📄 তাসাউফের সারকথা
হযরত হাকীমুল উম্মত (কু.সি.) বড়ো চমৎকার কথা বলেছেন, যা সবার মনে রাখার মতো। তিনি বলেন,
'যেই সামান্য বিষয় তাসাওউফের সার, তা হলো, আল্লাহর কোনো হুকুম পালনে যখন অলসতা লাগে, যেমন, নামাযের সময় হয়েছে, কিন্তু নামাযে যেতে অলসতা লাগছে, তখন অলসতার মোকাবেলা করে ঐ হুকুমটি পালন করবে। আর যখন কোনো গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করতে অলসতা লাগে, তখন ঐ অলসতার মোকাবেলা করে ঐ গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে।'
তারপর হযরত থানভী রহ. বলেন,
'ব্যস! এর দ্বারাই তা'আল্লুক মা'আল্লাহ সৃষ্টি হয় এবং এর দ্বারাই তা'আল্লুক মা'আল্লাহতে উন্নতি ঘটে। যার এই গুণ লাভ হলো, তার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই।'
প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার উপর করাত চালিয়ে এবং হাতুড়ি মেরে যখন তাকে পিষে ফেলবে, তখন তা আল্লাহ তা'আলার তাজাল্লীর ক্ষেত্রে পরিণত হবে।
📄 মন তো ভাঙ্গার জন্যই
আমাদের ওয়ালেদ মাজেদ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (কু.সি.) একটা দৃষ্টান্ত দিতেন। এখন তো সে যুগ চলে গেছে, আগের যুগে ইউনানী চিকিৎসক ছিলেন, তারা বিভিন্ন জিনিসের চূর্ণ তৈরি করতেন। স্বর্ণের চূর্ণ, রূপার চূর্ণ, এক প্রকার বিষের চূর্ণ আরো বিভিন্ন প্রকারের চূর্ণ তৈরি করতেন। সে সব চূর্ণ তৈরির জন্য তারা স্বর্ণকে আগুনে পোড়াতেন। এতো বেশি পোড়াতেন যে, স্বর্ণ ছাইয়ে পরিণত হতো এবং বলতেন যে, স্বর্ণকে যতো বেশি পোড়ানো হবে তার শক্তি ততো বৃদ্ধি পাবে। আগুনে জ্বালিয়ে স্বর্ণের চূর্ণ তৈরি করা হলে এবং তার সামান্য একটু কেউ খেলে তার শক্তি অনেক বেশি বেড়ে যায়। আগুনে জ্বালিয়ে নিষ্পেষিত করে স্বর্ণকে ছাইয়ে পরিণত করা হলে এই চূর্ণ তৈরি হয়।
আমাদের ওয়ালেদ মাজেদ (কু.সি.) বলতেন যে, এভাবে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনাকে যখন নিষ্পেষিত করবে, দলিত-মথিত করবে, পিষে ছাই বানাবে তখন এই চূর্ণ তৈরি হবে। তার মধ্যে আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সম্পর্কের শক্তি সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তা'আলার মহব্বত সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তা'আলার তাজাল্লীর দর্পণ হবে। আত্মাকে যতো বেশি চূর্ণ করবে, আল্লাহ তা'আলার নিকট তা ততো বেশি প্রিয় হবে।
تو بچا بچا کے نہ رکھ اسے ترا آئنہ ہے وہ آئنہ
کہ شکستہ ہو تو عزیز تر ہے نگاہ آئنہ ساز میں
'তোমার আয়েনাকে তুমি যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখো না, কারণ, তোমার এ আয়েনা এমন যে, তা যতো চূর্ণ হবে, নির্মাতার কাছে ততো প্রিয় হবে।'
অর্থাৎ, তুমি আত্মা নামক আয়েনার উপর যতো আঘাত হানবে, ততো বেশি তা আল্লাহর কাছে প্রিয় হবে। ভাঙ্গার জন্যই তিনি এটা নির্মাণ করেছেন। তার খাতিরে এর কামনা-বাসনাকে নিষ্পেষিত করতে হবে। যখন তা নিষ্পেষিত হবে, তখন তা অসাধারণ হবে。
আমাদের হযরত ডা. আবদুল হাই ছাহেব (কু.সি.) কতো চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করতেন যে,
یہ کہہ کے کوزہ گر نے پیالہ پٹک دیا
اب اور کچھ بنائیں گے اس کو بگاڑ کے
'কারিগর এ কথা বলে পিয়ালা ছুড়ে মারলেন যে, এটা ভেঙ্গে অন্য কিছু বানাবো।'
'অন্য কিছু বানাবো' অর্থ, তার মন মতো বানিয়ে নিবেন। এজন্য এ কথা মনে করবে না যে, মনের কামনা-বাসনা নিষ্পেষিত করায় যে আঘাত লাগছে এবং যে কষ্ট হচ্ছে তা বেকার যাচ্ছে, বরং এরপর যখন এ আত্মা আল্লাহ তা'আলার ভালোবাসার পাত্র হবে, আল্লাহ তা'আলার যিকির ও স্মরণের মহল হবে, তখন তার যে মধুরতা লাভ হবে, আল্লার কসম! তার তুলনায় গোনাহের এ সমস্ত স্বাদ ছাই-মাটিতে পরিণত হবে। এগুলোর কোনো মূল্য নেই! আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এই দৌলত নসীব করুন। এর জন্য প্রথম প্রথম সামান্য মেহেনত করতে হবে এবং কষ্ট স্বীকার করতে হবে। আর এরই নাম হলো 'মুজাহাদা'। এ বিষয়টিই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস শরীফে এভাবে বর্ণনা করেছেন,
الْمُجَاهِدُ مَنْ جَاهَدَ نَفْسَهُ
'প্রকৃত মুজাহিদ সে-ই, যে নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ করে।'
অর্থাৎ, নিজের নফসের কামনা-বাসনাকে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিষ্পেষিত করে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন, আমাদেরকে প্রবৃত্তির চাহিদার ক্রীড়নক হওয়া থেকে রক্ষা করুন এবং প্রবৃত্তির চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاَخِرُ دَعْوَانَا اَنِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৫৪6, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২২৮৩৩