📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 সারা পৃথিবী তাদের দাসে পরিণত হয়

📄 সারা পৃথিবী তাদের দাসে পরিণত হয়


হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে একথা গেঁথে দেন যে, দুনিয়ার সঙ্গে মন লাগিও না। দুনিয়ার প্রতি অনুরাগী হয়ো না। প্রয়োজনের সময় দুনিয়াকে ব্যবহার করো কিন্তু তাকে ভালোবেসো না। এটাই কারণ যে, যখন সাহাবায়ে কেরামের দিল থেকে দুনিয়া বের হয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা সারা দুনিয়াকে তাদের গোলাম বানিয়ে দেন। কিসরা তাদের পদতলে স্তুপিকৃত হয়। কায়সার তাদের পদতলে আছড়ে পড়ে। তারা তাদের ধন দৌলতের দিকে চোখ তুলেও দেখেননি।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 শামের গভর্ণর হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.

📄 শামের গভর্ণর হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.


হযরত ওমর রাযি.-এর যামানায় হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.-কে শামের গভর্ণর বানানো হয়। কারণ, শামের বেশির ভাগ অঞ্চল তিনি জয় করেন। তখন শাম ছিলো অনেক বড়ো অঞ্চল। সেই শাম এখন চার দেশে বিভক্ত- সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন। তখন এই চার দেশ মিলে ইসলামী সামরাজ্যের একটি প্রদেশ ছিলো। আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ ছিলেন তার গভর্ণর। শাম প্রদেশটি ছিলো অত্যন্ত উর্বর। ধন-দৌলতের ছড়াছড়ি ছিলো। রোমানদের অত্যন্ত পছন্দনীয় ও কাঙ্খিত অঞ্চল ছিলো। হযরত ওমর রাযি. মদীনা মুনাওওয়ারায় বসে পুরো আলমে ইসলাম পরিচালনা করছিলেন। একবার তিনি পরিদর্শনের জন্য শামে সফরে বের হন। শাম সফরকালে একবার হযরত ওমর রাযি. বললেন, হে আবু উবাইদা! আমার মন চাচ্ছে আমি আমার ভাইয়ের ঘর দেখি যেখানে তুমি থাকো।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 শামের গভর্ণরের বাসস্থান

📄 শামের গভর্ণরের বাসস্থান


হযরত ওমর রাযি. চিন্তা করেছিলেন যে, আবু উবাইদা এতো বড়ো প্রদেশের গভর্ণর হয়েছে। এখানে প্রচুর পরিমাণ ধন দৌলত রয়েছে। এজন্য তার বাড়ি দেখা উচিত। সে কতো কিছু সঞ্চয় করেছে।

হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি. উত্তর দিলেন, আমীরুল মু'মিনীন! আপনি আমার ঘর দেখে কি করবেন? কারণ আমার ঘর দেখে অশ্রু বর্ষণ করা ছাড়া আপনার আর কোনো লাভ হবে না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. পীড়াপীড়ি করলেন, আমি দেখতে চাই। হযরত আবু উবাইদা রাযি. আমীরুল মু'মিনীনকে নিয়ে গেলেন। শহরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে শহরের বসতী এলাকা শেষ হলে হযরত ওমর রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? হযরত আবু উবাইদা উত্তর দিলেন, এখন তো কাছে চলে এসেছি। দুনিয়ার মাল আসবাবে ভরা জাঁকজমকপূর্ণ দামেশক নগরী অতিক্রম করে শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে খেজুরের পাতার তৈরী একটি ঝুপড়ি দেখালেন এবং বললেন, আমীরুল মু'মিনীন আমি এর মধ্যে বসবাস করি। হযরত ওমর ফারুক রাযি. ভিতরে প্রবেশ করে চর্তুদিকে দৃষ্টি বুলালেন। একটি জায়নামায ছাড়া সেখানে আর কিছু দেখতে পেলেন না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু উবাইদা! তুমি এর মধ্যে থাকো? এখানে তো কোনো সাজ-সরঞ্জাম, কোনো পাত্র এবং পানাহার ও ঘুমানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে তুমি কিভাবে থাকো?

তিনি উত্তর দিলেন, আমীরুল মু'মিনীন আলহামদুলিল্লাহ আমার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই এখানে আছে। এই যে জায়নামায আছে, এর উপর নামায পড়ি। রাতের বেলা এর উপর ঘুমাই। তারপর চালের দিকে হাত বাড়িয়ে একটি পাত্র বের করলেন, যা দেখা যাচ্ছিলো না। পাত্রটি দেখিয়ে বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! এই যে পাত্র রয়েছে। হযরত ওমর ফারুক রাযি. দেখলেন, পাত্রের মধ্যে পানি ভরা রয়েছে। তার মধ্যে শুকনা রুটির টুকরা ভিজানো রয়েছে। হযরত আবু উবাইদা রাযি. বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আমি রাতদিন সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকি, খানার আয়োজন করার অবসর পাই না। এক মহিলা আমার জন্য দুই-তিন দিনের রুটি এক বেলা রান্না করে দিয়ে যায়। আমি এই পাত্রের মধ্যে রুটিগুলো রেখে দেই। রুটি যখন শুকিয়ে যায় তখন পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখি, রাতে ঘুমানোর সময় খেয়ে নেই।'

টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৭

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 বাজার দিয়ে অতিক্রম করেছি, কিন্তু খরিদ্দার নই

📄 বাজার দিয়ে অতিক্রম করেছি, কিন্তু খরিদ্দার নই


এ অবস্থা দেখে হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। হযরত আবু উবাইদা রাযি. বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আমি তো আপনাকে পূর্বেই বলেছিলাম যে, আমার বাড়ি দেখার পর চোখের পানি ফেলা ছাড়া আপনার আর কিছু লাভ হবে না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. বললেন, হে আবু উবাইদা! দুনিয়ার এই প্রাচুর্য্য আমাদের সকলকে পাল্টে দিয়েছে, কিন্তু আল্লাহর কসম তুমি তেমনই আছো যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় ছিলে। দুনিয়া তোমার উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মূলত এঁরাই ছিলেন এই পংক্তির বাস্তব নমুনা-
بازار سے گزرا ہوں، خریدار نہیں ہوں
বাজার দিয়ে অতিক্রম করছি, কিন্তু খরিদ্দার নই।'

সারা পৃথিবী চোখের সামনে, তার মনোলোভা বস্তুসামগ্রী চোখের সামনে, দৃষ্টিনন্দন আকর্ষণ চোখের সামনে, দুনিয়ার ছড়াছড়ির মধ্যে লালিত অন্যান্য লোক চোখের সামনে, কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই তার চোখে ধরে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলার মহব্বত আত্মাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, সারা দুনিয়ার ঝলমলানি ধোঁকা দিতে পারে না। আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা সদা সর্বদা মন-মগজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। হযরত মাজযুব রহ.-এর ভাষায়-
جب مہر نمایاں ہو اسب چھپ گئے تارے تو مجھ کو بھری بزم میں تنہا نظر آیا
'চাঁদ উদিত হলে তারকারা সব অস্ত গেলো, পরিপূর্ণ আসরের মধ্যে তখন একমাত্র তোমাকেই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম।'

এসকল সাহাবায়ে কেরামের পদতলে দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে আসে। তাঁরা দুনিয়ার ভালোবাসাকে অন্তরে জায়গা দেননি। মূলত এটা ছিলো নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াতের প্রভাব। তিনি বার বার সাহাবায়ে কেরামকে দুনিয়ার হাকীকতের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তিনি দুনিয়ার নশ্বরতা, আখেরাতের অবিনশ্বরতা এবং চিরস্থায়ী নেয়ামত ও আযাবের- যার বর্ণনা দ্বারা কুরআন ও হাদীস পরিপূর্ণ- সে দিকে তাঁদেরকে মনযোগী করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00