📄 এ ঘটনা থেকে শিক্ষা অর্জন করুন
আমাদের মতো মানুষদের জন্য এ ঘটনা থেকে এ শিক্ষা গ্রহণ করা তো ঠিক নয় যে, তারা যেমন সবকিছু ছেড়ে আল্লাহর দ্বীনের জন্য বের হয়ে পড়েছেন আমরাও তেমনি বের হয়ে যাবো। আমাদের মতো দুর্বল মানুষদের জন্য এই পন্থা অবলম্বন করা সমীচীন নয়। তবে এ ঘটনা থেকে যে বিষয় শিক্ষা নেওয়া উচিত তা হলো, মানুষের আত্মা যদি দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জামের মধ্যে এবং দুনিয়ার আরাম আয়েশের মধ্যে আটকা থাকে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুনিয়া উপার্জনের দৌড়-ঝাঁপে মগ্ন থাকে, এমন অন্তরে আল্লাহ তা'আলার মহব্বত আসতে পারে না। আল্লাহ তা'আলার মহব্বত যখন অন্তরে আসে তখন মানুষের কাছে দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জাম থাকে ঠিক, কিন্তু সেগুলোর সাথে আত্মা আটকা থাকে না।
📄 আমার ওয়ালেদ মাজেদ রহ. ও দুনিয়ার মহব্বত
আল্লাহ তা'আলা আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী ছাহেব (কু.সি.)-এর ব্যক্তি সত্তার মধ্যে আমাদেরকে শরীয়ত ও তরীকতের অসংখ্য নমুনা দেখিয়েছেন। আমরা যদি তাকে না দেখতাম তাহলে আমাদের বুঝে আসতো না যে, সুন্নাতের বাস্তব জীবন কেমন হয়ে থাকে? তিনি দুনিয়াতে থেকে সব কাজ করেছেন। দরস্-তাদরীস করেছেন, ফতওয়া লিখেছেন, গ্রন্থ রচনা করেছেন, ওয়ায ও তাবলীগ করেছেন, পীর মুরীদি করেছেন, একই সাথে পরিবার পরিজনের হক আদায় এবং জীবিকার ব্যবস্থার জন্যে ব্যবসাও করেছেন। কিন্তু এতো সব সত্ত্বেও আমি দেখেছি তার অন্তরে সরীষা দানার পরিমাণ দুনিয়ার মহব্বত প্রবেশ করেনি।
📄 ঐ বাগান আমার আত্মা থেকে বের হয়ে গেছে
আমার ওয়ালেদ মাজেদের বাগান বানানোর খুব শখ ছিলো। পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে দেওবন্দেই খুব আগ্রহের সাথে একটি বাগান তৈরী করেন। দারুল উলূম দেওবন্দের চাকরির সময় বেতন কম এবং পোষ্য বেশি ছিলো। ঐ বেতন দিয়ে অতি কষ্টে দিনাতিপাত হতো। কিন্তু তা থেকেই অতি কষ্টে কিছু ব্যবস্থা করে আমের বাগান লাগান। এ বাগানে প্রথম যখন ফল আসে ঐ বছরই পাকিস্তান হওয়ার ঘোষণা হয়। তিনি হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। হিজরত করে পাকিস্তানে আসেন। ঐ বাগান এবং বাড়ি হিন্দুরা দখল করে নেয়। পরবর্তীতে অনেক বার হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের মুখে এ বাক্য শুনেছি যে, যেদিন আমি ঐ বাড়ি ও বাগান থেকে পা বের করেছি, সেদিন থেকে ঐ বাগান ও বাড়ি আমার আত্মা থেকে বের হয়ে গেছে। ভুলেও আমার অন্তরে কখনো চিন্তা জাগেনি যে, আমি কেমন বাগান বানিয়েছিলাম এবং কেমন ঘর তৈরী করেছিলাম। এর কারণ এই ছিলো যে, এসব কাজ তিনি অবশ্যই করেছিলেন, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিলো পোষ্যদের হক আদায় করা। এগুলোর সাথে তার আত্মা আটকা ছিলো না।
📄 দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে চলে আসে
সারাজীবন হযরত ওয়ালেদ ছাহেবের এ নিয়ম দেখেছি যে, যখনই কোনো ব্যক্তি কোনো জিনিসের ব্যাপারে বিনা কারণে তার সাথে ঝগড়া করতো তখনই হযরত ওয়ালেদ ছাহেব হকের উপর থাকা সত্ত্বেও বলতেন, আরে ভাই! ঝগড়া বাদ দাও, এটা নিয়ে যাও। নিজের হক ছেড়ে দিতেন। তিনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী শোনাতেন,
وَمَنْ تَرَكَ الْبَرَاءَ وَهُوَ مُحِقِّ بُنِي لَهُ فِي وَسَطِهَا
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঐ ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘর দেওয়ানোর দায়িত্ব নিচ্ছি, যে সত্যের উপর থেকেও ঝগড়া পরিহার করবে।"
হযরত ওয়ালেদ ছাহেবকে সারাজীবন এ হাদীসের উপর আমল করতে দেখেছি। অনেক সময় আমাদের মনে হতো, তিনি হকের উপর আছেন, অটল থাকলে তিনি নিজের হক পেয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি হক ছেড়ে দিয়ে চলে আসতেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা তাকে দুনিয়াও দান করেন। এমন লোকদের কাছে দুনিয়া লাঞ্ছিত হয়ে আসে, যেমন হাদীস শরীফে এসেছে,
أَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি একবার এ দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আল্লাহ তা'আলা তার নিকট দুনিয়াকে অপমানিত করে দেন। দুনিয়া তার পায়ের উপরে এসে আছড়ে পড়ে। কিন্তু তার অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত থাকে না।'
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৯১৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৫০
২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৮৯, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪০৯৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২০৬০৮, সুনানে দারেমী, হাদীস নং ২৩১