📄 বাজার দিয়ে অতিক্রম করেছি, কিন্তু খরিদ্দার নই
এ অবস্থা দেখে হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। হযরত আবু উবাইদা রাযি. বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমার বাড়ি দেখার পর চোখের পানি ফেলা ছাড়া আপনার আর কিছু লাভ হবে না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. বললেন, হে আবু উবাইদা! দুনিয়ার এই প্রাচুর্য্য আমাদের সকলকে পাল্টে দিয়েছে, কিন্তু আল্লাহর কসম তুমি তেমনই আছো যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় ছিলে। দুনিয়া তোমার উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মূলত এঁরাই ছিলেন এই পংক্তির বাস্তব নমুনা-
بازار سے گزرا ہوں، خریدار نہیں ہوں
বাজার দিয়ে অতিক্রম করছি, কিন্তু খরিদ্দার নই।'
সারা পৃথিবী চোখের সামনে, তার মনোলোভা বস্তুসামগ্রী চোখের সামনে, দৃষ্টিনন্দন আকর্ষণ চোখের সামনে, দুনিয়ার ছড়াছড়ির মধ্যে লালিত অন্যান্য লোক চোখের সামনে, কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই তার চোখে ধরে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলার মহব্বত আত্মাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, সারা দুনিয়ার ঝলমলানি ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা সদা সর্বদা মন-মগজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। হযরত মাজযুব রহ.-এর ভাষায়-
جب مہر نمایاں ہو اسب چھپ گئے تارے تو مجھ کو بھری بزم میں تنہا نظر آیا
'চাঁদ উদিত হলে তারকারা সব অস্ত গেলো, পরিপূর্ণ আসরের মধ্যে তখন একমাত্র তোমাকেই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম।'
এসকল সাহাবায়ে কেরামের পদতলে দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে আসে। তাঁরা দুনিয়ার ভালোবাসাকে অন্তরে জায়গা দেননি। মূলত এটা ছিলো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াতের প্রভাব। তিনি বার বার সাহাবায়ে কেরামকে দুনিয়ার হাকীকতের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি দুনিয়ার নশ্বরতা, আখেরাতের অবিনশ্বরতা এবং চিরস্থায়ী নেয়ামত ও আযাবের- যার বর্ণনা দ্বারা কুরআন ও হাদীস পরিপূর্ণ- সে দিকে তাঁদেরকে মনযোগী করেছেন।
📄 একদিন মরতে হবে
মানুষ একটু চিন্তা করে দেখুক, এ দুনিয়া কয় দিনের! একদিন, দুই দিন, তিন দিন। কার জানা আছে কয়দিন সে দুনিয়ায় থাকবে? তার কি নিশ্চিত জানা আছে, আগামী ঘণ্টা বরং আগামী মুহূর্ত জীবিত থাকবো? বড়ো থেকে বড়ো বিজ্ঞানী, বড়ো থেকে বড়ো দার্শনিক, বড়ো থেকে বড়ো ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলতে পারে না যে, কতো দিন সে দুনিয়ায় থাকবে? কিন্তু এতদসত্ত্বেও মানুষ দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহে লেগে আছে। দিনরাত দুনিয়ার পিছনে দৌড়-ঝাঁপ করছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ধান্দায় দৌড়াচ্ছে। কিন্তু যেদিন ডাক আসবে সবকিছু ছেড়ে চলে যাবে। কিছুই সঙ্গে যাবে না।
📄 দুনিয়া ধোঁকার সামগ্রী
এজন্য কুরআনের আয়াত
وَمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
'দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছু নয়।"
বলছে যে, দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী। এর পিছনে এমনভাবে মগ্ন হয়ো না যে তা তোমাকে গাফেল করে দেয়। এ দুনিয়াতে জীবন কাটাবে ঠিক, কিন্তু ধোঁকা খাবে না। এ কথা যদি অন্তরে বসে যায় তারপর তোমার কুঠি- বাংলো হোক, মিলকারখানা হোক, দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জাম হোক, ধন-দৌলত হোক এবং ব্যাংক ব্যালেন্স হোক কোনো সমস্যা নেই। অন্তরে যদি এগুলোর ভালোবাসা না থাকে তাহলে তুমি যাহেদ, তুমি দুনিয়াবিরাগী। আলহামদুলিল্লাহ তখন তোমার যুহদের নেয়ামত লাভ হয়েছে।
টিকাঃ
১. সূরা আর হাদীদ, আয়াত-২০
📄 যুহদ কিভাবে লাভ হবে?
ইমাম গাযালী রহ. বলেন, সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ ঐ ব্যক্তি, যে দুনিয়াতে কামালো না তো কিছুই, থাকলো হত-দরিদ্র, কিন্তু অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ভরা। তার যুহুদের নেয়ামত লাভ হয়নি। তাকে যাহেদ বলা হবে না। কারণ দুনিয়ার প্রেম ও ভালোবাসায় সে আক্রান্ত। এমন ব্যক্তি সবচেয়ে ক্ষতির মধ্যে আছে।
এখন প্রশ্ন জাগে যে, এই গুণ কিভাবে অর্জন হবে। এটা অর্জন হওয়ার উপায় হলো, কুরআন ও হাদীসের এসব কথা নিয়ে গভীরভাবে মানুষ চিন্তা করবে। মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানোর বিষয়ে মুরাকাবা করবে। আখেরাতের নেয়ামতসমূহ এবং আখেরাতের আযাবের কথা চিন্তা করবে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের কথা ধ্যান করবে। এজন্য প্রতিদিন পাঁচ-দশ মিনিট বের করবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে দুনিয়ার ভালোবাসা আত্মা থেকে দূর হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে দুনিয়ার হাকীকত বোঝার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ