📄 শয়তানের আক্রমণ চারদিক থেকে
আমাদের হযরত হাকীমুল উম্মত (কু.সি.) বলতেন, আল্লাহ তা'আলা যখন শয়তানকে জান্নাত থেকে বের করে দিলেন, তাকে বিতাড়িত করলেন, তখন সে আল্লাহ তা'আলার সামনে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বলেছিলো, আপনি যখন আমাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছেন এবং আমার এই দু'আও কবুল করেছেন যে, আমি কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবো তাই আমি সংকল্প করছি, যেই আদমের কারণে আমাকে জান্নাত থেকে বের হতে হলো সেই আদমের সন্তানদেরকে আমি এভাবে গোমরাহ করবো-
لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ
'আমি তাদেরকে সামনে থেকে আক্রমণ করবো, পিছন থেকে আক্রমণ করবো, বাম দিক থেকে আক্রমণ করবো, ডান দিকে থেকে আক্রমণ করবো, চর্তুদিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ করবো।"
তাই শয়তান চর্তুদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। হযরত হাকীমুল উম্মত রহ. বলেন, দুটি দিকের কথা বলতে সে ভুলে যায়, এক উপর দিক, আরেক নিচের দিক। শয়তান চর্তুদিক থেকে তো আক্রমণ করবে, তাই তার থেকে বাঁচার রাস্তা হয় উপর দিক থেকে, না হয় নিচের দিক থেকে। উপর দিক দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্ক কায়েম করা। তার সাহায্য চাওয়া, তার শরণাপন্ন হওয়া, তার অভিমুখী হওয়া এবং বলা যে, হে আল্লাহ! এই শয়তান আমাকে চর্তুদিকে থেকে ঘিরে রেখেছে, আপনি দয়া ও অনুগ্রহ করে আমাকে শয়তানের আক্রমণ থেকে রক্ষা করুন। উপরের রাস্তা শয়তানের আক্রমণ থেকে এ জন্য সংরক্ষিত যে, তা আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্ক করার রাস্তা。
টিকাঃ
১. সূরা আরাফ, আয়াত-১৭
📄 নিচের পথ সংরক্ষিত
আর নিচের পথ শয়তানের আক্রমণ থেকে এ জন্য সংরক্ষিত যে, আপনারা দৃষ্টি নত রেখে চলবেন, ডান বাম আগে পিছে এই চারদিক থেকে তো শয়তানের আক্রমণ হতে পারে, কিন্তু নিচের দিক শয়তানের আক্রমণ থেকে সংরক্ষিত। যখন আপনারা দৃষ্টি নত রেখে চলবেন তখন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে হেফাজত করবেন। এইজন্য আল্লাহ তা'আলা হুকুম দিচ্ছেন যে, নিজেদের দৃষ্টিকে নত রেখে চলো যাতে ফেৎনার শিকার না হও। যাই হোক, দৃষ্টির ফেৎনা মানুষের অত্মিক চরিত্র এবং অভ্যন্তরীণ গুণাবলীকে ধ্বংস করে। আফসোস! আজ আমাদের সমাজে এই মুসিবত এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, আল্লাহর খুব কম বান্দাই এর থেকে আত্মরক্ষা করছে। এক সমস্যা তো এই যে, চর্তুদিকে দৃষ্টি আকর্ষণকারী ও দৃষ্টি হরণকারী উপকরণ ছড়িয়ে আছে। সর্বত্র দৃষ্টিপাতের দাওয়াত লাভ হচ্ছে। এর কারণ এই যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই সমাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সেই সমাজে পর্দা ছিলো, হায়া ছিলো, সংকোচ ছিলো, মানবতার উচ্চ গুণাবলী তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো, কিন্তু আজকের সমাজে পর্দাহীনতা, নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা ও নগ্নতার প্রতিযোগিতা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। যে কারণে কোনো দিকেই দৃষ্টির আশ্রয় নেই।
📄 আল্লাহ তা‘আলার সামনে উপস্থিতির চিন্তা
দ্বিতীয় সমস্যা এই যে, সাহস দুর্বল হয়ে গেছে। একজন ঈমানদারের নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার যেই যোগ্যতা থাকা উচিত এখন তা দুর্বল হয়ে গেছে। একজন ঈমানদার সবসময় আল্লাহ তা'আলার সামনে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি সামনে রাখবে, সেই চিন্তা এখন দুর্বল হয়ে গেছে। যে কারণে চর্তুদিকে কুদৃষ্টির ফেৎনা ছড়িয়ে আছে। তবে মনে রাখবেন! শরীয়তের যে হুকুমের উপর আমল করা যে সময় কঠিন হয়ে পড়ে তখন সেই পরিমাণে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহ হয়ে থাকে এবং সে হুকুম পালন করলে সেই পরিমাণে পুরস্কার ও ছওয়াবও লাভ হয়ে থাকে।
📄 আকস্মাৎ দৃষ্টি মাফ
আরেকটি বিষয় হলো, ইচ্ছা ছাড়া এরাদা ছাড়া হঠাৎ কোনো পরনারীর উপর দৃষ্টি পড়লে সেটা আল্লাহর নিকট মাফ, এতে কোনো গোনাহ হয় না। তবে আল্লাহর হুকুম হলো, অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি পড়লে অবিলম্বে তা সরিয়ে ফেলবে। হাদীস শরীফে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَكَ النَّظْرَةُ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الثَّانِيَةَ
'প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য অর্থাৎ, এতে গোনাহ হবে না। কিন্তু যদি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করো বা প্রথম দৃষ্টিকে দীর্ঘায়িত করো তাহলে গোনাহ হবে এবং আল্লাহর দরবারে পাকড়াও হবে।"
তাই কখনো অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি পড়ে গেলে একথা চিন্তা করে অবিলম্বে দৃষ্টি সরিয়ে নিবে যে, এটা আমার আল্লাহর হুকুম। আরো চিন্তা করবে যে, যখন আমি চোখের অবৈধ ব্যবহার করছি তখন যদি আল্লাহ তা'আলা আমার দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেন আর যদি আমাকে বলা হয়, তুমি কুদৃষ্টি না ছাড়া পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি ফেরত পাবে না, তখন তো আমি হাজারবার কুদৃষ্টি ছাড়ার জন্য তৈরী হবো। তখন যদি আমি এই গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য তৈরী হতে পারি তাহলে আজও এ কথা চিন্তা করে তৈরী হতে পারি যে, আমার মালিক আমাকে এই গোনাহ করতে নিষেধ করেছেন。
টিকাঃ
১. জামেউল উসূল মিন আহাদীসির রাসূল, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৫০১৪, হাদীস নং ৪৯৫৪, শারহু মাআনিল আসার, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৫, হাদীস নং ৩৯৬৮, শু'য়াবুল ঈমান বাইহাকী কৃত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৬৫, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৭০১, কোনো কোনো বর্ণনায় لَيْسَتْ لَكَ الْأَخْرَةُ শব্দ এসেছে।