📄 ভালোবাসা কষ্টকে বিলুপ্ত করে দেয়
যে মহিলার কোনো সন্তান নেই। সে বলে ভাই আমার চিকিৎসা করাও যাতে সন্তান হয়। এর জন্য দুআ করাতে থাকে। মানুষের কাছে আবেদন করে, আল্লাহর কাছে দু'আ করো আমাকে যেন তিনি সন্তান দান করেন। তার জন্য তাবিজ-কবজ আরো কতো কিছু করে থাকে। অন্য এক মহিলা যদি তাকে বলে যে, আরে তুমি কোন ধান্ধায় পড়ে আছো? সন্তান হলে তো অনেক কষ্ট করতে হবে। শীতের রাতে উঠে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে কাপড় ধুতে হবে। তখন মহিলা উত্তর দেয়, আমার এক সন্তানের জন্য হাজার শীতের রাত কতাওবান। কারণ এ সন্তানের মূল্য ও তার গুরুত্বের অনুভূতি তার অন্ত রে রয়েছে। এ কারণে ঐ মায়ের জন্য সব কষ্ট শান্তিতে পরিণত হয়েছে। মা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে যে, হে আল্লাহ! আমাকে সন্তান দিন, এর অর্থ তো এই যে, সন্তানের যতো দায়িত্ব রয়েছে, যতো কষ্ট রয়েছে তা আমাকে দান করুন। কিন্তু সে সব কষ্ট তার দৃষ্টিতে কোনো কষ্টই নয়, বরং তা শান্তি।
যে মা শীতের রাতে উঠে কাপড় ধুচ্ছে, সহজাতভাবে তার অবশ্যই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সে প্রশান্তি লাভ করছে। সে চিন্তা করছে যে, আমি আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য এসব করছি। অন্তরে এ প্রশান্তি যখন জাগে তখন নিজের কামনা-বাসনা নিষ্পেষিত করতেও স্বাদ উপভোগ হয়। এ বিষয়টিই মাওলানা রূমী রহ. এভাবে উপস্থাপন করেছেন,
از محبت تلمها شیریں شود
অর্থাৎ, ভালোবাসা সৃষ্টি হলে প্রচণ্ড তিতা জিনিসও মিষ্টি মনে হয়। যে সব কাজ ছিলো কষ্টের, ভালোবাসার সুবাদে তার মধ্যে স্বাদ উপভোগ হতে আরম্ভ করে। তার মধ্যে মজা চলে আসে যে, ভালোবাসার খাতিরে আমি এসব কাজ করছি。
📄 মাওলার মহব্বত যেন লাইলির মহব্বত থেকে কম না হয়
মাওলানা রূমী রহ. মসনবী শরীফে মহব্বত সংক্রান্ত বিস্ময়কর সব ঘটনা লিখেছেন। লাইলি-মজনুর ঘটনা লিখেছেন যে, মজনু লাইলির জন্য কীভাবে পাগল হলো। দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করলো। দুধের নহর প্রবাহিত করার সংকল্প নিয়ে বের হলো। কেউ যদি তাকে বলে, তুমি অনেক কষ্টের কাজ করছো, এটা বাদ দাও। উত্তরে সে বলে, যার খাতিরে এসব কাজ করছি, যার ভালোবাসায় এসব কষ্ট স্বীকার করছি, তার জন্য হাজার কষ্ট-ক্লেশ নিবেদিত। আমার তো নহর খুদতেই ভালো লাগছে। কারণ, আমার প্রিয়ার জন্য আমি এ কাজ করছি। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
عشق مولی کے کم از لیلی بود
گوئے گشتن بهر او اولی بود
'মাওলার প্রকৃত প্রেম লাইলির প্রেমের চেয়ে কি করে কম হতে পারে? মাওলার প্রেমে বলি হওয়া অধিকতর উত্তম।'
ভালোবাসার খাতিরে মানুষ যখন কষ্ট করে, তখন তাতে বড়ো স্বাদ উপলব্ধি হয়।
📄 বেতন-ভাতার ভালোবাসা
একজন মানুষ চাকরি করে। ভোর-বিহানে উঠতে হয়। তীব্র শীতের মধ্যে গরম বিছানায় শুয়ে আছে। অফিসে যাওয়ার সময় হয়েছে। বিছানা ছেড়ে সে চলে যায়। মন চায় গরম বিছানায় পড়ে থাকি। কিন্তু ঘর-বাড়ি ছেড়ে, পরিবার-পরিজন ছেড়ে অফিসে চলে যায়। সারাদিন কষ্ট করে অনেক রাতে ঘরে ফেরে। এমন অসংখ্য মানুষ আছে যারা ভোরে নিজের সন্তানদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যায় এবং রাতে ফিরে এসে ঘুমন্ত অবস্থায় পায়। এ ব্যক্তি চাকুরির খাতিরে এতো কষ্ট করছে। এখন যদি কেউ তাকে বলে যে, আরে ভাই! চাকরি করতে গিয়ে তো তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। আসো আমি তোমাকে চাকরিমুক্ত করে দেই। সে উত্তর দিবে, না ভাই, না! অনেক কষ্টে এ চাকরি লাভ হয়েছে। এটা মুক্ত করো না। ভোর-বিহানে উঠে যাওয়ার মধ্যেই সে মজা পাচ্ছে। পরিবার-পরিজন ছেড়ে যাওয়ার মধ্যেই সে মজা পাচ্ছে। কেন? কারণ, মাসের শেষে সে যেই বেতন পায়, তার ভালোবাসায় এসব কষ্ট সুস্বাদু হয়ে গেছে। কোনো সময় চাকরি চলে গেলে সে কাঁদতে থাকে। হায়! ঐ দিন কোথায় গেলো, যখন কাক ডাকা ভোরে উঠে যেতাম? বিভিন্ন জনকে ধরে ধরে সুপারিশ করায় যে, আমাকে চাকরিতে পুনরায় বহাল করা হোক। কোনো জিনিসের ভালোবাসা অন্তরে গেঁথে গেলে সে পথের সব কষ্ট সহজ ও সুস্বাদু হয়ে যায় এবং তাতেই আনন্দ বোধ হয়।
এমনিভাবে گোনাহ ছাড়তে অবশ্যই কষ্ট রয়েছে। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে। কিন্তু একবার যখন অবিচল সংকল্প করবে এবং সে মতে আমল আরম্ভ করবে, তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সাহায্যও করা হবে। তখন ইনশা আল্লাহ এই কষ্টে স্বাদ অনুভব হবে এবং আল্লাহর হুকুম মানতে মজা লাগবে।
📄 নফসকে ইবাদতের স্বাদে পরিচিত করুন
আমাদের হযরত ডা. আবদুল হাই ছাহেব (কু.সি.) একবার বিস্ময়কর এক কথা বলেন। মানুষের নফস স্বাদ চায়। স্বাদ ও ভোগ-বিলাসিতা নফসের খাদ্য। কিন্তু স্বাদের নির্দিষ্ট কোনো রূপ তার কাম্য নয় যে, এ ধরনের স্বাদ চাই, আর এ ধরনের স্বাদ চাই না। তার কেবল স্বাদ চাই। এখন তোমরা তাকে খারাপ স্বাদে অভ্যস্ত করেছো, খারাপ ভোগ-উপভোগে অভ্যস্ত করেছে। একবার তাকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত ও ইতাআতের স্বাদে পরিচিত করো। আল্লাহ তা'আলার হুকুম অনুপাতে জীবন যাপনের স্বাদে অভ্যস্ত করো। তাহলে এই নফস্ তাতেই মজা ও স্বাদ উপভোগ করতে থাকবে।