📄 তাঁর নিয়ামত সকলের জন্য উন্মুক্ত
আল্লাহ পাকের নিয়امতের পরম্পরা অনিঃশেষ। এ সব নিয়ামত যখন বারবার স্মরণ করা হবে তখন তার মহব্বত অন্তরে পয়দা হবে। প্রয়োজন শুধু ধ্যান করা। তাঁর নিয়ামত তো অব্যাহত আছেই। আপনি শোকর আদায় করুন আর না-ই করুন তাঁর নিয়امতে কখনও ঘাটতি হবে না। শেখ সাদী রহ. বলেন,
ادیم زمیں سفره عام اوست
بری خوان نعمت چه دشمن چه دوست
অর্থাৎ, আল্লাহ পাক সমগ্র পৃথিবীকে এমন এক সার্বজনীন দস্তরখান বানিয়ে রেখেছেন যে, সকল মাখলুক এ থেকে উপকৃত হয়ে চলেছে। এই দস্তরখানে শত্রু-মিত্রের ভেদাভেদ নেই। শত্রুকেও তিনি ঐভাবে দান করেন যেভাবে দান করেন মিত্রকে। এই দুনিয়ায় আল্লাহ তা'আলার জাহেরী নিয়ামতসমূহ মুসলিম ও কাফের সকলের উপর বর্ষিত হচ্ছে। বরং ক্ষেত্র বিশেষে কাফেরদের উপর অধিক বর্ষিত হচ্ছে। তারা মুসলিমদের তুলনায় অধিক স্বচ্ছল। অধিক উন্নত। তাদের কাছে অধিক টাকা ও বিত্ত-বৈভব রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা দেখছেন, অমুক আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে, আমাকে অপদস্ত করছে, আমার সঙ্গে গোস্তাখি করছে, আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে; এরপরও আল্লাহ পাক তাকে নিয়ামত দান করছেন। এটা আল্লাহ তা'আলার নিয়ম।
📄 দোস্তদের দিয়েছেন অভাব-অনটন এবং দুশমনদের দিয়েছেন স্বচ্ছলতা
বরং কোনো কোনো সময় আল্লাহ পাক ইচ্ছা করে প্রিয় বান্দাদেরকে এই দুনিয়ায় অভাব-অনটনে ফেলেন এবং শত্রুদের ধন-সম্পদে পূর্ণ করেন। এ প্রসঙ্গে মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
ما پروریم دشمن و ما می کشیم دوست
کس را چراں وچوں نہ رسد در قضائے ما
অর্থাৎ, কখনো আমি দুশমনকে লালন করি এবং দোস্তকে হত্যা করি। যেভাবে সামেরী যাদুকরকে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম দ্বারা লালন করা হয়েছে। অপরদিকে ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে করাত দ্বারা দ্বি-খণ্ডিত করা হয়েছে। সুতরাং ইহজগতে আল্লাহ পাকের নিয়ামত দোস্ত-দুশমন ও মুসলিম-কাফের সকলের জন্যে অবারিত। আল্লাহ পাকের নিয়امতে কোনো ঘাটতি হয় না।
📄 এসব নেয়ামতের প্রতি মনোযোগ নেই
کوئی جو ناشناس ادا ہو تو کیا علاج
ان کی نوازشوں میں تو کوئی کمی نہیں
'কেউ যদি অকৃতজ্ঞ হয় তাহলে তার চিকিৎসা কী?
তাঁর দান-অনুদানে তো কোনো কমতি নেই।'
তার অনুগ্রহ-বারি তো সর্বদা অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজন শুধু চিন্তা করা। আমরা তার নিয়امতের প্রতি গাফেল, চিন্তা করি না। এজন্য নিয়امতের প্রতি খেয়াল নেই। আল্লাহ পাক যদি তাঁর ধ্যান করার তাওফীক দান করেন, তাহলে এটা মোটেই সম্ভব নয় যে, আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত সম্পর্কে চিন্তা করার পরও অন্তরে তাঁর মহব্বত পয়দা হবে না। এজন্য গতকাল আমি আরজ করেছিলাম যে, রাতে শোয়ার পূর্বে নেয়ামতসমূহের কথা চিন্তা করুন এবং এর শোকর আদায় করুন। মোটকথা, মহব্বত পয়দা করার দ্বিতীয় তরীকা হলো, আল্লাহ তা'আলার নিয়امতের কথা চিন্তা করা।
📄 তৃতীয় পদ্ধতি: নিজের আচরণ ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা
এরপর হযরত বলেন, এর পাশাপাশি নিজের আচরণ ও কর্ম নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করবে। অর্থাৎ, এ কথা চিন্তা করবে যে, একদিকে বৃষ্টির মতো অবিরাম ধারায় আল্লাহ পাকের নিয়ামত বর্ষিত হচ্ছে, অপরদিকে আল্লাহ পাক সামান্য যেই ইবাদতের হুকুম দিয়েছেন, তাতে আমি অলসতা করছি। যে গোনাহ থেকে তিনি বিরত থাকার আদেশ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রেও অলসতা করছি।
মাওলানা রূমী রহ. বলেন,
کارساز ما بساز کار ما
فکر ما در کار ما آزار ما
অর্থাৎ, আমাদের কর্ম-নিয়ন্তা দিন-রাত আমাদের কাজে লেগে আছেন। আমাদের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করছেন। আমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামত বর্ষণ করছেন। কিন্তু যে কাজ তিনি আমাদের উপর ন্যস্ত করেছেন, সে কাজকে আমরা বিপদ মনে করছি। আমরা নামায পড়া, রোযা রাখা এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকাকে মুসীবত মনে করছি। আল্লাহ তা'আলার নিয়امতের প্রতিদানে বান্দার কর্মকাণ্ড কতোই না নাশোকরীতে ভরা। যদি মানুষ একথা চিন্তা করে যে, আমার এমন কর্মকাণ্ডের পরও আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমার উপর নিয়امতের বারি বর্ষণ হচ্ছে, তাহলে আল্লাহর মহব্বত অন্তরে পয়দা হবে। এজন্য হযরত থানভী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতসমূহ এবং প্রতিদানে নিজের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন।