📄 মুজাহাদার আসল উদ্দেশ্য
কিন্তু আজকাল তাসাওউফ ও পীর মুরীদির পুরো জোর আমল ওযীফার উপর। অমুক সময় এই যিকির করবে, অমুক সময় এই যিকির করবে এখানেই শেষ। তারা শুধু যিকিরের পিছনে লেগে আছে। ভিতরে যতো ব্যাধি উদ্বেলিত হোক না কেন সে দিকে লক্ষ নেই। আগের জামানায় সূফীয়ায়ে কেরাম আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হিসেবে মুরীদের ইসলাহের ফিকির করতেন। এরজন্য মুজাহাদা করাতেন, সাধনা করাতেন, ঘষা মাজা করাতেন। এর ফলে মানুষ পরিশুদ্ধ হতো, যোগ্য হতো।
📄 শাইখ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গুহীর রহ.-এর নাতীর ঘটনা
হযরত শাইখ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গুহী রহ. খুব উঁচু স্তরের আল্লাহর ওলী ছিলেন। আমাদের বুযুর্গদের শাজারার মধ্যে তাঁর অবস্থান অনেক উঁচুতে। তাঁর একজন নাতী ছিলেন। শাইখ জীবিত থাকতে নাতীর মধ্যে আত্মশুদ্ধির চিন্তা জাগেনি। সারা দুনিয়ার মানুষ এসে দাদার থেকে ফয়েয লাভ করতো কিন্তু তিনি সাহেবযাদা হওয়ার চিন্তায় নিমজ্জিত ছিলেন। নিজের আত্মশুদ্ধির জন্য দাদার শরণাপন্ন হননি। শাইখের ইন্তেকাল হলে তার আফসোস হয় যে, হায় আল্লাহ! আমি তো চরম বঞ্চিত হলাম। কতো দূর-দূরান্তের মানুষ এসে ফয়েয লাভ করলো আর আমি ঘরে থেকেও কিছু লাভ করতে পারলাম না! বাতির নীচে অন্ধকার। আফসোস জাগলে চিন্তা করতে লাগলেন যে, এখন কি করি? ক্ষতিপূরণ কি করে হতে পারে? মনে হলো, আমার দাদার থেকে যেসব লোক আত্মশুদ্ধির এই দৌলত লাভ করেছেন তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনের শরণাপন্ন হই। দাদার খলিফাদের মধ্য উঁচু স্তরের বুযুর্গ কে তা খোঁজ করতে আরম্ভ করলেন। জানতে পারলেন যে, বলখে উঁচু স্তরের একজন বুযুর্গ আছেন। কোথায় গাঙ্গুহ্, আর কোথায় বলখ! যখন ঘরে এই দৌলত ছিলো, সবসময় তার শরণাপন্ন হতে পারতো, তখন কিছু অর্জন করেনি। অবশেষে বলখের এই দীর্ঘ কষ্টকর পথ সফর করতে হলো। সত্যিকারের অন্বেষণ ছিলো এজন্য তিনি সফরে বের হলেন।
📄 শাইখের নাতীর ইন্তিকবাল
বলখে অবস্থান রত শাইখের খলীফা যখন জানতে পারলেন যে, আমার শাইখের নাতী আসছে তখন তিনি নিজের শহর থেকে বাইরে বের হয়ে অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে তাকে স্বাগত জানালেন। সসম্মানে বাড়ীতে নিয়ে আসলেন। জাঁকজমকপূর্ণ খাবার তৈরী করালেন। উঁচু স্তরের দাওয়াতের আয়োজন করলেন। ভালো মানের থাকার ব্যবস্থা করলেন। গালিচা বিছিয়ে দিলেন। আরো কতো কিছু যে করলেন তা আল্লাহই ভালো জানেন।
এক-দুই দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি বললেন যে, হযরত আপনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত স্নেহের আচরণ করেছেন, অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করেছেন। কিন্তু আমি তো এসেছি অন্য এক উদ্দেশ্যে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কি সেই উদ্দেশ্য? তিনি বললেন, আমার উদ্দেশ্য হলো আপনি আমাদের বাড়ি থেকে যেই দৌলত নিয়ে এসেছেন তার কিছু অংশ আমাকেও দিন। এজন্য এসেছি। শাইখ বললেন, আচ্ছা! ঐ দৌলত নিতে এসেছো? তিনি বললেন, জি হ্যাঁ। শাইখ বললেন, ঐ দৌলত যদি নিতে এসে থাকো তাহলে এই গালিচা, এই সম্মান, খানা-পিনার এই ব্যবস্থা সব বন্ধ করে দাও। উন্নত মানের থাকার ব্যবস্থা ত্যাগ করো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এখন আমি কি করবো? শাইখ বললেন, আমাদের মসজিদের পাশে একটি হাম্মাম রয়েছে। সেখানে ওযুকারীদের জন্য পানি গরম করো। এটাই তোমার কাজ। বাইয়াত নয়, ওযীফা নয়, যিকির নয়, মামুলাত নয়, অন্য কিছুও নয়। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, থাকবো কোথায়? শাইখ বললেন, রাতে যখন ঘুমাতে হয় তখন ঐ হাম্মামের কাছেই ঘুমিয়ে পড়বে। কোথায় এতো সম্মান ও শুভেচ্ছা, গালিচা বিছানো হচ্ছে, খানা পাকানো হচ্ছে, দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে আর এখন হাম্মামে আগুন জ্বালানোর কাজে নিয়োজিত!
📄 এখনও ত্রুটি রয়েছে
আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে যখন কিছু দিন পার হয়ে গেলো, তখন শাইখ একদিন মেথরকে নির্দেশ দিলেন যে, হাম্মামের কাছে এক ব্যক্তি বসা আছে, ময়লার টুকরি নিয়ে তার নিকট দিয়ে যাবে। এমনভাবে যাবে যাতে ময়লার গন্ধ তার নাকে লাগে। সে টুকরি নিয়ে হাম্মামের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলো। সে তো ছিলো সাহেবজাদা, নওয়াবজাদার মতো জীবন কাটিয়েছে, কড়া দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো এবং বললো, তোর এতো বড় সাহস! এই ময়লার টুকরি নিয়ে আমার কাছ দিয়ে যাস! গাঙ্গুহ্ হলে দেখিয়ে দিতাম! শাইখ মেথরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যখন টুকরি নিয়ে গেলে তখন কি হলো? সে বললো, সে তো অনেক রাগ হয়েছে এবং বলেছে- গাঙ্গুহ হলে তোমাকে শক্ত শাস্তি দিতাম। তিনি বললেন, ওহো! এখনো তো অনেক ত্রুটি আছে। এখনো চাউল গলেনি।
আরো কিছু দিন অতিবাহিত হলে শাইখ মেথরকে বললেন, এখন টুকরি নিয়ে এমনভাবে অতিক্রম করবে, যেন টুকরি তার শরীরের সাথে লেগে যায় তারপর আমাকে বলবে কি হলো? সে তাই করলো। শাইখ জানতে চাইলেন কি হলো? সে বললো, যখন আমি টুকরি নিয়ে তার নিকট দিয়ে অতিক্রম করি এবং তার শরীরের সাথে টুকরির ঘষা লাগে, তখন সে অত্যন্ত কড়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। শাইখ বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। উপকার হচ্ছে।