📄 লজ্জাস্থানের হেফাযত চোখের হেফাযতের উপর নির্ভরশীল
'দুই চোখে যেনা করে আর তার যেনা হলো দেখা।"
উপভোগের উদ্দেশ্যে কামনার দৃষ্টিতে কোনো পরনারীর দিকে দেখা কুদৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। শরীয়ত এটাকে নাজায়েয ও হারাম সাব্যস্ত করেছে। আপনার দৃষ্টি যখন সংরক্ষিত থাকবে তখন আপনার চিন্তা ও কল্পনাও পবিত্র হবে এবং আপনার আবেগ-অনুভূতিও পবিত্র হবে, ফলে আপনার আমলও পবিত্র হবে。
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা হুকুম দিয়েছেন-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ..
'হে মুহাম্মাদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি ঈমানদার পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন দৃষ্টিকে নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটা তোমাদের জন্য পবিত্রতা অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।'
এর মাধ্যমে বলে দিয়েছেন যে, লজ্জাস্থানের হেফাজতের পথের সূচনা হলো চোখের হেফাজত করা। চোখ যখন হেফাজতে থাকবে তখন লজ্জাস্থানও হেফাজতে থাকবে। পরিণতিতে তোমরা ব্যভিচার থেকে হেফাজতে থাকবে। এটা কোন মোল্লা-মৌলভীর নির্দেশ নয়। এটা কোনো পশ্চাদপদ ধার্মিক সন্ত্রাসীর নির্দেশ নয়, এটা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ, কুরআনে কারীমে যা তিনি বর্ণনা করেছেন。
টিকাঃ
১. মুখতাসারু ইরওয়াইল গালীল, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৪৭১, হাদীস নং ২৩৭০, গায়াতুল মুরাম, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৩২, হাদীস নং ১৮৪, বুখারী মুসলিম ও আহমদ বিন হাম্বলের উল্লেখিত অনেক বর্ণনা দ্বারা এ হাদীস সমর্থিত হয়。
২. সূরা নূর, আয়াত-৩০
📄 দূর্গ অবরোধ করা
যতোদিন পর্যন্ত মুসলিমরা এই বিধানের উপর আমল করেছে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সকল ফেৎনা ফাসাদ থেকে হেফাজত করেছেন। আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী ছাহেব রহ. থেকে এ ঘটনাটি শুনেছিলাম। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর পবিত্র যুগে হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি., যিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম উঁচু স্তরের সাহাবী এবং শাম বিজয়ী।
শামের বিরাট অঞ্চলের বিজয়মুকুট আল্লাহ তা'আলা তার মস্তকে স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি শামের গভর্ণর ছিলেন। একবার তিনি অমুসলিমদের দুর্গ আক্রমণ করেন। দুর্গ অবরোধ করেন। অবরোধ কাল দীর্ঘ হয়। দুর্গ জয় হচ্ছিলো না। অবশেষে যখন দুর্গের লোকেরা দেখলো মুসলিমরা খুব দৃঢ়তার সাথে অবরোধ করে আছে তখন তারা একটা ষড়যন্ত্র করলো। তারা বললো, আমরা আপনাদের জন্য দুর্গের দরজা খুলে দিচ্ছি আপনারা আপনাদের সৈন্য সহ শহরে প্রবেশ করুন। তাদের ষড়যন্ত্র এই ছিলো যে, শহরের ফটক যেদিকে খুলতো সেদিকে দীর্ঘ বাজার ছিলো, যার উভয়দিকে ছিলো দোকান। সেই বাজারটি শাহী মহলে গিয়ে শেষ হতো। তারা বাজারের উভয় দিকে প্রত্যেকটা দোকানে নারীদেরকে সাজিয়ে একজন করে বসিয়ে দেয়। নারীদেরকে গুরুত্বের সাথে বলে দেয় যে, এই মুজাহিদরা প্রবেশ করার পর তোমাদেরকে উত্তপ্ত করতে চাইলে, তোমাদের সাথে কোনো কিছু করতে চাইলে, তোমরা অস্বীকার করবে না, বাধা দিবে না। তারা চিন্তা করেছিলো এরা আরব ভূমি থেকে এসেছে। কয়েক মাস ধরে বাড়ি থেকে দূরে অবস্থান করছে। ভিতরে প্রবেশ করার পর আকস্মিকভাবে যখন তারা সুন্দর ও সজ্জিত নারীদেরকে দেখতে পাবে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হবে যখন তারা এদের নিয়ে ব্যস্ত হবে তখন আমরা পিছন দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ করবো।
📄 মুমিনের ফেরাসাত সম্পর্কে সতর্ক থাকো
পরিকল্পনা তৈরী করে দুর্গের তত্ত্বাবধায়ক হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.-এর নিকট এই পয়গাম পাঠায় যে, আমরা পরাজয় স্বীকার করছি এবং আপনাদের জন্য আমরা দুর্গের ফটক খুলে দিচ্ছি। আপনারা আপনাদের সৈন্য নিয়ে দুর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করুন। আল্লাহ তা'আলা যখন ঈমান দান করেন তখন ঈমানী ফেরাসাত তথা অন্তর্দৃষ্টিও দান করেন। হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
اتَّقُوْا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُوْرِ اللَّهِ
📄 পুরো সেনাবাহিনী বাজার দিয়ে অতিক্রম করলো
'তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে সতর্ক থাকো, কারণ তারা আল্লাহ তা'আলার নূর দিয়ে দেখে।”
এই সংবাদ পেয়ে হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.-এর মাথায় ধাক্কা লাগলো। তিনি চিন্তা করলেন, এতো দিন পর্যন্ত এরা মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলো, দরজা খুলছিলো না, হঠাৎ এখন কি হলো যে, তারা দরজা খুলে দেওয়ার প্রস্তাব করছে। সৈন্যদেরকে প্রবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে। অবশ্যই এর মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র আছে。
তিনি পুরো সেনাবাহিনীকে একত্রিত করলেন। তাদের সামনে খুৎবা দিলেন এবং বললেন, আল্লাহ তা'আলার শোকর দুশমন অস্ত্র সমর্পণ করেছে। তারা আমাদেরকে ভিতরে প্রবেশ করার দাওয়াত দিচ্ছে। আপনারা অবশ্যই ভিতরে প্রবেশ করবেন। তবে আমি আপনাদের সামনে কুরআনে কারীমের একটি আয়াত পাঠ করছি, আপনারা এই আয়াত পাঠ করতে করতে এবং তার উপর আমল করতে করতে প্রবেশ করবেন। তখন তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন,
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
'মুমিনদেরকে বলে দিন! তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এটা তাদের জন্য পবিত্রতার রাস্তা।"
সুতরাং সেনাবাহিনী নত চোখে দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করলো, এ অবস্থাতেই পুরো বাজার পার হয়ে গেলো এবং শাহী মহল পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। কেউ ডান-বামে চোখ তুলে তাকালো না যে, কি ফেৎনা এই দোকানগুলোতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে?
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৫২
২. সূরা নূর, আয়াত-৩০