📄 সমাজ সংস্কারের পন্থা
আমাদের সমস্যা এই যে, সংস্কারমূলক কাজে ব্যস্তপ্রায় সমস্ত দল, সংগঠন ও ব্যক্তির মস্তিষ্কে এ কথা থাকে যে, সব মানুষ খারাপ হয়ে গেছে, এদেরকে সংশোধন করতে হবে। নিজের খারাবির দিকে মনোযোগ থাকে না। নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা থাকে না। এজন্য এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
'হে ঈমানদারগণ! নিজের খবর নাও। তোমরা সঠিক পথে এলে বিপথগামীরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'
এজন্য আসর জমানো এবং নিছক আলোচনার উদ্দেশ্যে অন্যদের দোষ চর্চা করায় কোনো লাভ নেই। নিজের ফিকির করুন। যতো বেশি সম্ভব নিজেকে সংশোধন করুন। বাস্তবে সমাজ সংস্কারের পন্থা এটাই। সমাজ কিসের নাম? আমার, আপনার ও অন্যান্য ব্যক্তির সমষ্টির নাম সমাজ। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি যদি নিজের সংশোধনের চিন্তা করে যে, আমি ঠিক হয়ে যাই তাহলে ক্রমান্বয়ে পুরো সমাজ ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি ব্যাপার এরকম দাঁড়ায় যে, আমি আপনার সমালোচনা করবো, আর আপনি আমার সমালোচনা করবেন, আমি আপনার দোষ বর্ণনা করবো, আর আপনি আমার দোষ বর্ণনা করবেন, এভাবে তো সমাজের অবস্থা কখনোই শোধরাবে না। বরং নিজেকে নিয়ে চিন্তা করুন। আপনি দেখছেন সারা দুনিয়ার লোক মিথ্যা বলছে, কিন্তু আপনি মিথ্যা বোলবেন না। অন্য লোক ঘুষ নিচ্ছে, আপনি নিবেন না। অন্যে সুদ খাচ্ছে, আপনি খাবেন না। মানুষ ধোঁকা দিচ্ছে, আপনি দিবেন না। অন্যে হারাম খাচ্ছে, আপনি খাবেন না। এর তো কোনো অর্থ নেই যে, লোক সমাবেশে বসে বলছে যে, মানুষ মিথ্যা বলছে; তারপর নিজেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিথ্যা বলে যাচ্ছে। এটা সঠিক পদ্ধতি নয়। আল্লাহ তা'আলা নিজ দয়ায় আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা জাগ্রত করে দিন।
টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, আয়াত-১০৫
📄 নিজের দায়িত্ব পালন করুন
তবে এখানে এ বিষয়টি বোঝা জরুরী যে, যেখানে নেক কাজের কথা বলা জরুরী, সেখানে নেক কাজের কথা বলা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করা নিজের সংশোধনের জন্য অপরিহার্য। এছাড়া তাকে সঠিক পথের অনুসারী বলা হবে না। এতদভিন্ন নিজের সংশোধনের দায়িত্বও পূর্ণ হবে না। এ কথাই হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. একটি হাদীসে স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন,
عَنْ أَبِي بَكْرِ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُتُرُكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَوْا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَوْ شَكَ أَنْ يَعْتَهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِ مِنْهُ.
'হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলেন, হে লোক সকল! তোমরা এই আয়াত পাঠ করো (يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُتُرُكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ হে) ঈমানদারগণ! নিজের খবর নাও। তোমরা সঠিক পথে এলে বিপথগামীরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।) অথচ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন জালেমকে জুলুম করতে দেখেও তাকে বাধা দিবে না, তখন অতি সত্বর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ব্যাপক আযাবে আক্রান্ত করবেন।''
টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত-১০৫
২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৯৪, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৭৭৫, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৯৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ০১
📄 এ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. কুরআনে কারীমের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা না বোঝার কারণে মানুষদেরকে সতর্ক করেছেন। তিনি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদীস ইরশাদ করেছেন, যার দ্বারা এ আয়াতের সঠিক অর্থের উপর আলোকপাত হয়।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, কতক লোক এ আয়াতের অর্থ এই বোঝে যে, আল্লাহ তা'আলা যখন বলেছেন নিজের খবর নাও, নিজেকে সংশোধন করো, তাই এখন কেবল নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা করা আমাদের দায়িত্বে ওয়াজিব। অন্য কাউকে ভুল কাজ করতে দেখলে তাকে ধরা, তার সংশোধনের চিন্তা করা, আমাদের দায়িত্বে জরুরী নয়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলেন, এ আয়াতের এ অর্থ নেওয়া ভুল। কারণ, মানুষ যদি কোনো জালেমকে অন্য কারো উপর জুলুম করতে দেখে, আর বাধা না দেয়, তাহলে এমতাবস্থায় এ ধরনের সকলের উপর আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে আযাব নাযিল করার আশঙ্কা রয়েছে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলছেন যে, এ হাদীস এ কথা বুঝায় যে, তোমাদের সামনে জালেম জুলুম করছে। মাজলুম মার খাচ্ছে। জালেমকে জুলুম থেকে প্রতিরোধ করার শক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি তোমরা চিন্তা করো যে, সে জুলুম করলে, সে ভুল কাজ করলে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি তো জুলুম করছি না। এজন্য তার বিষয়ে আমার নাক গলানো উচিত না। তার থেকে আমার পৃথক থাকা উচিত। আর সে তার এই কর্মপদ্ধতির উপর এ আয়াত দিয়ে প্রমাণ পেশ করে যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন নিজের সংশোধনের চিন্তা করো। অন্যে ভুল কাজ করলে তা তোমার ক্ষতি করবে না। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলছেন, এই হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে, আয়াতটির এ অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে ভুল। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এ নির্দেশও দিয়েছেন যে, তোমার মধ্যে জালেমকে জুলুম থেকে বাধা দেওয়ার শক্তি থাকলে অবশ্যই বাধা দিবে।
📄 আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা
এখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা কি? এ আয়াতে বলা হয়েছে, তুমি যদি নিজের সংশোধনের চিন্তা চেষ্টা করো তাহলে অন্যের ভুল পথে চলা তোমাকে ক্ষতি করবে না। এ কথার আসল উদ্দেশ্যে এই যে, এক ব্যক্তি নিজের শক্তি সামর্থ্য মতো আমর বিল মা'রূফের দায়িত্ব পালন করেছে এর পরেও অপর ব্যক্তি তার কথা মানছে না, তাহলে তার উপর এর কোনো দায় দায়িত্ব বর্তাবে না। তার ভুল কর্ম তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে না। এবার সে নিজের ফিকির করবে, নিজেকে সংশোধন করবে, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাকে পাকড়াও করা হবে না।