📄 ‘যুহদে’র হাকীকত
আজকেও অত্যন্ত মৌলিক একটি আখলাকের বর্ণনা হবে, যাকে 'যুহদ' বলা হয়। আপনারা এ শব্দ অনেকবার শুনে থাকবেন যে, অমুক ব্যক্তি বড়ো আবেদ, যাহেদ। যার মধ্যে 'যুহদ' রয়েছে তাকে 'যাহেদ' বলে। 'যুহদ' একটি আত্মিক গুণ। যা প্রত্যেক মুসলমানের অর্জন করা জরুরী। যুহদের অর্থ দুনিয়া থেকে বিমুখ হওয়া, দুনিয়ার মহব্বত থেকে আত্মা মুক্ত হওয়া, দুনিয়ার মধ্যে দিল আটকে না থাকা, দুনিয়ার মহব্বত অন্তরে এভাবে গেঁথে না দেওয়া যে, সবসময় তারই ধ্যান, তারই চিন্তা, তারই কল্পনা এবং তারই জন্য দৌড় ঝাপ চলছে, এর নাম হলো 'যুহদ'।
📄 দুনিয়ার মহব্বত সমস্ত গোনাহের মূল
প্রত্যেক মুসলমানের এই গুণ অর্জন করা এ জন্য জরুরী যে, দুনিয়ার ভালোবাসা যদি আত্মাকে আচ্ছন্ন করে নেয় তাহলে প্রকৃত অর্থে আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা অন্তরে আসতে পারে না। যখন আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসা অন্তরে থাকে না তখন মানুষের ভালোবাসা ভুল পথে গমন করে। এ কারণেই হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন-
حُبُّ الدُّنْيَا رَأْسُ كُلِّ خَطِيئَةٍ
'দুনিয়ার ভালোবাসা সব গোনাহের মূল।"
মানুষ যদি সমস্ত অন্যায় অপরাধের স্বরূপ নিয়ে চিন্তা করে তাহলে সব কিছুর মধ্যে দুনিয়ার ভালোবাসা কার্যকর দেখতে পাবে। চোর চুরি করছে কেন? দুনিয়ার ভালোবাসার কারণে। কেউ অপকর্ম করছে, তো কেন করছে? দুনিয়ার স্বাদের ভালোবাসা অন্তরে জমে আছে, তাই করছে। মদ্যপ দুনিয়ার স্বাদের পিছনে পড়ার কারণে মদ পান করছে। যে কোনো গোনাহের বিষয়ে চিন্তা করবেন তার পিছনে দুনিয়ার ভালোবাসা কার্যকর দেখতে পাবেন। দুনিয়ার ভালোবাসা যখন আত্মাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তখন আল্লাহর মহব্বত কি করে সেখানে প্রবেশ করবে?
টিকাঃ
১. কানযুল উম্মাল, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-২৫৪, হাদীস নং ৬১১৪, জামেউল আহাদীস, খণ্ড-৪১, পৃষ্ঠা- ৩২৫, হাদীস নং ৪৫০৩০, জামেউল উলূমি ওয়াল হিকাম, খণ্ড-৩১, পৃষ্ঠা-৩৪, আদদুররুল মুনাসসারা, খণ্ড-১, পৃঃ ৯, জামেউল উসূল মিন আহাদীসির রাসূল, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৬৪২০, হাদীস নং ২৬০৩, আদদুররুল মানসূর, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-৩৮৮
📄 হযরত আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা
আত্মাকে আল্লাহ তা'আলা এমনভাবে বানিয়েছেন যে, তার মধ্যে প্রকৃত ভালোবাসা কেবল একজনেরই থাকতে পারে। প্রয়োজনের খাতিরে অনেক লোকের সঙ্গেই সম্পর্ক হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা হবে একজনেরই। একজনের মহব্বত সৃষ্টি হলে অন্যদের মহব্বত ঐ পর্যায়ের আর আসতে পারে না। একারণে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. সম্পর্কে বলেছেন-
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذَا خَلِيلًا لَا تَخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا
'আমি যদি দুনিয়াতে কাউকে প্রিয় বানাতাম তাহলে আবু বকর রাযি.-কে প্রিয় বানাতাম।'২
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর সঙ্গে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পরিমাণ সম্পর্ক ছিলো যে, দুনিয়াতে আর কারো সঙ্গেই এমন সম্পর্ক ছিলো না। এমনকি হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ. বলেন- হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর দৃষ্টান্ত এমন, যেমন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে একটি আয়না রাখা হলো আর সেই আয়নার মধ্যে তার প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হলো তখন বলা হবে যে, ইনি হলেন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর আয়নার মধ্যে যেই প্রতিবিম্ব রয়েছে তিনি হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.। হযরত আবু বকর সিদ্দীק রাযি.-এর মাকাম এতো উর্ধ্বে ছিলো। কিন্তু এতদ সত্ত্বেও হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেননি যে, তাকে আমি আমার প্রিয় বানাচ্ছি। বরং বলেছেন, যদি আমি কাউকে প্রিয় বানাতাম তাহলে তাকে বানাতাম। কিন্তু আমার প্রকৃত প্রিয় তো আল্লাহ তা'আলা। তিনি যখন প্রিয় হয়েছেন তখন অন্য কারো সঙ্গে প্রকৃত ভালোবাসার জন্য অন্তরে জায়গা নেই। হ্যাঁ অন্যের সাথে সম্পর্ক হতে পারে এবং তা হয়েও থাকে। যেমন স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক, সন্তানের সাথে সম্পর্ক, মায়ের সাথে সম্পর্ক, বাপের সাথে সম্পর্ক, ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক, বোনের সাথে সম্পর্ক, কিন্তু এ সমস্ত সম্পর্ক অন্তরে আল্লাহ তা'আলার যেই ভালোবাসার রয়েছে, তার অনুগামী হয়ে থাকে。
টিকাঃ
২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৮৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩৯০, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৩৩৯৯
📄 আত্মা একজনের ভালোবাসাই ধারণ করতে পারে
অন্তরে প্রকৃত ভালোবাসা হয় আল্লাহর হবে, না হয় দুনিয়ার হবে। উভয় ভালোবাসা এক সঙ্গে একত্রিত হতে পারে না। এ কারণে মাওলানা রূমী রহ. বলেন-
ہم خدا خواہی و ہم دنیائے دوں این خیال است و محال است و جنوں
অর্থাৎ, দুনিয়ার ভালোবাসাও অন্তরে থাকবে আবার আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসাও অন্তরে থাকবে এ উভয়টা একত্রিত হতে পারে না। এ নিছক কল্পনা, অসম্ভব, পাগলামী। এজন্য অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত যদি ছেয়ে যায় তাহলে আল্লাহর মহব্বত আসবে না। আল্লাহর মহব্বত যখন থাকবে না তখন দ্বীনের সমস্ত কাজ নিষ্প্রাণ ও মূল্যহীন হবে। তা আদায় করতে পেরেশানী, জটিলতা ও কষ্ট মনে হবে। প্রকৃত অর্থে তখন দ্বীনের কাজ সম্পাদিত হতে পারবে না। তখন পদে পদে মানুষ হোঁচট খাবে। এজন্য অন্তরে দুনিয়ার মহব্বতকে জায়গা না দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এরই নাম 'যুহদ'। আর 'যুহদ' অর্জন করা জরুরী।