📄 অন্যের জুতা সোজা করা
এক ব্যক্তি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (কু.সি.)-এর মজলিসে আসা যাওয়া করতো। একদিন ওয়ালেদ ছাহেব দেখলেন, নিজের মর্জি মতো সে মজলিসে আগমনকারীদের জুতা সোজা করতে আরম্ভ করেছে। এরপর থেকে প্রতিবার সে এসে প্রথমে মজলিসে আগমনকারীদের জুতা সোজা করতো তারপর মজলিসে বসতো। ওয়ালেদ ছাহেব কয়েকবার এ কাজ করতে দেখে একদিন তাকে নিষেধ করে বললেন যে, তুমি এ কাজ করবে না। তারপর বললেন, আসল কথা এই যে, এ বেচারা মনে করেছে, আমার ভিতর অহংকার রয়েছে এবং নিজের মন মতো চিকিৎসা নির্ধারণ করেছে যে, আমি মানুষের জুতা সোজা করবো তাহলে আমার অহংকার দূর হয়ে যাবে। ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, এই চিকিৎসার মাধ্যমে উপকার না হয়ে উল্টা ক্ষতি হতো। অহংকার ও আত্মশ্লাঘা বৃদ্ধি পেতো। কারণ, জুতা সোজা করার ফলে তার মন-মগজে এ কথা জাগতো যে, আমি নিজেকে মিটিয়ে দিয়েছি। আমি তো বিনয়ের চূড়ান্ত করেছি যে, মানুষের জুতা সোজা করতে আরম্ভ করেছি। এতে আত্মশ্লাঘা আরো বৃদ্ধি পেতো। এজন্য তাকে নিষেধ করে দিয়েছি যে, এটা তোমার কাজ নয়। তার জন্য অন্য চিকিৎসা নির্ধারণ করেছি।
এবার বলুন, বাহ্যিকভাবে যে ব্যক্তি অন্যের জুতা সোজা করছে তাকে বিনয়ী মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পেরেছেন যে, এ কাজ মূলত অহংকার সৃষ্টি করছে। বিনয়ের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এজন্য নফসের মধ্যে এতো সূক্ষ্ম রহস্য থাকে যে, কোনো আধ্যাত্মিক রোগ সম্পর্কে দক্ষ ব্যক্তির শরণাপন্ন না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নিজের থেকে তা উপলব্ধি করতে পারে না। তিনি বলে দিবেন যে, তোমার এ কাজ আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্ধারিত সীমার মধ্যে হচ্ছে কি হচ্ছে না। তিনিই বলতে পারেন যে, এই সীমা পর্যন্ত ঠিক আছে, আর এর বাইরে ঠিক নেই।
📄 তাসাউফ কি?
এ কারণেই কোনো লোক যখন কোনো পীর সাহেবের কাছে যায়, তার হাতে হাত দিয়ে বাইয়াত হয়, তিনি কিছু ওযীফা দেন, কিছু আমল শিখিয়ে দেন যে, সকালে এটা পড়বে, সন্ধ্যায় এটা পড়বে, জিকির করবে; আজ এর নাম হয়েছে তাসাওউফ। এখানেই শেষ। না আত্মশুদ্ধির চিন্তা, না আখলাক পরিশুদ্ধ করার গুরুত্ব, না উত্তম গুণাবলী অর্জন করার আগ্রহ, আর না মন্দ চরিত্র বিলুপ্ত করার চেষ্টা; এসবের কিছুই নেই, বসে বসে কেবল ওযীফা পাঠ করছে। অনেক সময় এই ওযীফা পাঠ করা আধ্যাত্মিক রোগকে আরো মারাত্মক বানিয়ে দেয়।
📄 ওযীফা ও আমলের হাকীকত
ওযীফা, যিকির ও আমলের দৃষ্টান্ত শক্তিবর্ধক জিনিসের ন্যায়। শক্তিবর্ধক জিনিসের মূলনীতি এই যে, অনেক সময় অসুস্থ ব্যক্তি রোগাক্রান্ত অবস্থায় শক্তিবর্ধক জিনিস খেলে তার শক্তি বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো রোগ শক্তিশালী হতে থাকে। অসুস্থতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্তরে যদি তাকাব্বুর ভরা থাকে, উজুব ভরা থাকে আর বসে বসে ওযীফা পাঠ করে, যিকির করে তাহলে অনেক সময় এর ফলে ইসলাহের পরিবর্তে তাকাব্বুর আরো বেড়ে যায়। এজন্য বলা হয় যে, যখনই কোনো ওযীফা পাঠ করবে বা যিকির করবে, কোনো শাইখের দিকনির্দেশনায় করবে। কারণ শাইখ জানেন যে, এর চে' বেশি যিকির দিলে তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হবে। এজন্য তিনি থামিয়ে দেন যে, এখন অধিক যিকিরের প্রয়োজন নেই। হযরত হাকীমুল উম্মাত (কু.সি.) চিকিৎসা স্বরূপ অনেক মানুষের ওযীফা ও যিকির বন্ধ করে দিয়েছেন। যখন দেখেছেন যে, তার জন্য এ ওযীফা ক্ষতির কারণ হচ্ছে তখন তা ছাড়িয়ে দিয়েছেন।
📄 মুজাহাদার আসল উদ্দেশ্য
কিন্তু আজকাল তাসাওউফ ও পীর মুরীদির পুরো জোর আমল ওযীফার উপর। অমুক সময় এই যিকির করবে, অমুক সময় এই যিকির করবে এখানেই শেষ। তারা শুধু যিকিরের পিছনে লেগে আছে। ভিতরে যতো ব্যাধি উদ্বেলিত হোক না কেন সে দিকে লক্ষ নেই। আগের জামানায় সূফীয়ায়ে কেরাম আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হিসেবে মুরীদের ইসলাহের ফিকির করতেন। এরজন্য মুজাহাদা করাতেন, সাধনা করাতেন, ঘষা মাজা করাতেন। এর ফলে মানুষ পরিশুদ্ধ হতো, যোগ্য হতো।