📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়াতে আছি, কিন্তু দুনিয়া-অন্বেষী নই

📄 দুনিয়াতে আছি, কিন্তু দুনিয়া-অন্বেষী নই


তবে ভালোভাবে অনুধাবন করুন যে, বিষয়টি অনেক কঠিন। কারণ, দুনিয়া ছাড়া চলাও সম্ভব নয়। দুনিয়াতে থাকতে হবে। ক্ষুধা লাগলে আহার করতে হবে। পিপাসা লাগলে পানি পান করতে হবে। মাথা গোঁজার জন্যে ঘরের প্রয়োজন রয়েছে। জীবন ধারণের জন্যে জীবিকা উপার্জনের প্রয়োজন রয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে যে, মানুষের সাথে এতো সব বিষয় জড়িত থাকা সত্ত্বেও, দুনিয়ার মধ্যে অবস্থান করেও এবং দুনিয়ার প্রয়োজনসমূহ পূরা করেও অন্তরে দুনিয়া আসবে না, তা কি করে সম্ভব? এমতাবস্থায় কি করে আত্মা দুনিয়াবিমুখ হবে? এতদুভয় বিষয় একত্রিত হওয়া তো কঠিন মনে হয়। নবীগণ এবং তাদের ওয়ারিশগণ এ বিষয়টি শিক্ষা দিয়ে থাকেন যে, তোমরা দুনিয়াতে থেকেও কীভাবে দুনিয়ার মহব্বতকে অন্তরে জায়গা দিবে না। একজন প্রকৃত মুসলিম দুনিয়ার মধ্যে অবস্থানও করবে, মানুষের সাথে সম্পর্কও রাখবে, তাদের হকও আদায় করবে, একই সাথে দুনিয়ার মহব্বত থেকেও বেঁচে থাকবে। হযরত খাজা আযীযুল হাসান মাজযুব রহ. বলেন,
دنیا میں ہوں ، دنیا کا طلب گار نہیں ہوں بازار سے گزرا ہوں، خریدار نہیں ہوں
'দুনিয়াতে রয়েছি, কিন্তু দুনিয়ার অন্বেষী নই, বাজার অতিক্রম করছি, কিন্তু খরিদ্দার নই।'

এ অবস্থা কি করে সৃষ্টি হয় যে, মানুষ দুনিয়ার মধ্যে থাকবে, দুনিয়ার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করবে, দুনিয়াকে ব্যবহার করবে, কিন্তু দুনিয়ার মহব্বত অন্তরে আসবে না?

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত

📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত


এ বিষয়টিই হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহ. একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়েছেন। বড়ো চমৎকার দৃষ্টান্ত তিনি দিয়েছেন। তিনি বলেন, দুনিয়া ছাড়া মানুষ চলতে পারবে না। দুনিয়ায় বসবাস করতে পার্থিব অসংখ্য প্রয়োজন মানুষের রয়েছে। মানুষের দৃষ্টান্ত নৌকার ন্যায়, আর দুনিয়ার দৃষ্টান্ত পানির ন্যায়। পানি ছাড়া নৌকা চলতে পারে না। কেউ যদি স্থলভাগে নৌকা চালাতে চায় নৌকা চলবে না। তেমনিভাবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য দুনিয়া প্রয়োজন। বেঁচে থাকতে হলে পয়সা লাগবে, খাদ্য লাগবে, পানি লাগবে, বাড়ি লাগবে, কাপড় লাগবে এসব কিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। আর এ সব কিছুই দুনিয়া। কিন্তু পানি নৌকার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত উপকারী যতক্ষণ পর্যন্ত তা নৌকার নীচে, ডানে বামে এবং সামনে পিছনে থাকে। পানি তখন নৌকাকে চলতে সাহায্য করে। কিন্তু এই পানিই যদি নৌকার ভিতরে ডুকে পড়ে তাহলে তা নৌকাকে ডুবিয়ে দেয়, ধ্বংস করে।

তেমনিভাবে এ সমস্ত উপকরণ এবং দুনিয়ার এ সমস্ত সাজ সরঞ্জাম যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের চর্তুদিকে রয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ভয় নেই। এ সমস্ত সামগ্রী তোমাদের জীবনের নৌকাকে পরিচালিত করবে। কিন্তু যেদিন দুনিয়ার এসব সাজ সরঞ্জাম তোমাদের আত্মার নৌকায় প্রবেশ করবে সেদিন তোমাদেরকে ডুবিয়ে দিবে। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
آب اندر زیر کشتی پشتی است آب در کشتی بلاک کشتی است
অর্থাৎ, পানি যতক্ষণ পর্যন্ত নৌকার চর্তুদিকে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তা নৌকাকে চালিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু ঐ পানি যদি নৌকার ভিতরে প্রবেশ করে তখন তা নৌকাকে ডুবিয়ে দেয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুই ভালোবাসা একত্রিত হতে পারে না

📄 দুই ভালোবাসা একত্রিত হতে পারে না


দুনিয়া তোমার চর্তুপাশ্বে থাকবে কিন্তু তার ভালোবাসা তোমার অন্তরে প্রবেশ করবে না, এরই নাম 'যুহদ'। কারণ দুনিয়ার মহব্বত যদি তোমার অন্তরে প্রবেশ করে তাহলে আল্লাহর মহব্বতের জন্য অন্তরে জায়গা থাকবে না। আল্লাহর মহব্বত দুনিয়ার মহব্বতের সাথে একত্রিত হতে পারে না। আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী সাহেব (কু.সি.) একটি শের শোনাতেন। সম্ভবত হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মোহাজেরে মক্কী রহ.-এর শাইখ হযরত মিয়াঁজী নূর মুহাম্মাদ রহ.-এর শের বলে তিনি উল্লেখ করতেন। এ শেরের মাকামও তাঁর পর্যায়েরই। তিনি বলেন,
بھر رہا ہے دل میں حب جاہ و مال کب سماوے اس میں حب ذو الجلال
অর্থাৎ, ধন-দৌলত ও পদ-পদবীর ভালোবাসায় যখন আত্মা পরিপূর্ণ, তখন তাতে আল্লাহর মহব্বতের জায়গা কি করে হবে?

এজন্য এই দুনিয়ার ভালোবাসা আত্মা থেকে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুনিয়াকে বের করে দেওয়া জরুরী নয়, দুনিয়াকে পরিত্যগ করা জরুরী নয়, দুনিয়ার ভালোবাসা বের করা জরুরী। দুনিয়া যদি থাকে আর তার ভালোবাসা না থাকে সেই দুনিয়া ক্ষতিকর নয়।

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত টয়লেটের মতো

📄 দুনিয়ার দৃষ্টান্ত টয়লেটের মতো


সাধারণত এ বিষয়টি বুঝে আসে না যে, একদিকে মানুষ এ দুনিয়াকে জরুরীও মনে করবে, তাকে গুরুত্বপূর্ণও মনে করবে, কিন্তু তার ভালোবাসা অন্তরে থাকবে না, তা কি করে সম্ভব! বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝুন। আপনি যখন কোনো বাড়ি বানান, সেই বাড়ির বিভিন্ন অংশ থাকে। একটি কামরা থাকে ঘুমানোর, একটি থাকে সাক্ষাতের, একটি খানা খাওয়ার ইত্যাদি। সে বাড়িতেই আপনি একটি টয়লেটও বানান। টয়লেট ছাড়া বাড়ি অসম্পূর্ণ। একটি জাঁকজমকপূর্ণ বাড়ি রয়েছে, তার কামরা সুন্দর, বেড রুম খুব উন্নত মানের, ড্রইং রুমও উন্নত মানের, ডাইনিং রুমও উন্নত মানের, পুরো ঘরে অনেক দামী দামী ফার্নিচার সাজানো রয়েছে, কিন্তু তাতে টয়লেট নেই, বলুন! সে বাড়ি কি পরিপূর্ণ, না অসম্পূর্ণ? বলা বাহুল্য যে, সে বাড়িটি অসম্পূর্ণ। টয়লেট ছাড়া কোনো বাড়ি পরিপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু বলুন, এমন কোনো মানুষ আছে কি, যার আত্মা সব সময় টয়লেটের সাথে সংযুক্ত থাকবে? তার মন-মস্তিষ্কে সব সময় এ চিন্তা বিরাজ করবে যে, কখন আমি টয়লেটে যাবো, কখন তাতে বসবো, কিভাবে বসবো, কতক্ষণ বসবো, কখন বের হয়ে আসবো? বলা বাহুল্য যে, কোনো মানুষই নিজের মন-মস্তিষ্কে টয়লেটকে এভাবে চাপিয়ে দিবে না। কখনই নিজের অন্তরে তাকে জায়গা দিবে না। যদিও সে জানে টয়লেট জরুরী জিনিস। এটা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সব সময় সে এ চিন্তায় থাকবে না যে, আমি টয়লেটকে কি করে সাজাবো, কিভাবে আরামদায়ক বানাবো। কারণ, টয়লেটের ভালোবাসা অন্তরে নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00