📄 এগুলো অদৃশ্য ব্যাধি
কিন্তু মানবাত্মার সাথে সম্পৃক্ত এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো দেখা যায় না, চোখে পড়ে না। সেগুলোর কথাই আমি উপরে উল্লেখ করলাম যে, অন্তরে শোকর আছে কি না, হিংসা আছে কি না, বিদ্বেষ আছে কি না, সবর ও শোকর আছে কি না, এসব জিনিস বাহ্যিক রোগের ডাক্তার দেখে বলতে পারবে না। এমন কোনো যন্ত্রও আবিষ্কৃত হয়নি যার মাধ্যমে পরীক্ষা করে বলা যাবে যে, তার মধ্যে এসব আধ্যাত্মিক ব্যাধি আছে।
📄 সুফিয়ায়ে কেরাম আত্মার ডাক্তার
আধ্যাত্মিক রোগের ডাক্তার, রোগনির্ণয়কারী ও চিকিৎসা প্রদানকারী অন্য এক সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের নামই হলো 'সূফিয়ায়ে কেরাম'। যাঁরা নীতিবিদ্যায় পারদর্শী এবং আধ্যাত্মিক রোগ নির্ণয়কারী ও চিকিৎসা প্রদানকারী। এটি স্বতন্ত্র একটি শাস্ত্র। স্বতন্ত্র একটি বিদ্যা। এই শাস্ত্র এমনভাবেই পড়া হয় ও পড়ানো হয়, যেমন ডাক্তারী বিদ্যা পড়া হয় ও পড়ানো হয়।
অনেক বাহ্যিক ব্যাধি এমন রয়েছে যেগুলো মানুষ নিজেই বুঝতে পারে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এবং শরীর ব্যাথা করলে মানুষ বুঝতে পারে যে. আমার জ্বর হয়েছে। এমনিতে বুঝতে না পারলে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে বুঝতে পারে এবং ধরা পড়ে। আর যদি এমন কোনো রোগ হয়, যা নিজে বুঝতে পারে না এবং বাড়ির লোকেরাও যন্ত্র দিয়ে ধরতে পারে না, তাহলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার বলে দেয় যে, অমুক রোগ হয়েছে।
কিন্তু আধ্যাত্মিক ব্যাধিসমূহ অনেক সময় রোগী নিজেও বুঝতে পারে না যে, আমার মধ্যে এই রোগ রয়েছে। এমন কোনো যন্ত্রও মানুষের কাছে নেই, যার দ্বারা জানতে পারবে যে, আমার অহংকারের তাপমাত্রা এতো। বাহ্যিক রোগের ডাক্তারের কাছে গেলে সেও বলতে পারবে না যে, তার মধ্যে এই ব্যাধি রয়েছে। অহংকার আছে কি না, তা নির্ণয় করার জন্য কোনো আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
📄 বিনয়, নাকি বিনয়ের নামে লৌকিকতা?
বিনয়ের মর্ম আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে, নিজেকে নিজে গুরুত্বহীন মনে করা হলো বিনয়। একে বিনম্রতাও বলা হয়। এবার শুনুন, হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (কু.সি.) বলেন, অনেক সময় মানুষ বলে যে, আমি তো অকর্মণ্য, মূল্যহীন, মূর্খ, বড়ো পাপী, অধম, আমার কোনোই গুরুত্ব নেই, এতে বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, এ বেচারা খুবই বিনয়ী। নিজেকে মূল্যহীন, অকর্মণ্য, অধম, মূর্খ ও গোনাহগার মনে করছে।
বাহ্যিকভাবে এটাকে বিনয় মনে হয়। কিন্তু হযরত বলেন, অনেক সময় এমন হয় যে, যে ব্যক্তি এসব কথা বলছে প্রকৃতপক্ষে সে বিনয়ী নয়। তার মধ্যে বরং দুটি আধ্যাত্মিক ব্যাধি রয়েছে। এক. অহংকার; আরেক বিনয়ের লৌকিকতা। অর্থাৎ, সে যে বলছে আমি মূল্যহীন, মূর্খ, তা খাঁটি মনে বলছে না, বরং এ জন্য বলছে, যাতে মানুষ তাকে বিনয়ী মনে করে এবং বলে যে, সে তো খুব বিনম্র।
হযরত বলেন, যে ব্যক্তি বলছে যে, আমি বড়ো গোনাহগার, জাহেল, অকর্মণ্য ও অধম তাকে পরীক্ষা করার পদ্ধতি এই যে, তখন যদি অন্য কোনো ব্যক্তি তাকে বলে যে, নিঃসন্দেহে আপনি অধম, অকর্মণ্য, পাপী, মূর্খ এবং গুরুত্বহীন, তখন দেখো তার অন্তরে কি অবস্থা সৃষ্টি হয়? সে কি তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে বলে যে, আপনি খুব ভালো কথা বলেছেন। আমার ধারণায় প্রায় শতভাগ লোকের ক্ষেত্রে এমন হবে যে, অন্য ব্যক্তি যদি বলে নিঃসন্দেহে আপনি এমন, তাহলে মনে খুব খারাপ লাগবে। মনে হবে যে, সে আমাকে অধম, অকর্মণ্য ও মূর্খ বলে হেয় করলো।
এতে বোঝা গেলো যে, সে শুধু মৌখিকভাবে বলেছিলো যে, আমি অধম, অকর্মণ্য, মূর্খ। তার অন্তরে এ কথা ছিলো না। বরং উদ্দেশ্য ছিলো, যখন আমি মুখে বলবো যে, আমি মূর্খ, অকর্মণ্য, অধম তখন মানুষ বলবে যে, হযরত এটা তো আপনার বিনয়। আপনি তো আসলে অনেক বড়ো আলেম, জ্ঞানী, গুণী, মুত্তাকী ও পরহেযগার। এটা বলানোর জন্য এসব কিছু বলছে এবং দেখাচ্ছে যে, আমি বড়ো বিনয়ী। প্রকৃতপক্ষে আত্মা অহংকার ও লৌকিকতা দ্বারা পরিপূর্ণ। কিন্তু বাহ্যিকভাবে দেখাচ্ছে যে, আমি খুব বিনয়ী।
আপনারা চিন্তা করে দেখুন! এসব কথা খাঁটি মনে বলা হচ্ছে, নাকি ভিতরে রোগ ভরা, তা কে ধরতে পারবে? এটা তো সেই ধরতে পারবে, যে আধ্যাত্মিক রোগের চিকিৎসক ও দক্ষ। এ জন্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, কারণ অনেক সময় মানুষ নিজের আধ্যাত্মিক ব্যাধি ধরতে পারে না।
📄 অন্যের জুতা সোজা করা
এক ব্যক্তি আমার ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (কু.সি.)-এর মজলিসে আসা যাওয়া করতো। একদিন ওয়ালেদ ছাহেব দেখলেন, নিজের মর্জি মতো সে মজলিসে আগমনকারীদের জুতা সোজা করতে আরম্ভ করেছে। এরপর থেকে প্রতিবার সে এসে প্রথমে মজলিসে আগমনকারীদের জুতা সোজা করতো তারপর মজলিসে বসতো। ওয়ালেদ ছাহেব কয়েকবার এ কাজ করতে দেখে একদিন তাকে নিষেধ করে বললেন যে, তুমি এ কাজ করবে না। তারপর বললেন, আসল কথা এই যে, এ বেচারা মনে করেছে, আমার ভিতর অহংকার রয়েছে এবং নিজের মন মতো চিকিৎসা নির্ধারণ করেছে যে, আমি মানুষের জুতা সোজা করবো তাহলে আমার অহংকার দূর হয়ে যাবে। ওয়ালেদ ছাহেব বললেন, এই চিকিৎসার মাধ্যমে উপকার না হয়ে উল্টা ক্ষতি হতো। অহংকার ও আত্মশ্লাঘা বৃদ্ধি পেতো। কারণ, জুতা সোজা করার ফলে তার মন-মগজে এ কথা জাগতো যে, আমি নিজেকে মিটিয়ে দিয়েছি। আমি তো বিনয়ের চূড়ান্ত করেছি যে, মানুষের জুতা সোজা করতে আরম্ভ করেছি। এতে আত্মশ্লাঘা আরো বৃদ্ধি পেতো। এজন্য তাকে নিষেধ করে দিয়েছি যে, এটা তোমার কাজ নয়। তার জন্য অন্য চিকিৎসা নির্ধারণ করেছি।
এবার বলুন, বাহ্যিকভাবে যে ব্যক্তি অন্যের জুতা সোজা করছে তাকে বিনয়ী মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পেরেছেন যে, এ কাজ মূলত অহংকার সৃষ্টি করছে। বিনয়ের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এজন্য নফসের মধ্যে এতো সূক্ষ্ম রহস্য থাকে যে, কোনো আধ্যাত্মিক রোগ সম্পর্কে দক্ষ ব্যক্তির শরণাপন্ন না হওয়া পর্যন্ত মানুষ নিজের থেকে তা উপলব্ধি করতে পারে না। তিনি বলে দিবেন যে, তোমার এ কাজ আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্ধারিত সীমার মধ্যে হচ্ছে কি হচ্ছে না। তিনিই বলতে পারেন যে, এই সীমা পর্যন্ত ঠিক আছে, আর এর বাইরে ঠিক নেই।