📄 মহব্বত ইচ্ছাধীন নয়
হযরত থানভী রহ. বলেন, মহব্বত ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। কারো সাথে মহব্বত থাকে, কারো সাথে থাকে না। কারো সাথে মহব্বত বেশি থাকে, কারো সাথে কম থাকে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীগণের মাঝে সবধরনের আদর্শ সাম্য কায়েম করেছেন। সকলের সাথে সমান অধিকার বজায় রেখেছেন। এতদসত্ত্বেও তিনি দু'আ করেছেন,
اللَّهُمَّ هَذَا قَسْمِي فِيمَا أَمْلِكُ ، وَلَا تَلُمْنِي فِيمَا لَا أَمْلِكُ
'হে আল্লাহ! আমার ক্ষমতাধীন বিষয়ে আমি বণ্টন করেছি। যতটুক পয়সা একবিবিকে দিয়েছি, ততটুকু পয়সা অন্য বিবিদেরকেও দিয়েছি। যেমন খানা একস্ত্রীকে দিয়েছি, ওই পরিমাণ খানা অন্য বিবিদেরকেও দিয়েছি। যে কাপড় একজনকে দিয়েছি, ওই ধরনের কাপড় অন্যদেরকেও দিয়েছি। সুতরাং ইচ্ছাধীন ব্যাপারে আমি ইনসাফ ও সমতা বিধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছু বিষয় এমন আছে, যেগুলো আমার ইচ্ছাধীন নয়। হে আল্লাহ! এ ধরনের ইচ্ছাবহির্ভুত বিষয়ে আপনি আমাকে ধর-পাকড় করবেন না।'
এখানে প্রশ্ন জাগে যে, কোন জিনিসটি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষমতাধীন ছিলো না? হযরত উলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, সেটি হলো মহব্বত। মহব্বত ইচ্ছাধীন নয়। মহব্বতের বেলায় সকল স্ত্রীর মধ্যে সমতা বিধান সম্ভব নয়। এটি মানুষের সাধ্যাতীত বিষয়। মানুষ সেই মানদণ্ড কোথায় পাবে যার দ্বারা সে মাপবে যে, এক স্ত্রীকে যতটা মহব্বত করবে অপর স্ত্রীকেও ঠিক ততটা মহব্বত করবে। এর দ্বার প্রতীয়মান হয় যে, মহব্বত ক্ষমতা ও ইচ্ছাবহির্ভূত বিষয়। আর মহব্বত যখন ইচ্ছাধীন বিষয় নয়, তখন বান্দা আল্লাহর সাথে কীভাবে মহব্বত পয়দা করবে? এর জবাবে হযরত বলেন, মহব্বত ইচ্ছাধীন বিষয় না হলেও এর উপকরণসমূহ ইচ্ছাধীন ও ক্ষমতাভুক্ত বিষয়। এ সব উপকরণ অবলম্বন করা হলে মহব্বত পয়দা হয়। এই মালফুযে হযরত মহব্বতের উপকরণসমূহ বর্ণনা করছেন। প্রথম উপকরণটির বর্ণনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। তা হলো অধিকহারে যিকির করা। যতো বেশি যিকির করবে ততো বেশি মহব্বত পয়দা হবে। অধিক যিকিরের কিছু তরীকা আমি বর্ণনা করেছিলাম। কুরআন- হাদীসে বর্ণিত দু'আর প্রতি গুরুত্বারোপ করবে। অধিকহারে দু'আ করবে। সবকিছু আল্লাহর কাছে চাইবে। সামান্য সময় নির্দিষ্ট করে নিয়ে তাতে গুরুত্ব সহকারে আল্লাহর যিকির করবে। এসবের বিস্তারিত বর্ণনা ইতিপূর্বে করেছি。
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫৯, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং ৩৮৮২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৮২২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৯৬১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস না ২৩৯৫৯, সুনানে দারেমী, হাদীস নং ২১১০
📄 আল্লাহর নেয়ামতরাজি এবং নিজের আমল সম্পর্কে চিন্তা করা
হযরত থানভী রহ. এবার 'মহব্বত' পয়দা হওয়ার দ্বিতীয় উপকরণ বর্ণনা করছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত ও অনুগ্রহসমূহ এবং নিজের আচরণ তথা কার্যকলাপ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা।'
এতে তিনি দু'টি বিষয় বর্ণনা করেছেন। এক. আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত ও অনুগ্রহসমূহকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। দুই. নিজের কাজকর্ম ও আচার-ব্যবহার নিয়ে চিন্তা করা।
আল্লাহ তা'আলার মহব্বত ও তাঁর সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্যে এ দুটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা অব্যর্থ মহৌষধ। প্রতিমুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতরাজির যেই বর্ষণ হচ্ছে, এর ধ্যান করুন, ভাবুন ও মুরাকাবা করুন। মুরাকাবা ও ধ্যান করলে বুঝে আসবে, অন্যথায় তা বুঝেও আসবে না।
📄 নেয়ামতসমূহ সম্পর্কে মুরাকাবা ও ধ্যান করুন
মানুষ সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতরাজির মধ্যে লালিত পালিত হচ্ছে। প্রতিটি মানবসত্তার উপর প্রতিমুহূর্তে আল্লাহ তা'আলার অসংখ্য নেয়ামত ও রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে। কিন্তু এসবের দিকে আদৌ ধ্যান-খেয়াল যায় না যে, এগুলোও নেয়ামত এবং এগুলোও আমরা ভোগ করছি। এর দরুণ মানুষ উদাসীন হয়ে আছে। কিন্তু মানুষ গুরুত্ব ও ধ্যানের সাথে ঐসব নেয়ামতের প্রতি মনোনিবেশ করলে সেগুলো তার সামনে ধরা দেয় এবং সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ হয়। তখন তার অনুভূতি জাগ্রত হয় যে, এগুলোও আল্লাহর নেয়ামত, যা প্রতিমুহূর্তে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার উপর বর্ষিত হচ্ছে।
📄 আল্লাহওয়ালাদের সংসর্গ দ্বারা ধ্যান-খেয়াল লাভ হয়
এই ধ্যান, খেয়াল ও অনুভূতি তখনই লাভ হয়, যখন মানুষ কোনো আল্লাহওয়ালার সোহবতে বসে। যতো দিন আল্লাহওয়ালাগণের সোহবত লাভ হয়নি, ততো দিন উদাসীনতার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়েছে। তখন চিন্তাই জাগেনি যে, আমার উপর আল্লাহ তা'আলার কী কী নেয়ামত বর্ষিত হচ্ছে? বরং কোনো না কোনো মুসীবত নিয়ে কেঁদে-কেটেই সময় অতিবাহিত হয়েছে। সামান্য কষ্ট এসেছে, সামান্য উদ্বিগ্নতা এসেছে, তা নিয়েই দিন-রাত একাকার করে বসেছে। তা নিয়েই কান্নাকাটি করেছে। কিন্তু যখনই আল্লাহ পাক কোনো আল্লাহওয়ালার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন, মানুষ যখন কোনো আল্লাহওয়ালার আঁচল ধরেছে, তখন এই উপলব্ধি ও বুঝ এসেছে যে, আরে তুমি সামান্য এক মুসীবত নিয়ে মুখ গোমরা করে বসে আছো, তোমার উপর তো সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহ তা'আলার নেয়ামতের বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে।