📄 সারা পৃথিবী মশার পাখার সমানও নয়
এক হাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لَوْ كَانَتْ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا غَرْبَةً
আল্লাহ তা'আলার নিকট এ দুনিয়ার মূল্য যদি মশার একটি পাখার সমানও হতো তাহলে কোনো কাফেরকে দুনিয়ার এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না।
তোমরা দেখছো যে, দুনিয়ার দৌলত কাফেররা খুব লাভ করছে, তারা খুব ভোগ বিলাসে আছে, অথচ তারা আল্লাহর নাফরমানী করছে, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে তা সত্ত্বেও তারা দুনিয়া লাভ করছে, এর কারণ এই যে, আল্লাহ তা'আলার নিকট এ দুনিয়ার কোনো মূল্য নেই। মশার একটি পাখার সমানও সারা পৃথিবীর দাম নেই। দুনিয়ার মূল্য যদি মশার একটি ডানার সমানও হতো তাহলে কাফেরদেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না।
একবার হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পথ চলছিলেন। পথে তিনি একটি কান কাটা ছাগলের মৃত বাচ্চা পড়ে থাকতে দেখলেন। যা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিলো। তিনি ঐ কান কাটা, মরা বকরীর বাচ্চার দিকে ইশারা করে সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি এই মরা বাচ্চাটিকে এক দিরহামের বিনিময়ে খরিদ করবে? সাহাবায়ে কেরাম নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ এই বাচ্চা যদি জীবিতও হতো তবুও কেউ এক দিরহামের বিনিময়ে এটা নিতে প্রস্তুত হতো না। আর এখন তো এটা মরা। এই লাশ নিয়ে আমরা কি করবো? এরপর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই পুরো দুনিয়া এবং তার ধন দৌলত আল্লাহ তা'আলার নিকট এরচে' অধিক মূল্যহীন ও নগণ্য, যেই পরিমাণ মূল্যহীন ও নগণ্য তোমাদের নিকট বকরীর এই মরা বাচ্চা।'
টিকাঃ
২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২২৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০০
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫২৫৭, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৪৪০২
📄 সারা পৃথিবী তাদের দাসে পরিণত হয়
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে একথা গেঁথে দেন যে, দুনিয়ার সঙ্গে মন লাগিও না। দুনিয়ার প্রতি অনুরাগী হয়ো না। প্রয়োজনের সময় দুনিয়াকে ব্যবহার করো কিন্তু তাকে ভালোবেসো না। এটাই কারণ যে, যখন সাহাবায়ে কেরামের দিল থেকে দুনিয়া বের হয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা সারা দুনিয়াকে তাদের গোলাম বানিয়ে দেন। কিসরা তাদের পদতলে স্তুপিকৃত হয়। কায়সার তাদের পদতলে আছড়ে পড়ে। তারা তাদের ধন দৌলতের দিকে চোখ তুলেও দেখেননি।
📄 শামের গভর্ণর হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.
হযরত ওমর রাযি.-এর যামানায় হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি.-কে শামের গভর্ণর বানানো হয়। কারণ, শামের বেশির ভাগ অঞ্চল তিনি জয় করেন। তখন শাম ছিলো অনেক বড়ো অঞ্চল। সেই শাম এখন চার দেশে বিভক্ত- সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন। তখন এই চার দেশ মিলে ইসলামী সামরাজ্যের একটি প্রদেশ ছিলো। আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ ছিলেন তার গভর্ণর। শাম প্রদেশটি ছিলো অত্যন্ত উর্বর। ধন-দৌলতের ছড়াছড়ি ছিলো। রোমানদের অত্যন্ত পছন্দনীয় ও কাঙ্খিত অঞ্চল ছিলো। হযরত ওমর রাযি. মদীনা মুনাওওয়ারায় বসে পুরো আলমে ইসলাম পরিচালনা করছিলেন। একবার তিনি পরিদর্শনের জন্য শামে সফরে বের হন। শাম সফরকালে একবার হযরত ওমর রাযি. বললেন, হে আবু উবাইদা! আমার মন চাচ্ছে আমি আমার ভাইয়ের ঘর দেখি যেখানে তুমি থাকো।
📄 শামের গভর্ণরের বাসস্থান
হযরত ওমর রাযি. চিন্তা করেছিলেন যে, আবু উবাইদা এতো বড়ো প্রদেশের গভর্ণর হয়েছে। এখানে প্রচুর পরিমাণ ধন দৌলত রয়েছে। এজন্য তার বাড়ি দেখা উচিত। সে কতো কিছু সঞ্চয় করেছে।
হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযি. উত্তর দিলেন, আমীরুল মু'মিনীন! আপনি আমার ঘর দেখে কি করবেন? কারণ আমার ঘর দেখে অশ্রু বর্ষণ করা ছাড়া আপনার আর কোনো লাভ হবে না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. পীড়াপীড়ি করলেন, আমি দেখতে চাই। হযরত আবু উবাইদা রাযি. আমীরুল মু'মিনীনকে নিয়ে গেলেন। শহরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে শহরের বসতী এলাকা শেষ হলে হযরত ওমর রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? হযরত আবু উবাইদা উত্তর দিলেন, এখন তো কাছে চলে এসেছি। দুনিয়ার মাল আসবাবে ভরা জাঁকজমকপূর্ণ দামেশক নগরী অতিক্রম করে শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে খেজুরের পাতার তৈরী একটি ঝুপড়ি দেখালেন এবং বললেন, আমীরুল মু'মিনীন আমি এর মধ্যে বসবাস করি। হযরত ওমর ফারুক রাযি. ভিতরে প্রবেশ করে চর্তুদিকে দৃষ্টি বুলালেন। একটি জায়নামায ছাড়া সেখানে আর কিছু দেখতে পেলেন না। হযরত ওমর ফারুক রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু উবাইদা! তুমি এর মধ্যে থাকো? এখানে তো কোনো সাজ-সরঞ্জাম, কোনো পাত্র এবং পানাহার ও ঘুমানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে তুমি কিভাবে থাকো?
তিনি উত্তর দিলেন, আমীরুল মু'মিনীন আলহামদুলিল্লাহ আমার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই এখানে আছে। এই যে জায়নামায আছে, এর উপর নামায পড়ি। রাতের বেলা এর উপর ঘুমাই। তারপর চালের দিকে হাত বাড়িয়ে একটি পাত্র বের করলেন, যা দেখা যাচ্ছিলো না। পাত্রটি দেখিয়ে বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! এই যে পাত্র রয়েছে। হযরত ওমর ফারুক রাযি. দেখলেন, পাত্রের মধ্যে পানি ভরা রয়েছে। তার মধ্যে শুকনা রুটির টুকরা ভিজানো রয়েছে। হযরত আবু উবাইদা রাযি. বললেন, আমীরুল মু'মিনীন! আমি রাতদিন সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকি, খানার আয়োজন করার অবসর পাই না। এক মহিলা আমার জন্য দুই-তিন দিনের রুটি এক বেলা রান্না করে দিয়ে যায়। আমি এই পাত্রের মধ্যে রুটিগুলো রেখে দেই। রুটি যখন শুকিয়ে যায় তখন পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখি, রাতে ঘুমানোর সময় খেয়ে নেই।'
টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৭