📄 আল্লাহর যিকিরে শান্তি রয়েছে
মনে রাখবেন, আল্লাহর নাফরমানির মধ্যে শান্তি ও স্থিরতা নেই। সারা পৃথিবীর সমস্ত উপাদান ও উপকরণ একত্রে করেও শান্তি লাভ হচ্ছে না, স্থিরতা লাভ হচ্ছে না। আমি এই মাত্র আপনাদের সামনে পশ্চিমা সমাজের দৃষ্টান্ত দিয়েছি যে, সেখানে টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি, উন্নত মানের শিক্ষাব্যবস্থা, ভোগ-উপভোগের সমস্ত দরজা উন্মুক্ত, যেভাবে ইচ্ছা ভোগ করো, কিন্তু এতদসত্ত্বেও ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমাতে হচ্ছে। কেন? কারণ, অন্তরে প্রশান্তি নেই। কেন নেই? কারণ, গোনাহের মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে ফিরছে। মনে রাখবেন! গোনাহ, নাফরমানি ও অবাধ্যতার মধ্যে শান্তি নেই। শান্তি তো কেবল এক জিনিসের মধ্যেই, আর তা হলো-
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
'আল্লাহর স্মরণে শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে।”
এজন্য নাফরমানি করতে থাকবে আর শান্তি লাভ হবে এটা আত্মপ্রবঞ্চনা। মনে রাখবেন সারা জীবনেও তা লাভ হবে না। ছটফট করতে করতে ইহজগত ত্যাগ করবে, কিন্তু গোনাহের কাজ না ছাড়লে শান্তির গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না।
আল্লাহ তা'আলা শান্তি তাদেরকে দান করেন যাদের অন্তরে তাঁর মহব্বত রয়েছে, যাদের অন্তরে তাঁর স্মরণ রয়েছে, যাদের আত্মা তাঁর যিকিরে পল্লবিত। তাদের প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তি দেখুন। বাহ্যিকভাবে তারা দুরাবস্থাগ্রস্থ, অভাবের মধ্যে আছে, অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতার নেয়ামত রয়েছে। তাই জাগতিক প্রশান্তি লাভ করতে চাইলেও নাফরমানি ও গোনাহের কাজ ছাড়তে হবে। গোনাহের কাজ ছাড়ার জন্য কিছুটা মুজাহাদা করতে হবে। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কিছুটা দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
টিকাঃ
১. সূরা রা'দ ২৮
📄 আল্লাহর ওয়াদা মিথ্যা হতে পারে না
একই সাথে আল্লাহ তা'আলা এ ওয়াদাও করেছেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
'যেসব লোক আমার জন্য চেষ্টা করে আমি অবশ্য অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পৌছাবো।'
যে সব লোক আমার পথে মেহনত-মুজাহাদা করে, পরিবেশ, সমাজ, প্রবৃত্তি, শয়তান ও কামনা-বাসনার চাহিদা ত্যাগ করে আমার বিধান মতো চলতে চায় তাদেরকে
لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
'আমি অবশ্য অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পৌছাবো।'
হযরত থানভী রহ.-এর তরজমা করেছেন- 'আমি তাদের হাত ধরে নিয়ে যাবো।' এমন নয় যে, দূর থেকে দেখিয়ে দিলো 'এটা পথ'। বরং বলেছেন- আমি তাদের হাত ধরে নিয়ে যাবো। কিন্তু পা তো একটু বাড়াতে হবে। ইচ্ছা তো করতে হবে। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে একটু শক্ত অবস্থান তো নিতে হবে। তাহলে আল্লাহ তা'আলার সাহায্য আসবে। এটা আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা, যা কখনো মিথ্যা হতে পারে না।
মুজাহাদা এরই নাম যে, একবার দৃঢ় সংকল্প করবে- এ কাজ আমি করবো না। আত্মা চৌচির হবে, কামনা-বাসনা পদদলিত হবে, মন-মগজে প্রলয় ঘটবে, কিন্তু গোনাহের এ কাজ আমি করবো না। যেদিন প্রবৃত্তির সামনে অটল হয়ে দাঁড়ালো আল্লাহ তা'আলা বলেন সেদিন থেকে আমার প্রিয় হয়ে গেলো। এখন আমি নিজে তার হাত ধরে আমার পথে নিয়ে যাবো。
টিকাঃ
১. সূরা আনকাবুত ৬৯
২. সূরা আনকাবুত ৬৯
📄 এখন তো এ আত্মাকে তোমার উপযুক্ত বানাতেই হবে
এজন্য ইসলাহের পথে সর্বপ্রথম পদক্ষেপ হলো 'মুজাহাদা'। মুজাহাদা করার সংকল্প করতে হবে। আমাদের হযরত ডা. আব্দুল হাই ছাহেব রহ. এই শের পাঠ করতেন,
আرزুওঁ খূন হোঁউ য়া হাসরাতিঁ পায়মাল হোঁউ।
আব তো উস দিল কো বানানা হ্যায় তেরে কাবিল মুঝে।
'অন্তরে যেসব বাসনা জাগছে তা ধ্বংস হোক, তা খুন হোক, কিন্তু আমি তো এখন সংকল্প করেছি আমার এ আত্মাকে তোমার উপযুক্ত বানাতেই হবে।'
এখন এ অন্তরে মহান আল্লাহর নূর অবতীর্ণ হবে। আল্লাহর ভালোবাসা অন্তরে বদ্ধমূল হবে। এখন আর এসব গোনাহ হবে না। তাহলে দেখবে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে কী পরিমাণ রহমত অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ এ পথে অগ্রসর হয়।
মনে রাখবেন! প্রথম প্রথম এ কাজ করতে খুব কষ্ট হবে। মন কিছু একটা চাচ্ছে আল্লাহর খাতিরে তা ত্যাগ করতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু পরবর্তীতে এ কষ্টের মধ্যেই স্বাদ উপলব্ধি হয়, মজা লাগে। যখন এ চিন্তা জাগে যে, আমি প্রবৃত্তিকে নিষ্পেষিত করছি, কামনা-বাসনাকে খুন করছি, আর তা করছি আমার মালিক ও খালিক আল্লাহর জন্য; এর মধ্যে যে স্বাদ আর মজা রয়েছে, আপনি এখন তা চিন্তাও করতে পারবেন না।
📄 এ কষ্ট মা কেন সহ্য করে?
মায়ের প্রতি লক্ষ্য করুন! প্রচণ্ড শীতের সময় রাতের বেলায় লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। পাশে শুয়ে আছে শিশু সন্তান। এমতাবস্থায় শিশুটি পেশাব করলো, তখন মন চায় যে, এই গরম বিছানা ছেড়ে কোথাও যাবো না। প্রচণ্ড শীতের মৌসুম। গরম বিছানা ছেড়ে যাওয়া বড়ো মুশকিল। কিন্তু মা চিন্তা করে যে, আমি যদি না যাই তাহলে বাচ্চা ভেজা কাপড়ের মধ্যে পড়ে থাকবে, ফলে তার জ্বর হতে পারে, স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। সে বেচারী মনের চাহিদার বিরুদ্ধে তীব্র শীতের মধ্যে বাইরে গিয়ে ঠাণ্ডা পানি দ্বারা তার কাপড় ধুচ্ছে, তার কাপড় পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এটা সামান্য কোনো কষ্ট নয়। কিন্তু মা এই কষ্ট সহ্য করছে। কেন করছে? কারণ তার শিশুর সুস্থতা ও আরাম তার দৃষ্টিতে রয়েছে। যার ফলে সে প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও নফসের চাহিদাকে পদদলিত করে এসব কাজ করছে।