূরা নাযে'আত, আয়াত-৪০
📄 দুধের মধ্যে পানি মিশানোর ঘটনা
ঘটনা বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ফারুক রাযি. তাঁর খেলাফত কালে মানুষের অবস্থা জানার জন্য রাতের বেলা ঘুরে বেড়াতেন। কারো সম্পর্কে যদি জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি উপবাসে আছে তাহলে তার সাহায্য করতেন। যদি জানতে পারতেন যে, অমুক ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ তাহলে তার বিপদ দূর করতেন। কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখলে তাকে সংশোধন করতেন। একদিন তিনি তাহাজ্জুদের সময় মদীনার অলীগলিতে ঘুরছিলেন।
এমন সময় এক ঘর থেকে দুই মহিলার কথার আওয়াজ এলো। আওয়াজে বোঝা গেলো, তাদের একজন বুড়ি এবং একজন যুবতি। বুড়ি মহিলা তার যুবতি মেয়েকে বলছে, তুমি যেই দুধ দোহন করেছো তার মধ্যে পানি মেশাও। তাহলে দুধ বেড়ে যাবে। বেশি দুধ বিক্রয় করতে পারবে। মেয়ে উত্তর দিলো, আমীরুল মু'মিনীন হযরত ওমর ফারুক রাযি. নির্দেশ জারি করেছেন, কেনো দুধ বিক্রেতা যেন দুধের মধ্যে পানি না মেশায়। তাই আমাদের পানি মেশানো উচিত নয়। উত্তরে মা বললো, আমীরুল মু'মিনীন তো এখানে বসে নেই। তুমি দুধের মধ্যে পানি মেশালে কে দেখবে? এখন অন্ধকার রাত, দেখার মতো কেউ নেই। তিনি তো তার বাড়িতে অবস্থান করছেন। তিনি কি করে জানতে পারবেন তুমি পানি মিশিয়েছো? উত্তরে মেয়ে বললো, আম্মাজান! আমীরুল মু'মিনীন তো দেখছেন না, কিন্তু আমীরুল মু'মিনীনের শাসক আল্লাহ তা'আলা দেখছেন, তাই এ কাজ আমি করবো না।
দরজার বাইরে হযরত ওমর রাযি. তাদের এ কথাবার্তা শুনছিলেন। সকাল বেলা তিনি তথ্য সংগ্রহ করলেন এ মহিলা কে এবং এই মেয়ে কে? তথ্য সংগ্রহ করার পর ঐ মেয়ের সঙ্গে তার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি.-এর বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। এবং ঐ মেয়ের সঙ্গে নিজের ছেলের বিবাহ করালেন। এই বিবাহের ফলে ঐ মেয়ের বংশে তার নাতি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয জন্ম গ্রহণ করেন। যাকে মুসলিমদের পঞ্চম খলীফায়ে রাশেদ বলা হয়। যাইহোক, ঐ মেয়ের অন্তরে এ কথা জাগে যে, যদিও আমীরুল মু'মিনীন দেখছেন না, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন। নির্জন নিরিবিলি জায়গায় রাতের অন্ধকারে অন্য কেউ না দেখলেও আল্লাহ তা'আলা ঠিকই দেখছেন। এরই নাম হলো 'তাকওয়া'।