📄 বাদশাহের উপর শাইখ আবুল হাসান রহ.-এর ইখলাসের প্রভাব
বর্ণনায় এসেছে, বাদশাহের উপর শাইখ আবুল হাসান রহ.-এর এমন প্রভাব পড়লো যে, বাদশাহ তার হাতে বাইয়াত হলেন এবং বিশেষভাবে তাকে দায়িত্ব দিলেন যে, আপনি শহরের তত্ত্বাবধান করবেন, যতো গোনাহের কাজ দেখবেন সেগুলো বিলুপ্ত করবেন। মোটকথা, কাউকে নেক কাজের কথা বলা এবং গোনাহের কাজ থেকে বাধা দেওয়া তখন প্রশংসার যোগ্য, যখন তার উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছু না হয়। এ কাজই যদি নাম, যশ, খ্যাতি ও পরহেযগার উপাধী লাভের জন্য হয় তাহলে সব মেহনত বেকার হয়ে যাবে, উল্টা গোনাহগার হবে।
📄 হযরত শাইখুল হিন্দ রহ.-এর ঘটনা
শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান ছাহেব (কু.সি.) হযরত থানভী রহ.-এর উস্তাদ ছিলেন। উঁচু মাপের বুযুর্গ ছিলেন। হযরত থানভী রহ. দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে লেখাপড়া শেষ করে কানপুরের মাদরাসায় পড়াতে আরম্ভ করেন। কানপুরের লোকদের মধ্যে বিদআত খুব জোরেশোরে চালু ছিলো। মানুষের মনোযোগ কুরাআন হাদীসের দিকে কম, মানতেক ও ফালসাফার দিকে বেশি ছিলো। পক্ষান্তরে উলামায়ে দেওবন্দের কুরআন সুন্নাহর দিকে মনোযোগ ছিলো বেশী। এজন্য তারা উলামায়ে দেওবন্দকে ছোট মনে করতো। হযরত থানভী রহ. একবার চিন্তা করলেন, আমি হযরত শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহ.-কে কানপুর আনবো। তার দ্বারা এখানে ওয়ায করাবো। যাতে মানুষ দ্বীনের হাকীকত জানতে পারে এবং এটাও জানতে পারে যে, উলামায়ে দেওবন্দ সব শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ। সুতরাং জলসা করা হলো। হযরত শাইখুল হিন্দ রহ.-কে দাওয়াত দেওয়া হলো。
সমাবেশ চলাকালে হযরত থানভী রহ. হযরত শাইখুল হিন্দ রহ.-কে ইঙ্গিতে বলেছিলেন যে, হযরত অমুক মাসআলার বিষয়ে একটু বিশেষভাবে বর্ণনা করবেন। কারণ, এখানে ঐ বিষয়ে অনেক ভুল বুঝাবুঝি ছড়িয়ে আছে। মাসআলার সম্পর্ক ছিলো মানতেক ও ফালসাফার সঙ্গে। হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. যখন বয়ান আরম্ভ করেন তখন ঐ সব লোক সেখানে এসে পৌছেনি যাদেরকে ওয়ায শোনানো উদ্দেশ্য ছিলো। কিছুক্ষণ পরেই তারা সেখানে এসে পৌছে। হযরত শাইখুল হিন্দ রহ. ঐ বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করলেন। সে সম্পর্কে খুব উচ্চাঙ্গের আলোচনা তুলে ধরলেন। বয়ান চলছিলো হঠাৎ শাইখুল হিন্দ রহ. বললেন, আমি আর আলোচনা করতে ক্ষমা চাচ্ছি এবং وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ বলে বসে পড়লেন। হযরত থানভী রহ. বলেন, আমি খুব বিচলিত হলাম, যখন আলোচনার মূল সময় এসেছে তখন হযরত বসে পড়লেন। আমি হযরতকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখন তো আলোচনার মূল সময় ছিলো কিন্তু আপনি আলোচনা শেষ করে দিলেন?
হযরত বললেন, মূলত আমার চিন্তা জাগে যে, আমি তাদের সামনে নিজের ইলম জাহির করছি। তখন যদি আমি আলোচনা অব্যাহত রাখতাম তাহলে তা আল্লাহ তা'আলার জন্য হতো না, বরং তা নিজের যোগ্যতা দেখানো ও ইলম প্রকাশ করার জন্য হতো। এমন ওয়ায বৃথা, যার দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নয় বরং নিজের ইলম জাহির করা উদ্দেশ্য হয়।
এটা কোনো মামুলি বিষয় নয় যে, মানুষ সমাবেশে আলোচনা করতে করতে একথা চিন্তা করে বসে পড়বে যে, এতক্ষণ পর্যন্ত যা বলছিলাম তা ছিলো আল্লাহর জন্য কিন্তু এখন যা বলবো তা নিজের ইলম জাহিরের জন্য হবে। মূলত পদলিলা থেকে বাঁচার জন্য এমনটি করতে হয়। যে কোনো পদ ও পদবী নিজের প্রভাব সৃষ্টির জন্য অর্জন করা খারাপ। তবে মানুষের আরামের জন্য পদ হাসিল করার অনুমতি রয়েছে।
📄 সকল বুযুর্গ বিনয়ের ফলে আলাহর ওলী হয়েছেন
কতক সময় না চাইতেও আপনা আপনি পদ-পদবী ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ হয়। এগুলো সাধারণত ঐ সব আল্লাহ ওয়ালাদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে যারা বিনয়ের মাধ্যমে নিজেদেরকে মেটাতে থাকেন। আর দুনিয়া তাদের পায়ের উপর এসে আছড়ে পড়ে। হাদীস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ اللَّهُ
'আল্লাহ তা'আলাকে খুশি করার জন্য যে বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ তা'আলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।' যতো বুযুর্গ ও আল্লাহর ওলী আছেন তারা নিজেরা তো চান আমার সম্পর্কে কেউ না জানুক। গুমনাম হয়ে থাকি। কিন্তু তাদের থেকে যেই সৌরভ ছড়ায় তা মানুষকে পাগলপারা আকর্ষণ করে। তারা তাদের চর্তুদিকে প্রাচীর খাড়া করেন কিন্তু মানুষ তাদের পায়ের উপর আছড়ে পড়ে। কারণ আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমন সুগন্ধি দান করেন যা না চাইতেই লাভ হয়েছে এবং তা আল্লাহ তা'আলার একটি বড় নেয়ামত。
টিকাঃ
১. আততারগীব ওয়াততারহীব, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৩৫১, হাদীস নং ৪০৯৫, মাজমাউয যাওয়াইদ ও মামবাউল ফাওয়াইদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৪০৪, কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২৪১, হাদীস নং ৬৩৪১, আযযাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবাইর, খণ্ডঃ১, পৃষ্ঠা-১৯১, শু'আবুল ঈমান, খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-২৭৬, হাদীস নং ৮১৪০, মুসাননাফে ইবনে আবী শাইবা, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-১৭৯, জামেউল আহাদীস, খণ্ড-৩৩, পৃষ্ঠা-২৯১, হাদীস নং ৩৬২৮১
📄 বৈধ পদের ভুল ব্যবহার
কিন্তু জায়েয পদ্ধতিতে এবং না চাইতেই যেই পদমর্যাদা লাভ হয় তা ব্যবহারে মারাত্মক ভুল ও গাফলতী হয়ে থাকে। যার দিকে মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট হয় না। ফলে মানুষ তাতে আক্রান্ত হয়ে যায়। বিষয়টি বোঝা দরকার। অনেক সময় নিজের ব্যক্তিত্ব ও পদের প্রভাব ও চাপ প্রয়োগ করে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করানো হয় যা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয।