📄 শাবানের ৩০ তারিখে নফল রোযা রাখা
শাবানের ৩০ তারিখে রোযা না রাখার নির্দেশ রয়েছে। কেউ কেউ এই ধারণার বশবর্তী হয়ে রোযা রাখে যে, হতে পারে আজ রমাযানের ১ম দিন। সম্ভাবনা আছে রোযার চাঁদ উঠেছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাইনি। এরজন্য মানুষ সতর্কতা স্বরূপ শাবানের ৩০ তারিখে রোযা রাখে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্কতা স্বরূপ শাবানের ৩০ তারিখে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। এ রোযা না রাখার হুকুম শুধুমাত্র তার জন্য, যে রমাযান মনে করে সতর্কতা হিসাবে রোযা রাখছে। কিন্তু যে ব্যক্তি সাধারণভাবে নফল রোযা রেখে আসছে, সে যদি শাবানের ৩০ তারিখেও রোযা রাখে এবং রমাযানের সম্ভাবনার কারণে সতর্কতার নিয়ত না থাকে, অন্তরে এ চিন্তা না জাগে, তাহলে তার জন্য রোযা রাখা জায়েয।'
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. শাবানের ৩০ তারিখে নিজে রোযা রাখতেন এবং পুরো শহরে ঘোষণা করতেন যে, আজ যেন কেউ রোযা না রাখে। কারণ, সাধারণ মানুষের ব্যাপারে আশঙ্কা ছিলো যে, তারা এ দিনে রোযা রাখলে সম্ভাব্য রমাযানের সতর্কতার চিন্তা তাদের অন্তরে জাগবে। ফলে রোযা রাখা গোনাহের কাজ হবে। এজন্য কঠোরভাবে নিষেধ করতেন।
টিকাঃ
১. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬২২, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৮৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৩৫, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ২১৫৯, সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ১৬২০
📄 হযরত থানভী রহ.-এর সতর্কতা
হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.- আমরা আপনারা যাঁর নাম নিয়ে থাকি- আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর পদাঙ্কানুসরণ করার তাওফীক দান করুন। মানুষকে ফতওয়া দেওয়ার ব্যাপারে সবসময় তিনি সহজ করার চিন্তা করতেন। যাতে মানুষের জন্য কঠিন হয়ে না পড়ে। যথাসম্ভব সহজ করতেন। আপনারা হয়তো জানেন যে, বর্তমানে গাছে ফল আসার পূর্বেই পুরো ফসল বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফল আসার পূর্বে এভাবে বিক্রি করা জায়েয নেই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফল প্রকাশ না পাওয়া (ব্যবহারোপযোগী না হওয়া) পর্যন্ত বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। শরীয়তের এই বিধানের কারণে কতক আলেম • ফতওয়া দিয়েছেন যে, বাজারে যেসব ফল বিক্রি হয় সেগুলো এই নিষিদ্ধ পন্থায় বেচা-কেনা হওয়ার কারণে তা ক্রয় করে খাওয়া জায়েয নেই। কিন্তু হযরত থানভী রহ. বলেন যে, এসব ফল খাওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে নিজে সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সারাটা জীবন বাজার থেকে ফল কিনে খাননি। কিন্তু অন্যদেরকে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এরা ছিলেন আল্লাহর প্রকৃত বান্দা। অন্যদেরকে যে বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন তারচে' বেশি নিজেরা সে বিষয়ে আমল করেছেন। ফলে তাদের কথায় প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে।
📄 সমাজ সংস্কারের পন্থা
আমাদের সমস্যা এই যে, সংস্কারমূলক কাজে ব্যস্তপ্রায় সমস্ত দল, সংগঠন ও ব্যক্তির মস্তিষ্কে এ কথা থাকে যে, সব মানুষ খারাপ হয়ে গেছে, এদেরকে সংশোধন করতে হবে। নিজের খারাবির দিকে মনোযোগ থাকে না। নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা থাকে না। এজন্য এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
'হে ঈমানদারগণ! নিজের খবর নাও। তোমরা সঠিক পথে এলে বিপথগামীরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।'
এজন্য আসর জমানো এবং নিছক আলোচনার উদ্দেশ্যে অন্যদের দোষ চর্চা করায় কোনো লাভ নেই। নিজের ফিকির করুন। যতো বেশি সম্ভব নিজেকে সংশোধন করুন। বাস্তবে সমাজ সংস্কারের পন্থা এটাই। সমাজ কিসের নাম? আমার, আপনার ও অন্যান্য ব্যক্তির সমষ্টির নাম সমাজ। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি যদি নিজের সংশোধনের চিন্তা করে যে, আমি ঠিক হয়ে যাই তাহলে ক্রমান্বয়ে পুরো সমাজ ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি ব্যাপার এরকম দাঁড়ায় যে, আমি আপনার সমালোচনা করবো, আর আপনি আমার সমালোচনা করবেন, আমি আপনার দোষ বর্ণনা করবো, আর আপনি আমার দোষ বর্ণনা করবেন, এভাবে তো সমাজের অবস্থা কখনোই শোধরাবে না। বরং নিজেকে নিয়ে চিন্তা করুন। আপনি দেখছেন সারা দুনিয়ার লোক মিথ্যা বলছে, কিন্তু আপনি মিথ্যা বোলবেন না। অন্য লোক ঘুষ নিচ্ছে, আপনি নিবেন না। অন্যে সুদ খাচ্ছে, আপনি খাবেন না। মানুষ ধোঁকা দিচ্ছে, আপনি দিবেন না। অন্যে হারাম খাচ্ছে, আপনি খাবেন না। এর তো কোনো অর্থ নেই যে, লোক সমাবেশে বসে বলছে যে, মানুষ মিথ্যা বলছে; তারপর নিজেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিথ্যা বলে যাচ্ছে। এটা সঠিক পদ্ধতি নয়। আল্লাহ তা'আলা নিজ দয়ায় আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে নিজেকে সংশোধন করার চিন্তা জাগ্রত করে দিন।
টিকাঃ
১. সুরা মায়েদা, আয়াত-১০৫
📄 নিজের দায়িত্ব পালন করুন
তবে এখানে এ বিষয়টি বোঝা জরুরী যে, যেখানে নেক কাজের কথা বলা জরুরী, সেখানে নেক কাজের কথা বলা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করা নিজের সংশোধনের জন্য অপরিহার্য। এছাড়া তাকে সঠিক পথের অনুসারী বলা হবে না। এতদভিন্ন নিজের সংশোধনের দায়িত্বও পূর্ণ হবে না। এ কথাই হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. একটি হাদীসে স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছেন,
عَنْ أَبِي بَكْرِ الصِّدِّيقِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَقْرَءُونَ هَذِهِ الْآيَةَ: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُتُرُكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ
وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَوْا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ أَوْ شَكَ أَنْ يَعْتَهُمُ اللَّهُ بِعِقَابِ مِنْهُ.
'হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলেন, হে লোক সকল! তোমরা এই আয়াত পাঠ করো (يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُتُرُكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ হে) ঈমানদারগণ! নিজের খবর নাও। তোমরা সঠিক পথে এলে বিপথগামীরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।) অথচ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন জালেমকে জুলুম করতে দেখেও তাকে বাধা দিবে না, তখন অতি সত্বর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ব্যাপক আযাবে আক্রান্ত করবেন।''
টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত-১০৫
২. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৯৪, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৭৭৫, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৯৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ০১