📄 আল্লাহওয়ালাদের সংসর্গ দ্বারা ধ্যান-খেয়াল লাভ হয়
এই ধ্যান, খেয়াল ও অনুভূতি তখনই লাভ হয়, যখন মানুষ কোনো আল্লাহওয়ালার সোহবতে বসে। যতো দিন আল্লাহওয়ালাগণের সোহবত লাভ হয়নি, ততো দিন উদাসীনতার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়েছে। তখন চিন্তাই জাগেনি যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার কী কী নেয়ামত বর্ষিত হচ্ছে? বরং কোনো না কোনো মুসীবত নিয়ে কেঁদে-কেটেই সময় অতিবাহিত হয়েছে। সামান্য কষ্ট এসেছে, সামান্য উদ্বিগ্নতা এসেছে, তা নিয়েই দিন-রাত একাকার করে বসেছে। তা নিয়েই কান্নাকাটি করেছে। কিন্তু যখনই আল্লাহ পাক কোনো আল্লাহওয়ালার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন, মানুষ যখন কোনো আল্লাহওয়ালার আঁচল ধরেছে, তখন এই উপলব্ধি ও বুঝ এসেছে যে, আরে তুমি সামান্য এক মুসীবত নিয়ে মুখ গোমরা করে বসে আছো, তোমার উপর তো সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতের বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে।
📄 কুরআনে কারীমে চিন্তা-ফিকিরের আহ্বান
কুরআনে কারীমও আপনাকে এ আহ্বান করছে যে, সামান্য চিন্তা করো, সামান্য ভাবো। কুরআনে কারীমের বহু জায়গায় গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করার হুকুম করা হয়েছে। কিন্তু আজকাল মানুষ এর ভুল অর্থ বুঝে বসে আছে। বর্তমানে মানুষ বলে, কুরআনে কারীম বারবার চিন্তা-ফিকিরের আহ্বান করেছে। এর মর্ম হলো, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ সাধন করো। কিন্তু কুরআনে কারীম যেই চিন্তা-ফিকিরের আহ্বান করেছে, তার দ্বারা এ অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ সাধন নিন্দনীয় কোনো বিষয় নয়, বরং তা জায়েয ও মুস্তাহাবের পর্যায়ে। ক্ষেত্র বিশেষে ওয়াজিব। কিন্তু কুরআনুল কারীম যেই চিন্তা-ফিকিরের আহ্বান করেছে, তার উদ্দেশ্য এটা নয়। কুরআনের আহ্বান করা চিন্তা-ফিকিরের মর্ম হলো, আল্লাহর নেয়ামতসমূহ, তাঁর সৃষ্টি কৌশল, তাঁর পরিপূর্ণ কুদরত সর্বোপরি তাঁর অবারিত নিয়ামত সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করা।
হাদীস শরীফে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের জন্য যখন জাগ্রত হতেন, তখন আসমানের দিকে তাকিয়ে এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন,
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
'আসমান ও জমিনসমূহের সৃষ্টি এবং রাত-দিনের আবর্তনের মধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে।' বুদ্ধিমান কারা? এর বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
বুদ্ধিমান তারা, যারা আল্লাহ পাককে স্মরণ করে দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায়। ঐ সব লোকেরা বলে, হে পরওয়ারদেগার! আপনি (এই আকাশ, জমিন, তারকারাজি এবং) এ বিশ্বচরাচর অহেতুক সৃষ্টি করেননি। (বরং আমাদের উপকার এবং আমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যকার প্রতিটি বস্তুই একেকটি নিয়ামত। হে আল্লাহ! এই দুনিয়াতে যখন আপনি আমাদেরকে এসব নিয়ামত দান করেছেন,) তাই হে পরওয়ারদেগার! আমাদেরকে আপনার রহমতের বদৌলতে জাহান্নামের আযাব থেকেও নাজাত দান করুন।'
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের সময় এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন।
টিকাঃ
১. সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৯০
📄 এ আকাশ আমার জন্য! এ জমিন আমার জন্য!
আমার ওয়ালেদ মাজেদ মুফতী মুহাম্মাদ শফী' রহ.-এর একটি কবিতা রয়েছে। তাতে তিনি বলেন,
یہ زمیں میرے لئے یہ آسماں میرے لئے
چل رہا ہے دیر سے یہ کارواں میرے لئے
এ পৃথিবী আমার জন্যে, এ আকাশ আমার জন্যে
আদি কাল থেকে এ কাফেলা চলমান আমার জন্যে
অর্থাৎ, ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডল আল্লাহ পাক আমার কল্যাণে ও আমার উপকারের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। আপনি যদি একটু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, এই সূর্য আপনার খেদমত করছে, এই তারকারাজি আপনার সেবা করছে, এই বাতাস আপনার খেদমত করছে। সমুদ্র, নদী, পাহাড়, বন সবকিছুই আল্লাহ পাক আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
'যা কিছু তিনি জমিনে পয়দা করেছেন তা তোমাদের জন্যই পয়দা করেছেন।'
টিকাঃ
১. সূরা আল বাকারা, আয়াত-২৯
📄 এই সূর্য আমার জন্য
প্রতিদিন সকালে সূর্য উদিত হয়। কিরণ ছড়ায়। আলো ও তাপ দেয়। সন্ধ্যায় অস্ত যায়। এসব কেন হয়? আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, হে মানুষ! এতো বড়ো সৃষ্টি সূর্যকে আমি তোমার জন্যই পয়দা করেছি, যেন তুমি আলো পাও। তাপ পাও। এর আলোতে তুমি তোমার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারো। একে এতো দূরে রেখেছি, যাতে এর দ্বারা তোমার উপকার হয় এবং তুমি এর ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারো। এই সূর্যের কিরণের মাঝে উপকারী ও অপকারী দুটি বিপরীতমুখী অংশ আছে। অপকারী অংশ ছেঁকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ পাক পুরো দুনিয়ার আশেপাশে চালনির একটি 'স্তর' বসিয়ে দিয়েছেন, যাকে আজকাল (বিজ্ঞানের পরিভাষায়) OZONE LAYER বলা হয়। এই ওজনস্তর খুবই সূক্ষ্ম। এই 'চালনি' সৌর কিরণকে ছেঁকে কেবল এর উপকারী অংশটুকু মানবজাতিকে পৌঁচিয়ে থাকে এবং অপকারী অংশটুকু প্রতিহত করে রাখে। সুদীর্ঘকাল পরে এই ওজনস্তর আবিষ্কৃত হয়েছে। নয়ত মানুষ এগুলো সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যেতো। কিন্তু আসমান-জমিন সৃষ্টির সূচনাতেই আল্লাহ পাক এই ওজনস্তর সেট করে দিয়েছেন। জানি না আরো অজানা কতো বস্তু ও পদার্থ তিনি আমাদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন! একেকটি বস্তুর প্রকৃতি ও স্বরূপ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে আল্লাহ পাকের লাখো নেয়ামত বিদ্যমান দেখতে পাওয়া যায়।