📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুই ভালোবাসা একত্রিত হতে পারে না

📄 দুই ভালোবাসা একত্রিত হতে পারে না


দুনিয়া তোমার চর্তুপাশ্বে থাকবে কিন্তু তার ভালোবাসা তোমার অন্তরে প্রবেশ করবে না, এরই নাম 'যুহদ'। কারণ দুনিয়ার মহব্বত যদি তোমার অন্তরে প্রবেশ করে তাহলে আল্লাহর মহব্বতের জন্য অন্তরে জায়গা থাকবে না। আল্লাহর মহব্বত দুনিয়ার মহব্বতের সাথে একত্রিত হতে পারে না। আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব (কু.সি.) একটি শের শোনাতেন। সম্ভবত হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মোহাজেরে মক্কী রহ.-এর শাইখ হযরত মিয়াঁজী নূর মুহাম্মাদ রহ.-এর শের বলে তিনি উল্লেখ করতেন। এ শেরের মাকামও তাঁর পর্যায়েরই। তিনি বলেন,
بھر رہا ہے دل میں حب جاہ و مال کب سماوے اس میں حب ذو الجلال
অর্থাৎ, ধন-দৌলত ও পদ-পদবীর ভালোবাসায় যখন আত্মা পরিপূর্ণ, তখন তাতে আল্লাহর মহব্বতের জায়গা কি করে হবে?

এজন্য এই দুনিয়ার ভালোবাসা আত্মা থেকে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়াকে বের করে দেওয়া জরুরী নয়, দুনিয়াকে পরিত্যগ করা জরুরী নয়, দুনিয়ার ভালোবাসা বের করা জরুরী। দুনিয়া যদি থাকে আর তার ভালোবাসা না থাকে সেই দুনিয়া ক্ষতিকর নয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত টয়লেটের মতো

📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত টয়লেটের মতো


সাধারণত এ বিষয়টি বুঝে আসে না যে, একদিকে মানুষ এ দুনিয়াকে জরুরীও মনে করবে, তাকে গুরুত্বপূর্ণও মনে করবে, কিন্তু তার ভালোবাসা অন্তরে থাকবে না, তা কি করে সম্ভব! বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝুন। আপনি যখন কোনো বাড়ি বানান, সেই বাড়ির বিভিন্ন অংশ থাকে। একটি কামরা থাকে ঘুমানোর, একটি থাকে সাক্ষাতের, একটি খানা খাওয়ার ইত্যাদি। সে বাড়িতেই আপনি একটি টয়লেটও বানান। টয়লেট ছাড়া বাড়ি অসম্পূর্ণ। একটি জাঁকজমকপূর্ণ বাড়ি রয়েছে, তার কামরা সুন্দর, বেড রুম খুব উন্নত মানের, ড্রইং রুমও উন্নত মানের, ডাইনিং রুমও উন্নত মানের, পুরো ঘরে অনেক দামী দামী ফার্নিচার সাজানো রয়েছে, কিন্তু তাতে টয়লেট নেই, বলুন! সে বাড়ি কি পরিপূর্ণ, না অসম্পূর্ণ? বলা বাহুল্য যে, সে বাড়িটি অসম্পূর্ণ। টয়লেট ছাড়া কোনো বাড়ি পরিপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু বলুন, এমন কোনো মানুষ আছে কি, যার আত্মা সব সময় টয়লেটের সাথে সংযুক্ত থাকবে? তার মন-মস্তিষ্কে সব সময় এ চিন্তা বিরাজ করবে যে, কখন আমি টয়লেটে যাবো, কখন তাতে বসবো, কিভাবে বসবো, কতক্ষণ বসবো, কখন বের হয়ে আসবো? বলা বাহুল্য যে, কোনো মানুষই নিজের মন-মস্তিষ্কে টয়লেটকে এভাবে চাপিয়ে দিবে না। কখনই নিজের অন্তরে তাকে জায়গা দিবে না। যদিও সে জানে টয়লেট জরুরী জিনিস। এটা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সব সময় সে এ চিন্তায় থাকবে না যে, আমি টয়লেটকে কি করে সাজাবো, কিভাবে আরামদায়ক বানাবো। কারণ, টয়লেটের ভালোবাসা অন্তরে নেই।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়ার জীবন যেন ধোঁকায় না ফেলে

📄 দুনিয়ার জীবন যেন ধোঁকায় না ফেলে


দ্বীনের শিক্ষা মূলত এই যে, এ সমস্ত ধন সম্পদ ও সাজ সরঞ্জামও জরুরী এবং এমনই জরুরী যেমন টয়লেট জরুরী। কিন্তু তার চিন্তা, তার ভালোবাসা ও তার কল্পনা যেন মন মগজকে আচ্ছন্ন করে না রাখে। এটা হলো দুনিয়ার হাকীকত। এজন্য বুযুর্গগণ বলেছেন, দুনিয়ার হাকীকত সব সময় স্মরণ রাখবে। আমি যেই আয়াত আপনাদের সামনে এখন তিলাওয়াত করেছি তাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيُوةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'হে লোক সকল! নিশ্চিত বিশ্বাস করো যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, তাই দুনিয়ার এ জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে এবং আল্লাহর বিষয়ে তোমাদেরকে সেই (শয়তানও) যেন ধোঁকায় না ফেলতে পারে, যে বড় প্রতারক।"

হে লোক সকল! আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আল্লাহর ওয়াদা কি? সেই ওয়াদা হলো একদিন তুমি মরবে। তার সামনে তোমাকে উপস্থিত হতে হবে। তোমাকে সমস্ত আমলের জওয়াব দিতে হবে। এজন্য দুনিয়ার জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। আর সেই ধোঁকাবাজ অর্থাৎ শয়তান যেন তোমাকে আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকায় না ফেলে। শরীয়তের শিক্ষা হলো দুনিয়াতে অবস্থান করো কিন্তু তার দ্বারা ধোঁকা খেয়ো না। কারণ এটা পরীক্ষার জায়গা। এখানে এমন অনেক দৃশ্য রয়েছে, যা মানুষের আত্মাকে আকৃষ্ট করে। মোহগ্রস্থ করে। তাই মনোহরী এসব দৃশ্যের ভালোবাসাকে অন্তরে জায়গা দিও না। দুনিয়ার সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থা হলেও কোনো সমস্যা নেই, যদি তার সঙ্গে আত্মা যুক্ত না হয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর ঘটনা

📄 শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর ঘটনা


আল্লাহর কতক বান্দা এমন আছেন, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য কতক সূক্ষ্ম শক্তিকে তাদের কাছে পাঠিয়ে থাকেন। এসব সূক্ষ্ম শক্তিকে পাঠানোর উদ্দেশ্য থাকে এ বান্দাকে দুনিয়ার মহব্বত থেকে বের করে নিজের মহব্বতের দিকে নিয়ে আসা। হযরত শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. বিখ্যাত বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর ঘটনা আমি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (কু.সি.) থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. ইউনানী ঔষধ ও আতরের অনেক বড়ো ব্যবসায়ী ছিলেন। এ কারণেই তাকে 'আত্তার' বলা হয়। তার ঔষধ ও আতরের অনেক বড়ো দোকান ছিলো। সুবিস্তৃত কারবার ছিলো। তখন তিনি একজন সাধারণ কিসিমের দুনিয়াদার ব্যবসায়ী ছিলেন। একদিন তিনি দোকানে বসা ছিলেন। দোকান ঔষধ ও আতরের শিশি দ্বারা পরিপূর্ণ ছিলো। এমন সময় একজন মাজযুব ধরনের দরবেশ ও মালং কিসিমের মানুষ দোকানে এলেন। তিনি দোকানের ভিতরে প্রবেশ করলেন। দোকানের ভিতরে দাঁড়িয়ে পুরো দোকান কখনো উপর থেকে নিচের দিকে দেখছিলেন, কখনো ডান থেকে বাম দিকে দেখছিলেন। কখনো ঔষধ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কখনো এক শিশি দেখছিলেন, কখনো অন্য শিশি দেখছিলেন। এভাবে যখন অনেক সময় পার হয়ে গেলো তখন শাইখ ফরীদ উদ্দীন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি দেখছো? কোন জিনিস তালাশ করছো? ঐ দরবেশ উত্তর দিলেন, এমনিই শিশিগুলো দেখছি। শাইখ ফরীদ উদ্দীন জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কিছু কেনার ইচ্ছা আছে কি? তিনি উত্তর দিলেন, না আমার কিছু কেনার ইচ্ছা নেই। এমনিতেই দেখছি। তারপর আবার আলমারীতে সংরক্ষিত শিশিগুলোর দিকে দেখছিলেন। বার বার দেখছিলেন। শাইখ ফরীদ উদ্দীন আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই তুমি দেখছোটা কি? তখন ঐ দরবেশ বললেন, আমি আসলে দেখছি, আপনি যখন মরা যাবেন তখন আপনার জান কীভাবে বের হবে? কারণ, আপনি এখানে এতগুলো শিশি রেখেছেন, আপনার মৃত্যু যখন ঘনিয়ে আসবে তখন আপনার রূহ কখনো এই শিশির মধ্যে প্রবেশ করবে, কখনো ঐ শিশির মধ্যে প্রবেশ করবে, তখন সে বের হওয়ার রাস্তা কোথায় পাবে?

বলা বাহুল্য যে, শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ. তখন একজন দুনিয়াদার ব্যবসায়ী ছিলেন। এসব কথা শুনে তার রাগ হলো। তিনি বললেন, তুমি আমার জানের চিন্তা করছো তোমার জান কীভাবে বের হবে? তোমার জান যেভাবে বের হবে, আমারটাও সেভাবে বের হবে। ঐ দরবেশ উত্তর দিলেন, আমার জান বের হতে তো কোনো পেরেশানী নেই। কারণ আমার কাছে তো কিছু নেই। আমার কাছে ব্যবসা, দোকান, শিশি, সাজ-সরঞ্জাম কিছুই নেই। আমার জান তো এভাবে বের হয়ে যাবে। একথা বলে ঐ দরবেশ দোকানের বাইরে মাটির উপর শুয়ে পড়লেন। কালিমায়ে শাহাদাত আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বললেন এবং তার রূহ উড়ে গেলো।

এ ঘটনা দেখা মাত্র হযরত শাইখ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহ.-এর অন্তরে বড়ো আঘাত লাগলো। তিনি চিন্তা করলেন, বাস্তবকই তো আমি রাত-দিন দুনিয়ার কারবার নিয়েই নিমগ্ন রয়েছি এবং এতেই ব্যস্ত রয়েছি। আল্লাহ তা'আলার দিকে কোনো মনযোগ নেই। আর আল্লাহর এ বান্দা কতো সহজে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন। যাই হোক, ইনি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি গাইবী লতীফা ছিলেন, যিনি তার হেদায়েতের কারণ হলেন। সেদিনই তিনি নিজের সব কায়কারবার অন্যদের হাতে ন্যস্ত করলেন। আল্লাহ তা'আলা হেদায়েত দান করলেন। আল্লাহর পথে অবিচল থেকে এতো বড়ো শাইখ হলেন যে, তিনি দুনিয়াবাসীর হেদায়েতের উপকরণ হলেন。

টিকাঃ
১. সূরা ফাতের, আয়াত-৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00