📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 সন্তানের সংশোধন কতক্ষণ পর্যন্ত করবে

📄 সন্তানের সংশোধন কতক্ষণ পর্যন্ত করবে


যেমন সন্তানের ব্যাপারে নির্দেশ হলো, মা-বাবা যদি দেখে যে, সন্তান ভুল পথে চলছে তাহলে তাকে বাধা দেওয়া এবং ভুল পথ থেকে বাঁচানো তাদের দায়িত্ব। যেমন কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকেও আগুন থেকে বাঁচাও এবং নিজেদের পরিবার পরিজনকেও আগুন থেকে বাঁচাও।'
মা-বাবার দায়িত্বে এটা ফরয। কিন্তু এক ব্যক্তি তার যাবতীয় শক্তি ব্যয় করা সত্ত্বেও সন্তান মানলো না, তাহলে এমতাবস্থায় ইনশাআল্লাহ ঐ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট মায়ুর বলে গণ্য হবে। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ছেলে শেষ পর্যন্ত ইসলাম কবুল করেনি। তিনি তাকে বুঝিয়েছেন, তাবলীগ করেছেন, দাওয়াত দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি তাবলীগের হক কে আদায় করতে পারে! কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে ইসলাম গ্রহণ করেনি। এখন এ বিষয়ে হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে ধরা হবে না।
এক ব্যক্তির বন্ধু ভুল পথে চলছে, অন্যায় কাজ করছে, সে তার সামর্থ্য মোতাবেক আদর-মহব্বত করে সার্বিকভাবে তাকে বুঝালো। বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত হয়ে গেলো, কিন্তু ঐ বন্ধু অন্যায় কাজ থেকে ফিরে এলো না, তাহলে তার উপর এর দায়-দায়িত্ব বর্তাবে না।

টিকাঃ
১. সূরা তাহরীম, আয়াত-৬

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 তোমরা নিজেকে নিজে ভুলে যেয়ো না

📄 তোমরা নিজেকে নিজে ভুলে যেয়ো না


এরপর আল্লামা নববী রহ. একটি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَ تَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتُبَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'তোমরা কি (অন্য) মানুষকে নেক কাজের হুকুম দাও আর নিজেদেরকে নিজেরা ভুলে যাও অথচ তোমরা কিতাবও তিলাওয়াত করো। তোমাদের কি এতোটুকু জ্ঞানও নেই।'
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইহুদীদেরকে সম্বোধন করে বলেন যে, তোমরা অন্যদেরকে সৎকর্মের উপদেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হয়ে যাও অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো। অর্থাৎ, তোমরা তাওরাতের আলেম হওয়ার কারণে মানুষ তোমাদের শরণাপন্ন হয়। এ নির্দেশ যদিও ইহুদীদের জন্য ছিলো, কিন্তু মুসলিমদের জন্য তা আরো বেশী উপযুক্ত। যে ব্যক্তি অন্যকে নসীহত করছে তার উচিত আগে নিজের উপরে তা বাস্তবায়ন করা।
এ মাসআলা তো আমি আপনাদেরকে পূর্বে বলেছি যে, তাবলীগের বিষয়ে এ বিধান নেই যে, যে ব্যক্তি মন্দ কাজে লিপ্ত সে তাবলীগ করবে না, অন্যদেরকে উপদেশ দিবে না, বরং বিধান এই যে, উপদেশ দিবে কিন্তু উপদেশ দানের পর চিন্তা করবে যে, অন্যদেরকে যখন উপদেশ দিচ্ছি তখন নিজেও এর উপর আমল করি। নিজেকে ভুলে না যাই। এরূপ মনে করবে না যে, এ উপদেশ অন্যের জন্যে। বরং চিন্তা করবে যে, এ উপদেশ আমার জন্যেও। আমাকেও এর উপর আমল করতে হবে।

টিকাঃ
১. সূরা বাকারা, আয়াত-৪৪

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 বক্তা ও ওয়ায়েযদের জন্যে বিপদজ্জনক কথা

📄 বক্তা ও ওয়ায়েযদের জন্যে বিপদজ্জনক কথা


এ আয়াতের পর আল্লামা নববী রহ. একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে অত্যন্ত মারাত্মক কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে এর লক্ষ্যে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করুন। ইরশাদ করেন,
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدِ بْنِ حَارِئَةً رَضِيَ الله عَنْهُمَا قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يُجَاءُ بِالرَّجُلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُلْقَى فِي النَّارِ فَتَنْدَلِقُ بِهِ أَقْتَابُ بَطْنِهِ فَيَدُورُ كَمَا يَدُورُ الْحِمَارُ فِي الرِّحَاءِ فَيَجْتَمِعُ إِلَيْهِ أَهْلُ النَّارِ فَيَقُولُونَ يَا فُلَانُ مَا لَكَ؟ أَلَمْ تَكُنْ تَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَى عَنْ الْمُنْكَرِ؟ فَيَقُولُ: بَلَى كُنْتُ آمُرُ بِالْمَعْرُوفِ وَلَا آتِيهِ وَأَنْهَى عَنْ الْمُنْكَرِ وَآتِيهِ
'হযরত উসামা ইবনে যায়েদ ইবনে হারেসা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, আগুনে পড়া মাত্র তীব্র তাপে তার নাড়ী-ভুড়ী পেট থেকে বাইরে বের হয়ে আসবে। সে ব্যক্তি তার নাড়ী-ভুড়ীর চর্তুদিকে এভাবে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা চর্কার চর্তুদিকে ঘুরে। (সে যুগে বড়ো মাপের চর্কায় গাধা বেঁধে দেওয়া হতো। গাধা ঐ চর্কা ঘুরাতো) জাহান্নামীরা এই দৃশ্য দেখে তার নিকট এসে একত্রিত হবে। তাকে জিজ্ঞাসা করবে, কি ব্যাপার? তোমাকে এমন শাস্তি কেন দেওয়া হচ্ছে? তুমি কি সেই ব্যক্তি নও যে মানুষকে নসীহত করতে? মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে? (তুমি আলেম ফাযেল ছিলে, সত্যের দাওয়াত দিতে, মানুষের সংশোধন করতে) আজ তোমার এ পরিণতি কীভাবে হলো? তখন ঐ ব্যক্তি উত্তরে বলবে, আমি মানুষকে তো নেক কাজের নসীহত করতাম, কিন্তু নিজে নেক কাজ করতাম না। মানুষকে মন্দ কাজে বাধা দিতাম, কিন্তু নিজে সেই মন্দ কাজে লিপ্ত হতাম। যার ফলে আজ আমার এ পরিণতি হয়েছে।'
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। এ হাদীস যখন পড়ি তখন ভয় লাগে। যেসব লোককে নেক কাজের কথা বলার ও দ্বীনের কথা শোনানোর কাজ করতে হয় তাদের জন্য এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও স্পর্শকাতর অবস্থান। তারা যেন এর লক্ষ্যে পরিণত না হয়! আল্লাহ তা'আলা নিজ দয়ায় এর লক্ষ্যে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী, হাদীস নং ৩০২৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৩০৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২০৭৮৫

📘 তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, পথ পদ্ধতি > 📄 বাতি থেকে বাতি জ্বলে

📄 বাতি থেকে বাতি জ্বলে


যাই হোক, মানুষের যদি নিজের বিষয়ে চিন্তা না থাকে আর অন্যের সংস্কার-সংশোধনের চিন্তা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং অন্যের দোষ তালাশ করে, তাহলে এভাবে সমাজ সংশোধিত না হয়ে বরং অধিক ফেৎনা-ফাসাদের পথ খুলে অধিক বিকৃতি ঘটবে। যেমনটি আমাদের সামনে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যদি আমাদের অন্তরে এই চিন্তা জাগ্রত করে দেন যে, আমরা প্রত্যেকে নিজের দোষগুলোর উপর জরিপ চালাবো যে, আমি কি কি ভুল কাজ করছি? তারপর তা সংশোধনের চিন্তা করবো। দশ বছর জীবন অবশিষ্ট থাক বা পনের-বিশ বছর, পরিশেষে প্রত্যেককে নিজের কবরে যেতে হবে। আল্লাহর সামনে নিজের সমস্ত আমলের জওয়াব দিতে হবে। একথা সামনে রেখে নিজের জীবনের উপর সমীক্ষা চালাবে, নিজের অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করবে, যেখানে যেখানে খারাপ কিছু দৃষ্টিগোচর হবে তা সংশোধনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এরপর কোনো সংগঠন বা দল যদি নাও বানায় কিন্তু কমপক্ষে নিজেকে নিজে সংশোধন করে। নিজে সঠিক পথে চলতে আরম্ভ করে। তাহলে কুরআনে কারীমের এ হুকুমের উপর আমল হবে। এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন এভাবে চলতে থাকবে। বাতি থেকে বাতি জ্বলে এবং প্রদীপ থেকে প্রদীপ আলোকিত হয়। এভাব দ্বীনের এ পন্থা অন্যদের পর্যন্তও পৌছে থাকে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের অন্তরে এ চিন্তা জাগ্রত করে দিন। নিজেদেরকে সংশোধন করার হিম্মত ও তাওফীক দান করুন। তাঁর পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
وَاخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00