📄 নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করুন
হযরত থানভী রহ.-এর উপরোক্ত কথার আরেকটি মর্ম হতে পারে, যা তিনি অন্যত্র বর্ণনা করেছেন। যেমন, আমাদের ভাই কালীম সাহেব বলেছেন, তিনি হযরতের কোনো এক ওয়াজে এই ব্যাখ্যা পাঠ করেছেন যে, যেভাবে আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত এবং নিজের কর্ম নিয়ে ভাবলে আল্লাহ তা'আলার মহব্বত পয়দা হয়, একইভাবে আল্লাহ পাকের নিয়ামত এবং নিজ অবস্থান সম্পর্কে চিন্তা করার দ্বারাও অন্তরে মহব্বত পয়দা হয়। নিজ অবস্থান নিয়ে চিন্তা করার অর্থ এই যে, আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব, মহত্ব, প্রতিপত্তি, তাঁর রহমত, পূর্ণ শক্তি ও মহা কৌশলের কথা চিন্তা করবে। অপরদিকে নিজের অবস্থানগত দৈন্য কল্পনা করবে যে, আমার কোনো মূল্য নেই। আমি তো কোনো কাজের যোগ্য নই। আমার কাছে যা আছে সবই তো তাঁর দান। নতুবা আমার কাছে তো কিছুই ছিলো না। আমি নিজে নিজেকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম নই। আমি নিজেকে জীবিত রাখতেও সক্ষম নই। চেহারা, অবয়ব, সুস্থতা ও জ্ঞান কোনোটিই আমি অর্জন করতে সক্ষম নই। এর কিছুই আমার ছিলো না। এসবই তাঁর দান। তিনি চাইলে এগুলো ছিনিয়ে নিতে পারেন। ফিরিয়ে নিতে পারেন।
📄 এতে আল্লাহর শোকর ও মহব্বত বৃদ্ধি পায়
সবকিছুই যখন তাঁর আবদান তখন কী নিয়ে অহঙ্কার করবো? কীসের উপর গর্ব করবো? কিসের ভিত্তিতে আত্মগৌরব ও আত্মশ্লাঘায় লিপ্ত হবো! কারণ, আমার মধ্যে তো আমার নিজের কিছুই নেই। এই হচ্ছে, নিজের অবস্থান নিয়ে চিন্তা করা। এতে আল্লাহর মহব্বত পয়দা হবে। যতো বেশি নিজের দীনতার অনুভূতি জাগ্রত হবে, ততো বেশি আল্লাহ পাকের নিয়امতের মর্যাদা ও গুরুত্বের অনুভূতি জাগ্রত হবে। মানুষ যদি নিজেকে এসব নিয়امতের যোগ্য মনে করে তাহলে সে ভাববে, আমার সাথে আল্লাহর এমনই করা দরকার ছিলো। আমাকে এ নিয়ামত দেওয়াই উচিত ছিলো। এ ধরনের মানুষ আল্লাহ পাকের কী শোকর আদায় করবে? তার অন্তরে আল্লাহ তা'আলার জন্য কোথেকে মহব্বত জন্মাবে? পক্ষান্তরে মানুষ যদি এ কথা চিন্তা করে যে, আমার কোনো মূল্য না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ পাক আমাকে এই নিয়ামত দান করেছেন, তাহলেই কেবল সে আল্লাহ পাকের শোকর আদায় করবে এবং অন্তরে তাঁর মহব্বত পয়দা হবে।
📄 জনৈক বুযুর্গ ও অহংকারীর ঘটনা
মনে যদি এই চিন্তা জাগে যে, আমি বড়ো মানুষ। আমার প্রভাব-প্রত্তি রয়েছে। অন্তরে যদি অহমিকা জাগে, তখন মানুষ অপরকে বলে, 'জানো না আমি কে!'
একবার এক বুযুর্গ জনৈক ব্যক্তিকে সংশোধনমূলক একটি কথা বললে প্রতি-উত্তরে সে বললো, 'জানো না আমি কে!' অর্থাৎ, আমি এক বিরাট ব্যক্তিত্ব, তুমি আমার ইসলাহ করছো! জবাবে ঐ বুযুর্গ বললেন, হ্যাঁ! আমি জানি তুমি কে, তোমার হাকীকত তো এই যে,
أَوَّلُكَ نُطْفَةٌ مَذِرَةٌ وَاخِرُكَ جِيْفَةً قَذِرَةٌ وَأَنْتَ فِيمَا بَيْنَ ذَلِكَ تَحْمِلُ الْقَذِرَةَ
অর্থাৎ, তোমার শুরুটা পুতিগন্ধময় নাপাক বীর্যের এক ফোঁটা। এই হলো তোমার মূল ও সূচনা। আর তোমার পরিণতি হলো, তুমি এক দুর্গন্ধময় মৃত লাশে পরিণত হবে। এমন দুর্গন্ধময় যে, তোমার পরিবারের লোকেরাও তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে নিজেদের ঘরে রাখতে রাজি হবে না। তোমার মরণে তারা কাঁদবে ঠিকই কিন্তু ঘরে রাখতে রাজি হবে না। তারা বলবে, লাশের দুর্গন্ধ সহ্য করার শক্তি আমাদের নেই। সুতরাং অবিলম্বে তোমাকে কবরস্থানে নিয়ে মাটিচাপা দিবে। এদিকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তুমি নাপাক বোঝা বয়ে চলেছো। এটা কোনো অতিরঞ্জিত কথা নয়, বরং একান্তই বাস্তব কথা। বাস্তবিকই চিন্তা করলে দেখতে পাবে যে, মানুষ আপাদমস্তক নাপাকের পোটলা। আল্লাহ পাক দয়া করে চামড়া দ্বারা এগুলো আড়াল করে দিয়েছেন। দোষ-ত্রুটি গুপ্ত আছে, দুর্গন্ধ আবৃত আছে, নয়ত এই সুন্দর চেহারায় সামান্য চিড় ধরলে দেখবেন নাপাক বেরিয়ে আসছে। কোথাও রক্ত, কোথাও পুঁহ, কোথাও পেশাব, কোথাও পায়খানা ভরপুর। এখন তো সকলে মহৎকার করছে। নিকটে বসাচ্ছে। কিন্তু চেহারা থেকে চামড়া সরে গেলে কেউ ধারেও বসতে চাইবে না। বরং ঘৃণা করবে। এমনকি কেউ ওদিকে তাকাতেও চাইবে না। সুন্দর এই চেহারা তখন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। দেখে সকলে ভয়ে শিউরে উঠবে। সুতরাং তোমার সূচনা দুর্গন্ধময় বীর্য, সমাপ্তি পঁচা লাশ, হয় মাঝের সময়টা নাপাকি বহন করে ফিরছো। এই হলো তোমার বাস্তবতা, তারপরেও তুমি বলো, 'জানো আমি কে?'!
📄 বিনয় ও ভঙ্গুরতা কাম্য
মানুষের নিজের এই হাকীকত সম্পর্কে অনুভূতি-উপলব্ধি না হওয়া পর্যন্ত তার আল্লাহ পাকের নিয়امতের উপলব্ধি হতে পারে না এবং আল্লাহ পাকের যথাযোগ্য মহব্বতও পয়দা হতে পারে না। এজন্য হযরত থানভী রহ. বলেন, 'নিজের প্রকৃত অবস্থার পরিচয় লাভ করো'। তরীকতের পয়লা এবং শেষ সবক হলো, 'নিজের হাকীকত জানা, নিজেকে মিটানো এবং নিজেকে বিলুপ্ত করা'। যার মধ্যে দাবী থাকবে, অহমিকা থাকবে, শান-শওকত দেখাবে এবং অহংকার করবে, সে এ পথের কিছুই লাভ করতে পারবে না। এখানে বিনয় ও ভগ্নতা কাম্য। নিজের দীনতা-হীনতার প্রকৃত উপলব্ধি এবং আল্লাহ পাকের সামনে বিলুপ্তি কাম্য।