📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়ার জীবন যেন ধোঁকায় না ফেলে

📄 দুনিয়ার জীবন যেন ধোঁকায় না ফেলে


দ্বীনের শিক্ষা মূলত এই যে, এ সমস্ত ধন সম্পদ ও সাজ সরঞ্জামও জরুরী এবং এমনই জরুরী যেমন টয়লেট জরুরী। কিন্তু তার চিন্তা, তার ভালোবাসা ও তার কল্পনা যেন মন মগজকে আচ্ছন্ন করে না রাখে। এটা হলো দুনিয়ার হাকীকত। এজন্য বুযুর্গগণ বলেছেন, দুনিয়ার হাকীকত সব সময় স্মরণ রাখবে। আমি যেই আয়াত আপনাদের সামনে এখন তিলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيُوةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'হে লোক সকল! নিশ্চিত বিশ্বাস করো যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, তাই দুনিয়ার এ জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে এবং আল্লাহর বিষয়ে তোমাদেরকে সেই (শয়তানও) যেন ধোঁকায় না ফেলতে পারে, যে বড় প্রতারক।"

হে লোক সকল! আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আল্লাহর ওয়াদা কি? সেই ওয়াদা হলো একদিন তুমি মরবে। তার সামনে তোমাকে উপস্থিত হতে হবে। তোমাকে সমস্ত আমলের জওয়াব দিতে হবে। এজন্য দুনিয়ার জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। আর সেই ধোঁকাবাজ অর্থাৎ শয়তান যেন তোমাকে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকায় না ফেলে। শরীয়তের শিক্ষা হলো দুনিয়াতে অবস্থান করো কিন্তু তার দ্বারা ধোঁকা খেয়ো না। কারণ এটা পরীক্ষার জায়গা। এখানে এমন অনেক দৃশ্য রয়েছে, যা মানুষের আত্মাকে আকৃষ্ট করে। মোহগ্রস্থ করে। তাই মনোহরী এসব দৃশ্যের ভালোবাসাকে অন্তরে জায়গা দিও না। দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থা হলেও কোনো সমস্যা নেই, যদি তার সঙ্গে আত্মা যুক্ত না হয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর ঘটনা

📄 শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর ঘটনা


আল্লাহর কতক বান্দা এমন আছেন, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য কতক সূক্ষ্ম শক্তিকে তাদের কাছে পাঠিয়ে থাকেন। এসব সূক্ষ্ম শক্তিকে পাঠানোর উদ্দেশ্য থাকে এ বান্দাকে দুনিয়ার মহব্বত থেকে বের করে নিজের মহব্বতের দিকে নিয়ে আসা। হযরত শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. বিখ্যাত বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর ঘটনা আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (কু.সি.) থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. ইউনানী ঔষধ ও আতরের অনেক বড়ো ব্যবসায়ী ছিলেন। এ কারণেই তাকে 'আত্তার' বলা হয়। তার ঔষধ ও আতরের অনেক বড়ো দোকান ছিলো। সুবিস্তৃত কারবার ছিলো। তখন তিনি একজন সাধারণ কিসিমের দুনিয়াদার ব্যবসায়ী ছিলেন। একদিন তিনি দোকানে বসা ছিলেন। দোকান ঔষধ ও আতরের শিশি দ্বারা পরিপূর্ণ ছিলো। এমন সময় একজন মাজযুব ধরনের দরবেশ ও মালং কিসিমের মানুষ দোকানে এলেন। তিনি দোকানের ভিতরে প্রবেশ করলেন। দোকানের ভিতরে দাঁড়িয়ে পুরো দোকান কখনো উপর থেকে নিচের দিকে দেখছিলেন, কখনো ডান থেকে বাম দিকে দেখছিলেন। কখনো ঔষধ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কখনো এক শিশি দেখছিলেন, কখনো অন্য শিশি দেখছিলেন। এভাবে যখন অনেক সময় পার হয়ে গেলো তখন শাইখ ফরীদ উদ্দীন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি দেখছো? কোন জিনিস তালাশ করছো? ঐ দরবেশ উত্তর দিলেন, এমনিই শিশিগুলো দেখছি। শাইখ ফরীদ উদ্দীন জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কিছু কেনার ইচ্ছা আছে কি? তিনি উত্তর দিলেন, না আমার কিছু কেনার ইচ্ছা নেই। এমনিতেই দেখছি। তারপর আবার আলমারীতে সংরক্ষিত শিশিগুলোর দিকে দেখছিলেন। বার বার দেখছিলেন। শাইখ ফরীদ উদ্দীন আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই তুমি দেখছোটা কি? তখন ঐ দরবেশ বললেন, আমি আসলে দেখছি, আপনি যখন মরা যাবেন তখন আপনার জান কীভাবে বের হবে? কারণ, আপনি এখানে এতগুলো শিশি রেখেছেন, আপনার মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসবে তখন আপনার রূহ কখনো এই শিশির মধ্যে প্রবেশ করবে, কখনো ঐ শিশির মধ্যে প্রবেশ করবে, তখন সে বের হওয়ার রাস্তা কোথায় পাবে?

বলা বাহুল্য যে, শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. তখন একজন দুনিয়াদার ব্যবসায়ী ছিলেন। এসব কথা শুনে তার রাগ হলো। তিনি বললেন, তুমি আমার জানের চিন্তা করছো তোমার জান কীভাবে বের হবে? তোমার জান যেভাবে বের হবে, আমারটাও সেভাবে বের হবে। ঐ দরবেশ উত্তর দিলেন, আমার জান বের হতে তো কোনো পেরেশানী নেই। কারণ আমার কাছে তো কিছু নেই। আমার কাছে ব্যবসা, দোকান, শিশি, সাজ-সরঞ্জাম কিছুই নেই। আমার জান তো এভাবে বের হয়ে যাবে। একথা বলে ঐ দরবেশ দোকানের বাইরে মাটির উপর শুয়ে পড়লেন। কালিমায়ে শাহাদাত আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বললেন এবং তার রূহ উড়ে গেলো।

এ ঘটনা দেখা মাত্র হযরত শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর অন্তরে বড়ো আঘাত লাগলো। তিনি চিন্তা করলেন, বাস্তবকই তো আমি রাত-দিন দুনিয়ার কারবার নিয়েই নিমগ্ন রয়েছি এবং এতেই ব্যস্ত রয়েছি। আল্লাহ তা'আলার দিকে কোনো মনযোগ নেই। আর আল্লাহর এ বান্দা কতো সহজে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন। যাই হোক, ইনি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি গাইবী লতীফা ছিলেন, যিনি তার হেদায়েতের কারণ হলেন। সেদিনই তিনি নিজের সব কায়কারবার অন্যদের হাতে ন্যস্ত করলেন। আল্লাহ তা'আলা হেদায়েত দান করলেন। আল্লাহর পথে অবিচল থেকে এতো বড়ো শাইখ হলেন যে, তিনি দুনিয়াবাসীর হেদায়েতের উপকরণ হলেন。

টিকাঃ
১. সূরা ফাতের, আয়াত-৫

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ.-এর ঘটনা

📄 হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ.-এর ঘটনা


শাইখ ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ. এক অঞ্চলের বাদশাহ ছিলেন। রাতে দেখলেন তার মহলের ছাদের উপর এক ব্যক্তি বিচরণ করছে। তিনি মনে করলেন হয়তো কোনো চোর হবে, চুরি করার ইচ্ছায় এসেছে। ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এখানে কোথেকে এলে? কি করছো এখানে? সে বললো, আমার একটি উট হারিয়ে গেছে, সেই উট তালাশ করছি। হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ. বললেন, তোমার মাথা ঠিক আছে কি? মহলের ছাদের উপর উট কোথায়? তোমার উট যদি হারিয়ে যেয়ে থাকে তাহলে বন জঙ্গলে গিয়ে খোঁজো। মহলের ছাদের উপর উট খোঁজা তো আহাম্মকী। তুমি তো আহাম্মক মানুষ দেখছি! লোকটি বললো, মহলের ছাদের উপর যদি উট পাওয়া না যায় তাহলে মহলের মধ্যে আল্লাহকেও পাওয়া যাবে না। আমি যদি আহাম্মক হয়ে থাকি তাহলে তুমি আমার চেয়ে বড়ো আহাম্মক। মহলের মধ্যে থেকে আল্লাহকে তালাশ করা এর চে' বড়ো আহাম্মকী। এ কথা বলা মাত্র তার অন্তরে মারাত্মক আঘাত লাগলো। বাদশাহী ছেড়ে বের হয়ে গেলেন। ইনিও আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবী লতীফা ছিলেন।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 এ ঘটনা থেকে শিক্ষা অর্জন করুন

📄 এ ঘটনা থেকে শিক্ষা অর্জন করুন


আমাদের মতো মানুষদের জন্য এ ঘটনা থেকে এ শিক্ষা গ্রহণ করা তো ঠিক নয় যে, তারা যেমন সবকিছু ছেড়ে আল্লাহর দ্বীনের জন্য বের হয়ে পড়েছেন আমরাও তেমনি বের হয়ে যাবো। আমাদের মতো দুর্বল মানুষদের জন্য এই পন্থা অবলম্বন করা সমীচীন নয়। তবে এ ঘটনা থেকে যে বিষয় শিক্ষা নেওয়া উচিত তা হলো, মানুষের আত্মা যদি দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জামের মধ্যে এবং দুনিয়ার আরাম আয়েশের মধ্যে আটকা থাকে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুনিয়া উপার্জনের দৌড়-ঝাঁপে মগ্ন থাকে, এমন অন্তরে আল্লাহ তা'আলার মহব্বত আসতে পারে না। আল্লাহ তা'আলার মহব্বত যখন অন্তরে আসে তখন মানুষের কাছে দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জাম থাকে ঠিক, কিন্তু সেগুলোর সাথে আত্মা আটকা থাকে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00