📄 ‘উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ সুন্নাতের ডায়েরী
সুতরাং সব মানুষই নিজের কর্ম-কাণ্ডে সমীক্ষা করে দেখবে যে, আমি কোথায় কোথায় হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের হযরতের কিতাব 'উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম' প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তোমাদের জন্য আমি সুন্নাতের ডায়েরী বানিয়ে দিয়েছি। এই কিতাবকে সামনে রেখে সমীক্ষা চালাতে থাকো, কোথায় কোথায় তুমি সুন্নাতের প্রতি আমল করছো, আর কোথায় কোথায় ছেড়ে দিয়েছো। যেখানে আমল ছেড়ে দিয়েছো সেখান থেকে আমল শুরু করে দাও। এমন অনেক সুন্নাত রয়েছে, যেখানে কেবল আপনার সামান্য মনোযোগ প্রয়োজন। তাতে কোনো মেহনত, কষ্ট, পয়সা বা সময় ব্যয় হয় না। তবে কিছু সুন্নাত এমন আছে, যা সময় ও মেহনতের দাবীদার। সামান্য মেহনত করলে সেগুলোও আদায় করা সহজ হয়ে যাবে।
📄 যতক্ষণ বাজারে লাউ পাবে অবশ্যই কিনবে
আমাদের হযরত বলতেন, হযরত থানভী রহ. বলেন, আমি আমার বাড়িতে দেখতাম যে, দস্তরখানে লাউয়ের তরকারী থাকতো। বেশ কিছুদিন ধরে এ ধারা চলছিলো। বিবি সাহেবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, লাগাতার লাউয়ের তরকারী পাকাচ্ছো যে? তিনি জবাবে বললেন, আমি একটি কিতাবে পড়েছি, লাউ হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব পছন্দ ছিলো। এজন্য বাজারকারীকে বলেছি, যতো দিন বাজারে লাউ পাওয়া যাবে, অবশ্যই কিনবে। যাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামান্য ইত্তিবা নসিব হয়। হযরত থানভী রহ. বলেন, বিবি সাহেবার এই কথা শুনে আমার শরীর কেঁপে ওঠলো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সুন্নাতটি না ফরয, না ওয়াজিব, বরং এটি তাঁর একটি অভ্যাস মাত্র। এই মহিলার সুন্নাতের প্রতি এতটা গুরুত্ব! আর আমরা নিজেদেরকে আলেম বলে থাকি, লোকেরা আমাদেরকে আলেম বলে জানে অথচ হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের এতটা গুরুত্ব আমাদের মধ্যে নেই।
📄 তিন দিন পর্যন্ত নিজের কর্ম-কাণ্ডের উপর সমীক্ষা চালাই
এরপর থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি গোটা জীবনের কর্ম-কাণ্ড সমীক্ষা করে দেখবো যে, কোথায় কোথায় আমি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের উপর আমল করছি না, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সম্মুখে অগ্রসর হবো না। সুতরাং তিন দিন পর্যন্ত নিজের কর্ম-কাণ্ডের উপর সমীক্ষা চালাতে থাকি। দেখলাম, কোথায় কোথায় সুন্নাতের অনুসরণ থেকে বঞ্চিত। পরে আল্লাহ পাকের ফযল ও করমে আমলের পথ স্পষ্ট হয়ে গেলো এবং যে সকল সুন্নাত ছুটে গেছিলো আল্লাহ সেগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দান করেন। মোটকথা, এই ইত্তেবায়ে সুন্নাত এমন এক জিনিস, আপনি এর দিকে যতো অধিক পরিমাণে অগ্রসর হবেন, আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ততো বেশি বদ্ধমূল হবে।
📄 এ সব তিরস্কার গলার হার
অনেক সময় মানুষ যখন সুন্নাতের প্রতি অগ্রসর হয় তখন তাদেরকে তিরস্কার করা হয়। অনেক সময় তাদের নিয়ে হাসি-তামাশা করা হয়। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা হয়। এ ধরনের ভর্ৎসনার দরুণ অনেকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ কুরআনুল কারীম এদের প্রশংসা করে বলেছে-
يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَائِمٍ
অর্থাৎ, এরা আল্লাহর রাস্তায় মেহনত করে, কোনোও তিরস্কারকারীর তিরস্কারের পরোয়া করে না।' দুনিয়াবাসী যা ইচ্ছা বলুক। চাইলে ওরা আমাদেরকে 'পশ্চাদপদ' বলুক, 'প্রতিক্রিয়াশীল' বলুক, অজ্ঞ মুসলিম বলুক। আরে এ সব তিরস্কার তো আল্লাহর পথিকদের গলার হার। এ সব তিরস্কার তো নবীগণকে করা হয়েছে। তাদেরকে 'বেওকুফ' বলা হয়েছে। নবীদের অনুসারীদেরকে বলা হয়েছে-
أَنُؤْمِنُ كَمَا أَمَنَ السُّفَهَاءُ
অর্থাৎ, আমরাও কি তেমনি ঈমান আনবো যেমন এই বেওকুফরা ঈমান এনেছে?২
এই ভর্ৎসনা নবীরাও পেয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের ভাগ্যেও জুটেছে। তাঁদেরকে 'পাগল' বলা হয়েছে, 'পথভ্রষ্ট' বলা হয়েছে। আল্লাহর রাস্তায় যখন এ ধরনের ভর্ৎসনা আসে, প্রকৃতপক্ষে তা 'পদক' ও সম্মাননা হয়ে থাকে। দুনিয়াদারদের মুখ কতক্ষণ আটকিয়ে রাখবে? কতক্ষণ তাদের পরোয়া করবে?
কিয়ামতের দিন ঈমানদারগণ কাফেরদের লক্ষ্য করে হাসবে। সুতরাং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করলে এ সব তিরস্কারের পরোয়া করো না। কোমর বেঁধে তৈরি হও। ভাবো, এ সব ভর্ৎসনা ও তিরস্কার আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মাননা। তবে কুরআন বলছে যে,
فَالْيَوْمَ الَّذِينَ آمَنُوا مِنَ الْكُفَّارِ يَضْحَكُونَ
'আজ সময় এসেছে ঈমানদারদের ওই কাফেরদেরকে লক্ষ্য করে হাসার।”
আসবে সে সময়। কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় চলতে চাও তাহলে দুনিয়াদারদের ভর্ৎসনার পরোয়া করো না।
جسکو ہو جان و دل عزیز
اس کی گلی میں جائیں کیوں
যার কাছে নিজের মন-প্রাণ অধিক প্রিয় সে তাঁর গলিতে যাবে কেন?
এ রাস্তায় যখন এসেছো তখন তিরস্কার সইতে হবে। আল্লাহ তাঁর ফযল ও করমে আমাদেকে এর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত-৩৫
২. সূরা বাকারা, আয়াত-১৩
৩. সূরা তাতফীফ, আয়াত-৩৪