📄 এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কুরআনে কারীমের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা না বোঝার কারণে মানুষদেরকে সতর্ক করেছেন। তিনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস ইরশাদ করেছেন, যার দ্বারা এ আয়াতের সঠিক অর্থের উপর আলোকপাত হয়।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, কতক লোক এ আয়াতের অর্থ এই বোঝে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন বলেছেন নিজের খবর নাও, নিজেকে সংশোধন করো, তাই এখন কেবল নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা করা আমাদের দায়িত্বে ওয়াজিব। অন্য কাউকে ভুল কাজ করতে দেখলে তাকে ধরা, তার সংশোধনের চিন্তা করা, আমাদের দায়িত্বে জরুরী নয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলেন, এ আয়াতের এ অর্থ নেওয়া ভুল। কারণ, মানুষ যদি কোনো জালেমকে অন্য কারো উপর জুলুম করতে দেখে, আর বাধা না দেয়, তাহলে এমতাবস্থায় এ ধরনের সকলের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে আযাব নাযিল করার আশঙ্কা রয়েছে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলছেন যে, এ হাদীস এ কথা বুঝায় যে, তোমাদের সামনে জালেম জুলুম করছে। মাজলুম মার খাচ্ছে। জালেমকে জুলুম থেকে প্রতিরোধ করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি তোমরা চিন্তা করো যে, সে জুলুম করলে, সে ভুল কাজ করলে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি তো জুলুম করছি না। এজন্য তার বিষয়ে আমার নাক গলানো উচিত না। তার থেকে আমার পৃথক থাকা উচিত। আর সে তার এই কর্মপদ্ধতির উপর এ আয়াত দিয়ে প্রমাণ পেশ করে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন নিজের সংশোধনের চিন্তা করো। অন্যে ভুল কাজ করলে তা তোমার ক্ষতি করবে না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলছেন, এই হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে, আয়াতটির এ অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এ নির্দেশও দিয়েছেন যে, তোমার মধ্যে জালেমকে জুলুম থেকে বাধা দেওয়ার শক্তি থাকলে অবশ্যই বাধা দিবে।
📄 আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা
এখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা কি? এ আয়াতে বলা হয়েছে, তুমি যদি নিজের সংশোধনের চিন্তা চেষ্টা করো তাহলে অন্যের ভুল পথে চলা তোমাকে ক্ষতি করবে না। এ কথার আসল উদ্দেশ্যে এই যে, এক ব্যক্তি নিজের শক্তি সামর্থ্য মতো আমর বিল মা'রূফের দায়িত্ব পালন করেছে এর পরেও অপর ব্যক্তি তার কথা মানছে না, তাহলে তার উপর এর কোনো দায় দায়িত্ব বর্তাবে না। তার ভুল কর্ম তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে না। এবার সে নিজের ফিকির করবে, নিজেকে সংশোধন করবে, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাকে পাকড়াও করা হবে না।
📄 সন্তানের সংশোধন কতক্ষণ পর্যন্ত করবে
যেমন সন্তানের ব্যাপারে নির্দেশ হলো, মা-বাবা যদি দেখে যে, সন্তান ভুল পথে চলছে তাহলে তাকে বাধা দেওয়া এবং ভুল পথ থেকে বাঁচানো তাদের দায়িত্ব। যেমন কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকেও আগুন থেকে বাঁচাও এবং নিজেদের পরিবার পরিজনকেও আগুন থেকে বাঁচাও।'
মা-বাবার দায়িত্বে এটা ফরয। কিন্তু এক ব্যক্তি তার যাবতীয় শক্তি ব্যয় করা সত্ত্বেও সন্তান মানলো না, তাহলে এমতাবস্থায় ইনশাআল্লাহ ঐ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার নিকট মায়ুর বলে গণ্য হবে। হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ছেলে শেষ পর্যন্ত ইসলাম কবুল করেনি। তিনি তাকে বুঝিয়েছেন, তাবলীগ করেছেন, দাওয়াত দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি তাবলীগের হক কে আদায় করতে পারে! কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে ইসলাম গ্রহণ করেনি। এখন এ বিষয়ে হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে ধরা হবে না।
এক ব্যক্তির বন্ধু ভুল পথে চলছে, অন্যায় কাজ করছে, সে তার সামর্থ্য মোতাবেক আদর-মহব্বত করে সার্বিকভাবে তাকে বুঝালো। বুঝাতে বুঝাতে ক্লান্ত হয়ে গেলো, কিন্তু ঐ বন্ধু অন্যায় কাজ থেকে ফিরে এলো না, তাহলে তার উপর এর দায়-দায়িত্ব বর্তাবে না।
টিকাঃ
১. সূরা তাহরীম, আয়াত-৬
📄 তোমরা নিজেকে নিজে ভুলে যেয়ো না
এরপর আল্লামা নববী রহ. একটি আয়াত উদ্ধৃত করেছেন,
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَ تَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتُبَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'তোমরা কি (অন্য) মানুষকে নেক কাজের হুকুম দাও আর নিজেদেরকে নিজেরা ভুলে যাও অথচ তোমরা কিতাবও তিলাওয়াত করো। তোমাদের কি এতোটুকু জ্ঞানও নেই।'
এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইহুদীদেরকে সম্বোধন করে বলেন যে, তোমরা অন্যদেরকে সৎকর্মের উপদেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হয়ে যাও অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো। অর্থাৎ, তোমরা তাওরাতের আলেম হওয়ার কারণে মানুষ তোমাদের শরণাপন্ন হয়। এ নির্দেশ যদিও ইহুদীদের জন্য ছিলো, কিন্তু মুসলিমদের জন্য তা আরো বেশী উপযুক্ত। যে ব্যক্তি অন্যকে নসীহত করছে তার উচিত আগে নিজের উপরে তা বাস্তবায়ন করা।
এ মাসআলা তো আমি আপনাদেরকে পূর্বে বলেছি যে, তাবলীগের বিষয়ে এ বিধান নেই যে, যে ব্যক্তি মন্দ কাজে লিপ্ত সে তাবলীগ করবে না, অন্যদেরকে উপদেশ দিবে না, বরং বিধান এই যে, উপদেশ দিবে কিন্তু উপদেশ দানের পর চিন্তা করবে যে, অন্যদেরকে যখন উপদেশ দিচ্ছি তখন নিজেও এর উপর আমল করি। নিজেকে ভুলে না যাই। এরূপ মনে করবে না যে, এ উপদেশ অন্যের জন্যে। বরং চিন্তা করবে যে, এ উপদেশ আমার জন্যেও। আমাকেও এর উপর আমল করতে হবে।
টিকাঃ
১. সূরা বাকারা, আয়াত-৪৪