📄 প্রশংসাপ্রীতি ভিত্তিহীন
আমার মুর্শিদ হযরত ডা. আব্দুল হাই আরেফী রহ. অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলতেন যে, প্রশংসাপ্রীতি এমন অর্থহীন জিনিস যে এর ভিত্তি অন্যের উপর। অর্থাৎ, প্রশংসা করবে অন্য মানুষ। আর অন্য মানুষ তো নিজের অধীন নয়। অন্য মানুষ প্রশংসা করতেও পারে, নাও করতে পারে। করলেও কতো দিন করবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কাউকে উপঢৌকন দিলেন। সে বললো, আপনি খুবই উদার। দুই তিন বার বলে সে থেমে যাবে। আপনি তাকে বললেন, আপনার প্রশংসা আমার খুব ভালো লেগেছে, আবার একটু বলুন তো সে আবারও প্রশংসা করলো। এতে করে আপনার পুরো ছওয়াব নষ্ট হয়ে গেলো। কিন্তু এ সবকিছু যদি শুধু আল্লাহ তা'আলার জন্য হতো তাহলে অবশ্যই আখেরাতে এর পুরস্কার লাভ হতো। আমার মুর্শিদ একটি কবিতা পাঠ করতেন, যা মনে রাখার মতো। তার উপর আমল করা হলে পদলিপ্সার ব্যাধি দূর হয়ে যাবে। কবিতাটি এই,
ختم ہو جاتی ہے حب جاہ دنیا جس کے پاس
اک ذراسی بات ہے اے دل پھر کیا اس کے پاس
পদলিলা দুনিয়াতেই যার সবকিছু শেষ হয়ে যায়
এটা তো মৌখিক প্রশংসা মাত্র, এরপরে তার কাছে আর কি থাকে?
একটু চিন্তা করে দেখুন, যে ব্যক্তি কয়েকবার প্রশংসা করলো তারপর তার কাছে আর কি থাকলো? এ বিষয়টি যদি চিন্তা করা হয় তাহলে পদলিলা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ যদি প্রশংসা লাভের পরিবর্তে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করে তাহলে সে চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর পুরস্কার লাভ করবে। আর একথাও মনে রাখবেন! যখন মানুষের উদ্দেশ্য কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা হয়, প্রশংসা কুড়ানো না হয়, তখন আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেও তার প্রশংসা করিয়ে থাকেন। একটু চিন্তা করে দেখুন, আপনি জীবনে এমন কোনো মানুষ দেখেছেন কি যার কেউ দোষ বর্ণনা করেনি? কেউ না কেউ অবশ্যই দোষ বর্ণনা করে থাকে। এমনকি নবীগণেরও দোষ বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশংসা ও নিন্দাকে উপেক্ষা করে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা পদলিন্সার অন্তর্ভুক্ত।
আমার ওয়ালেদ ছাহেব বলতেন যে, এমন ব্যক্তির প্রশংসাই গ্রহণযোগ্য, যার প্রশংসার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যেমন আপনি বড়ো কোনো কৃতিত্বের কাজ করলেন, আর একজন মেথর আপনার প্রশংসা করলো তাহলে তার প্রশংসায় আপনার কি আনন্দ লাগবে? আনন্দ লাগবে তো ঐ ব্যক্তির প্রশংসা দ্বারা, যে এ বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে জানে।
📄 এক নাপিতের ঘটনা
আমার ওয়ালেদ মাজেদ (কু.সি.) একটি ঘটনা শোনাতেন যে, এক নাপিতকে বাদশাহ ক্ষৌরকার্যের জন্য ডেকে পাঠান। নাপিত সেখানে গিয়ে দেখে বাদশাহ ঘুমিয়ে পড়েছে। নাপিত এতো দক্ষতার সাথে চুল কেটে দেয় যে, বাদশাহ বুঝতেই পারে না। সে ঘুমিয়েই থাকে। ঘুম থেকে জেগে দেখে অতি চমৎকারভাবে চুল কাটা হয়েছে। সে জিজ্ঞাসা করলো, এটা কিভাবে হয়েছে? এক ব্যক্তি বললো, নাপিত এসেছিলো আপনার ঘুমের অবস্থাতেই সে ক্ষৌরকার্য সম্পাদন করে দিয়েছে। বাদশাহ বললো, খুব দক্ষ নাপিত।
📄 সব কাজ আলাহর জন্য করবে
এজন্য হযরত থানভী রহ. বলতেন যে, কোনো কাজই মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য করো না, সব কাজ আল্লাহ তা'আলার খাতিরে করো। এর ফলে মানুষের ব্যাপারে সব ধরনের অভিযোগ শেষ হয়ে যাবে। কারণ, আজকাল চিন্তা করে যে, আমি অমুককে এতোগুলো টাকা দিলাম, কিন্তু সে একটি প্রশংসার শব্দও মুখে আনলো না। আমি অমুকের সাথে এতো সহমর্মিতা দেখালাম, কিন্তু ঐ আল্লাহর বান্দা কৃতজ্ঞতামূলক একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। এর ফলে অন্তরে অভিযোগ সৃষ্টি হয়। এসব এজন্য হয় যে, সমবেদনার সময় লক্ষ থাকে আমি তার সঙ্গে সদাচরণ করলে সে আমার প্রশংসা করবে, আমার শুকরিয়া আদায় করবে। আর যদি এটা উদ্দেশ্য না হতো বরং অন্তরে একথা থাকতো যে, আমি তো আল্লাহর জন্য দিচ্ছি। সে শুকরিয়া আদায় করুক বা না করুক, তাহলে অন্তরে কোনো প্রকার অভিযোগ সৃষ্টি হবে না। যদিও তার উচিৎ শুকরিয়া আদায় করা। কারণ, হাদীসের ভাষ্য মতো যে ব্যক্তি মানুষের শোকর আদায় করে না, সে আল্লাহর শোকর আদায় করে না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যদি শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা হতো তাহলে এ ধরনের অভিযোগ সৃষ্টি হতো না। তাই মানুষের গুরুত্বহীন সন্তুষ্টিকে পরিহার করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির ফিকির করা উচিত।
📄 পদলিপ্সার চিকিৎসা
হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব রহ. পদলিপ্সার এই চিকিৎসা বলতেন যে, যখনই এমন কোনো কাজ করবে, যার সম্পর্কে চিন্তা জাগবে যে, এর ফলে মানুষ আমার প্রশংসা করবে তখন একবার মনে মনে বলো যে, হে আল্লাহ! আমি অমুক কাজটি করতে যাচ্ছি, এতে মানুষ আমার প্রশংসা করবে, সেই প্রশংসার ফলে আমার নফসকে খারাপ হতে দিবেন না। কারণ এ প্রশংসা মূলত আপনার। আপনি তাওফীক দিয়েছেন বলে এটা আমি করতে পারছি। আমি আপনার শোকর আদায় করছি যে, মানুষ আমার প্রশংসা করছে। আপনি তাদের আত্মা থেকে আমার দোষসমূহ লুকিয়ে রেখেছেন এবং গুণ প্রকাশ করেছেন। আপনি যদি তা না করতেন আর আমার ভিতরের অবস্থা সবার সামনে চলে আসতো তাহলে মানুষ আমাকে ঘৃণা করতো। আমার পাশে বসতেও রাজী হতো না। হে আল্লাহ! এটা আপনার সাত্তার গুণের বদৌলতে হয়েছে। আপনি আমার দোষসমূহ ঢেকে দিয়ে আমার একটি আমলকে এভাবে প্রকাশ করেছেন যার ফলে মানুষ আমার প্রশংসা করছে। হে আল্লাহ! এ প্রশংসার ফলে আমার নফসকে খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করুন। এমন সব ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার কাছে এভাবে দু'আ করো তারপর দেখবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই হেফাজত করবেন।