📄 এখন তো এ আত্মাকে তোমার উপযুক্ত বানাতেই হবে
এজন্য ইসলাহের পথে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হলো 'মুজাহাদা'। মুজাহাদা করার সংকল্প করতে হবে। আমাদের হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব রহ. এই শের পাঠ করতেন,
আرزুওঁ খূন হোঁউ য়া হাসরাতিঁ পায়মাল হোঁউ।
আব তো উস দিল কো বানানা হ্যায় তেরে কাবিল মুঝে।
'অন্তরে যেসব বাসনা জাগছে তা ধ্বংস হোক, তা খুন হোক, কিন্তু আমি তো এখন সংকল্প করেছি আমার এ আত্মাকে তোমার উপযুক্ত বানাতেই হবে।'
এখন এ অন্তরে মহান আল্লাহর নূর অবতীর্ণ হবে। আল্লাহর ভালোবাসা অন্তরে বদ্ধমূল হবে। এখন আর এসব গোনাহ হবে না। তাহলে দেখবে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কী পরিমাণ রহমত অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ এ পথে অগ্রসর হয়।
মনে রাখবেন! প্রথম প্রথম এ কাজ করতে খুব কষ্ট হবে। মন কিছু একটা চাচ্ছে আল্লাহর খাতিরে তা ত্যাগ করতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু পরবর্তীতে এ কষ্টের মধ্যেই স্বাদ উপলব্ধি হয়, মজা লাগে। যখন এ চিন্তা জাগে যে, আমি প্রবৃত্তিকে নিষ্পেষিত করছি, কামনা-বাসনাকে খুন করছি, আর তা করছি আমার মালিক ও খালিক আল্লাহর জন্য; এর মধ্যে যে স্বাদ আর মজা রয়েছে, আপনি এখন তা চিন্তাও করতে পারবেন না।
📄 এ কষ্ট মা কেন সহ্য করে?
মায়ের প্রতি লক্ষ্য করুন! প্রচণ্ড শীতের সময় রাতের বেলায় লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। পাশে শুয়ে আছে শিশু সন্তান। এমতাবস্থায় শিশুটি পেশাব করলো, তখন মন চায় যে, এই গরম বিছানা ছেড়ে কোথাও যাবো না। প্রচণ্ড শীতের মৌসুম। গরম বিছানা ছেড়ে যাওয়া বড়ো মুশকিল। কিন্তু মা চিন্তা করে যে, আমি যদি না যাই তাহলে বাচ্চা ভেজা কাপড়ের মধ্যে পড়ে থাকবে, ফলে তার জ্বর হতে পারে, স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। সে বেচারী মনের চাহিদার বিরুদ্ধে তীব্র শীতের মধ্যে বাইরে গিয়ে ঠাণ্ডা পানি দ্বারা তার কাপড় ধুচ্ছে, তার কাপড় পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এটা সামান্য কোনো কষ্ট নয়। কিন্তু মা এই কষ্ট সহ্য করছে। কেন করছে? কারণ তার শিশুর সুস্থতা ও আরাম তার দৃষ্টিতে রয়েছে। যার ফলে সে প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও নফসের চাহিদাকে পদদলিত করে এসব কাজ করছে।
📄 ভালোবাসা কষ্টকে বিলুপ্ত করে দেয়
যে মহিলার কোনো সন্তান নেই। সে বলে ভাই আমার চিকিৎসা করাও যাতে সন্তান হয়। এর জন্য দুআ করাতে থাকে। মানুষের কাছে আবেদন করে, আল্লাহর কাছে দু'আ করো আমাকে যেন তিনি সন্তান দান করেন। তার জন্য তাবিজ-কবজ আরো কতো কিছু করে থাকে। অন্য এক মহিলা যদি তাকে বলে যে, আরে তুমি কোন ধান্ধায় পড়ে আছো? সন্তান হলে তো অনেক কষ্ট করতে হবে। শীতের রাতে উঠে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে কাপড় ধুতে হবে। তখন মহিলা উত্তর দেয়, আমার এক সন্তানের জন্য হাজার শীতের রাত কতাওবান। কারণ এ সন্তানের মূল্য ও তার গুরুত্বের অনুভূতি তার অন্ত রে রয়েছে। এ কারণে ঐ মায়ের জন্য সব কষ্ট শান্তিতে পরিণত হয়েছে। মা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে যে, হে আল্লাহ! আমাকে সন্তান দিন, এর অর্থ তো এই যে, সন্তানের যতো দায়িত্ব রয়েছে, যতো কষ্ট রয়েছে তা আমাকে দান করুন। কিন্তু সে সব কষ্ট তার দৃষ্টিতে কোনো কষ্টই নয়, বরং তা শান্তি।
যে মা শীতের রাতে উঠে কাপড় ধুচ্ছে, সহজাতভাবে তার অবশ্যই কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সে প্রশান্তি লাভ করছে। সে চিন্তা করছে যে, আমি আমার সন্তানের মঙ্গলের জন্য এসব করছি। অন্তরে এ প্রশান্তি যখন জাগে তখন নিজের কামনা-বাসনা নিষ্পেষিত করতেও স্বাদ উপভোগ হয়। এ বিষয়টিই মাওলানা রূমী রহ. এভাবে উপস্থাপন করেছেন,
از محبت تلمها شیریں شود
অর্থাৎ, ভালোবাসা সৃষ্টি হলে প্রচণ্ড তিতা জিনিসও মিষ্টি মনে হয়। যে সব কাজ ছিলো কষ্টের, ভালোবাসার সুবাদে তার মধ্যে স্বাদ উপভোগ হতে আরম্ভ করে। তার মধ্যে মজা চলে আসে যে, ভালোবাসার খাতিরে আমি এসব কাজ করছি。
📄 মাওলার মহব্বত যেন লাইলির মহব্বত থেকে কম না হয়
মাওলানা রূমী রহ. মসনবী শরীফে মহব্বত সংক্রান্ত বিস্ময়কর সব ঘটনা লিখেছেন। লাইলি-মজনুর ঘটনা লিখেছেন যে, মজনু লাইলির জন্য কীভাবে পাগল হলো। দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করলো। দুধের নহর প্রবাহিত করার সংকল্প নিয়ে বের হলো। কেউ যদি তাকে বলে, তুমি অনেক কষ্টের কাজ করছো, এটা বাদ দাও। উত্তরে সে বলে, যার খাতিরে এসব কাজ করছি, যার ভালোবাসায় এসব কষ্ট স্বীকার করছি, তার জন্য হাজার কষ্ট-ক্লেশ নিবেদিত। আমার তো নহর খুদতেই ভালো লাগছে। কারণ, আমার প্রিয়ার জন্য আমি এ কাজ করছি। মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
عشق مولی کے کم از لیلی بود
گوئے گشتن بهر او اولی بود
'মাওলার প্রকৃত প্রেম লাইলির প্রেমের চেয়ে কি করে কম হতে পারে? মাওলার প্রেমে বলি হওয়া অধিকতর উত্তম।'
ভালোবাসার খাতিরে মানুষ যখন কষ্ট করে, তখন তাতে বড়ো স্বাদ উপলব্ধি হয়।