📄 জনৈক বুযুর্গ ও অহংকারীর ঘটনা
মনে যদি এই চিন্তা জাগে যে, আমি বড়ো মানুষ। আমার প্রভাব-প্রত্তি রয়েছে। অন্তরে যদি অহমিকা জাগে, তখন মানুষ অপরকে বলে, 'জানো না আমি কে!'
একবার এক বুযুর্গ জনৈক ব্যক্তিকে সংশোধনমূলক একটি কথা বললে প্রতি-উত্তরে সে বললো, 'জানো না আমি কে!' অর্থাৎ, আমি এক বিরাট ব্যক্তিত্ব, তুমি আমার ইসলাহ করছো! জবাবে ঐ বুযুর্গ বললেন, হ্যাঁ! আমি জানি তুমি কে, তোমার হাকীকত তো এই যে,
أَوَّلُكَ نُطْفَةٌ مَذِرَةٌ وَاخِرُكَ جِيْفَةً قَذِرَةٌ وَأَنْتَ فِيمَا بَيْنَ ذَلِكَ تَحْمِلُ الْقَذِرَةَ
অর্থাৎ, তোমার শুরুটা পুতিগন্ধময় নাপাক বীর্যের এক ফোঁটা। এই হলো তোমার মূল ও সূচনা। আর তোমার পরিণতি হলো, তুমি এক দুর্গন্ধময় মৃত লাশে পরিণত হবে। এমন দুর্গন্ধময় যে, তোমার পরিবারের লোকেরাও তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে নিজেদের ঘরে রাখতে রাজি হবে না। তোমার মরণে তারা কাঁদবে ঠিকই কিন্তু ঘরে রাখতে রাজি হবে না। তারা বলবে, লাশের দুর্গন্ধ সহ্য করার শক্তি আমাদের নেই। সুতরাং অবিলম্বে তোমাকে কবরস্থানে নিয়ে মাটিচাপা দিবে। এদিকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তুমি নাপাক বোঝা বয়ে চলেছো। এটা কোনো অতিরঞ্জিত কথা নয়, বরং একান্তই বাস্তব কথা। বাস্তবিকই চিন্তা করলে দেখতে পাবে যে, মানুষ আপাদমস্তক নাপাকের পোটলা। আল্লাহ পাক দয়া করে চামড়া দ্বারা এগুলো আড়াল করে দিয়েছেন। দোষ-ত্রুটি গুপ্ত আছে, দুর্গন্ধ আবৃত আছে, নয়ত এই সুন্দর চেহারায় সামান্য চিড় ধরলে দেখবেন নাপাক বেরিয়ে আসছে। কোথাও রক্ত, কোথাও পুঁহ, কোথাও পেশাব, কোথাও পায়খানা ভরপুর। এখন তো সকলে মহৎকার করছে। নিকটে বসাচ্ছে। কিন্তু চেহারা থেকে চামড়া সরে গেলে কেউ ধারেও বসতে চাইবে না। বরং ঘৃণা করবে। এমনকি কেউ ওদিকে তাকাতেও চাইবে না। সুন্দর এই চেহারা তখন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। দেখে সকলে ভয়ে শিউরে উঠবে। সুতরাং তোমার সূচনা দুর্গন্ধময় বীর্য, সমাপ্তি পঁচা লাশ, হয় মাঝের সময়টা নাপাকি বহন করে ফিরছো। এই হলো তোমার বাস্তবতা, তারপরেও তুমি বলো, 'জানো আমি কে?'!
📄 বিনয় ও ভঙ্গুরতা কাম্য
মানুষের নিজের এই হাকীকত সম্পর্কে অনুভূতি-উপলব্ধি না হওয়া পর্যন্ত তার আল্লাহ পাকের নিয়امতের উপলব্ধি হতে পারে না এবং আল্লাহ পাকের যথাযোগ্য মহব্বতও পয়দা হতে পারে না। এজন্য হযরত থানভী রহ. বলেন, 'নিজের প্রকৃত অবস্থার পরিচয় লাভ করো'। তরীকতের পয়লা এবং শেষ সবক হলো, 'নিজের হাকীকত জানা, নিজেকে মিটানো এবং নিজেকে বিলুপ্ত করা'। যার মধ্যে দাবী থাকবে, অহমিকা থাকবে, শান-শওকত দেখাবে এবং অহংকার করবে, সে এ পথের কিছুই লাভ করতে পারবে না। এখানে বিনয় ও ভগ্নতা কাম্য। নিজের দীনতা-হীনতার প্রকৃত উপলব্ধি এবং আল্লাহ পাকের সামনে বিলুপ্তি কাম্য।
📄 নিজের চোখে ছোট এবং অন্যের চোখে বড়ো
এজন্য হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের নিকট এই দু'আ করতেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي فِي عَيْنِي صَغِيرًا وَفِي أَعْيُنِ النَّاسِ كَبِيرًا
'হে আল্লাহ! আপনি আমার দৃষ্টিতে আমাকে ছোট বানিয়ে দিন এবং মানুষের দৃষ্টিতে বড়ো বানিয়ে দিন।”
অর্থাৎ, যখন আমি আমাকে দেখবো নিজেকে ছোট ভাববো, যাতে আমার মধ্যে বিনয় সৃষ্টি হয়। অবশ্য লোকদের দৃষ্টিতে আমাকে বড়ো বানিয়ে দিন। কেননা লোকেরা যদি আমাকে ছোট জ্ঞান করে তাহলে আমার প্রতি তারা জুলুম-অত্যাচার করবে। জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তি চমৎকার বলেছেন,
سگ باشد و بر اور خورد مباش
'কুকুর হও কিন্তু ছোট ভাই হয়ো না।'
এ কথার উদ্দেশ্য হলো, সকল মুসীবত ছোট ভাইয়ের ওপর আপতিত হয়। এজন্য যদি অন্যে মনে করে যে, এ ছোট, তাহলে এর প্রতি জুলুম করবে, একে ভূনা করে খাবে। এ যখন ছোট, তখন তার সাথে যা খুশি তাই করো। সুতরাং প্রতিরক্ষার জন্য, নিজেকে বাঁচানোর জন্য হে আল্লাহ! লোকদের দৃষ্টিতে আমাকে বড়ো বানিয়ে দিন। কিন্তু নিজকে যেন আমি ছোটই মনে করতে থাকি।
টিকাঃ
১. মাজমাউয যাওয়ায়েদ ওয়া মানবাউল ফাওয়ায়েদ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৪৩১, সুবুলুল হুদা ওয়ার ইরশাদ ফী সীরাতি খাইরিল 'ইবাদ, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-৫৩২, কানযুল উম্মাল, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২৭৯ হাদীস নং ৩৬৭৫
📄 বিলোপই শুরু, বিলোপই শেষ
হযরত হাকীমুল উম্মত (কু.সি.) বলেন, আমাদের শাইখ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কী রহ.-এর প্রথম ও শেষ সবক ছিলো 'বিলোপ আর বিলোপ'। অর্থাৎ, নিজেকে মিটানো। তিনি বলেন, যে শাইখগিরি, পীরগিরি ও শান-শওকতের পথ অবলম্বন করে, আমাদের তরীকার বাতাসও তার গায়ে লাগেনি। এজন্য সাধারণ মানুষের মতো থাকো। শান-শওকত বানানোর প্রয়োজন নেই। আড়ম্বর পরিহার করো। নিজের প্রকৃত অবস্থা সামনে রাখো। এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের উপলব্ধি আসবে, শোকরের তাওফীক লাভ হবে এবং আল্লাহ পাকের মহব্বত পয়দা হবে।