📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ বিপ্লব ঘটিয়েছে। মাত্র তেইশ বছর সময়ে পুরো আরব উপদ্বীপের রূপ পাল্টে দিয়েছে। বরং সমগ্র পৃথিবীর চেহারার পরিবর্তন সাধন করেছে। এই বিপ্লব এজন্য ঘটেছে যে, তিনি উম্মতকে যে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, প্রথমে নিজে তার উপর সর্বাধিক আমল করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আমাদেরকে তিনি হুকুম দিয়েছেন প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ো, অথচ তিনি নিজে প্রতিদিন আট ওয়াক্ত নামায পড়তেন। অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায ছাড়া ইশরাক, চাশ্ত ও তাহাজ্জুদও পড়তেন। বরং তাঁর অবস্থা তো এই ছিলো যে,
إِذَا حَزَبَهُ أَمْرٌ صَلَّى
অর্থাৎ, যখন তাঁর কোনো পেরেশানী দেখা দিতো, সাথে সাথে নামাযের জন্য দাঁড়াতেন এবং আল্লাহমুখী হয়ে দু'আ করতেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
جُعِلَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ
'আমার চোখের শীতলতা নামাযের মধ্যে।২
টিকাঃ
১. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১১২৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৭০
২. সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩৮৭৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১১৮৪৫
📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযা
এমনিভাবে অন্যদেরকে সারা বছরে শুধুমাত্র রমাযানের এক মাস রোযা রাখার হুকুম দিয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজে বছরের প্রতি মাসে কমপক্ষে তিন দিন রোযা রাখতেন। কতক সময় তিন দিনের অধিকও রাখতেন। অন্যদেরকে তো হুকুম দিচ্ছেন যে, ইফতারের সময় হলে অবিলম্বে ইফতার করবে। দুই রোযা একত্র করাকে নাজায়েয সাব্যস্ত করেছেন। এভাবে রোযা রাখাকে 'সওমে বেসাল' বলা হয়।
📄 ‘সওমে বেসালে’র নিষেধাজ্ঞা
কতিপয় সাহাবীকে তিনি দেখলেন, তারা দুই রোযাকে মিলিয়ে 'সওমে বেসাল' রাখে। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিষেধ করে বললেন, তোমাদের জন্য এভাবে মিলিয়ে রোযা রাখা জায়েয নেই, হারাম। কিন্তু তিনি নিজে 'সওমে বেসাল' রাখতেন এবং বলতেন, তোমরা নিজেদেরকে আমার সাথে তুলনা করো না। কারণ, আমার প্রভু আমারে পানাহার করান। অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে এভাবে রোযা রাখার শক্তি নেই, আমার মধ্যে আছে, এজন্য আমি রাখি। অন্যদের জন্য সহজ ও সুবিধাজনক পথ বলে দিয়েছেন যে, ইফতারের সময় খুব পানাহার করো। সারারাত খাওয়ার অনুমতি রয়েছে।'
টিকাঃ
১. সহীহ বোখারী, হাদীস নং ১৮২৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪৬, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৪৫২২, মুয়াত্তায়ে মালেক, হাদীস নং ৫৯১, সুনানে দারেমী, হাদীস নং ১৬৪১
📄 হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাকাত
আমাদেরকে তো তিনি হুকুম দিয়েছেন যে, নিজের সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তাহলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর নিজের অবস্থা এই ছিলো যে, যতো সম্পদ আসতো সব দান করে দিতেন। একবার তিনি নামায পড়ানোর জন্য জায়নামাযের উপরে দাঁড়ালেন। একামত হলো। নামায আরম্ভ হবে। এমন সময় হঠাৎ তিনি জায়নামায থেকে সরে গিয়ে ঘরের মধ্যে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। অল্প সময় পর ফিরে আসলেন। নামায পড়ালেন। সাহাবায়ে কেরام অবাক হলেন। নামাযের পর সাহাবায়ে কেরام হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনি এমন কাজ করেছেন ইতিপূর্বে যা কখনো করেননি, এর কারণ কি? সরকারে দো 'আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, যখন আমি জায়নামাযে দাঁড়ালাম তখন আমার স্মরণ হলো, আমার ঘরে সাতটি দিনার রয়েছে। আমার লজ্জা হলো যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর সামনে এমতাবস্থায় হাজির হবে, যখন তাঁর ঘরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাতটি দিনার রয়েছে। তাই আমি সেগুলোকে যথাস্থানে কাজে লাগিয়ে তারপর এসে নামায পড়ালাম।'
টিকাঃ
১. সীরাত গ্রন্থসমূহে সাত দিনার সম্পর্কে দুটি ঘটনা পাওয়া যায়। একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন হযরত উম্মে সালামা রাযি.। তিনি বলেন, একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তাশরীফ আনলেন। তাঁর নিকট সাতটি দিনার ছিলো। তিনি সেগুলো বিছানার নীচে রাখলেন। তারপর বাহিরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন। তাঁর পবিত্র চেহারার রং ছিলো পরিবর্তিত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! কি ব্যাপার! আপনি ভালো আছেন তো? তিনি বললেন, ঐ দিনারগুলো আমাকে অস্থির করে রেখেছে, যেগুলো সকালে আমার কাছে এসেছে। বিকাল হয়ে গেলো এখনো সেগুলো আমার কাছে রয়ে গেছে। সেগুলো আমি ব্যয় করিনি। এসব দিনার আমার কাছে রয়ে যাওয়া আমাকে পেরেশান করেছে। (তাহযীবুল আসার, তবারী কৃত, হাদীস নং ২৪৭৮, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-৪৬২) দ্বিতীয় ঘটনাটি হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, যার মধ্যে অন্তিম রোগে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কাছে থাকা সাতটি দিনার দান করার জন্য তাঁকে হুকুম দিয়েছিলেন। (আততারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং ১৩৭, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২৯, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৭১৬, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৪২৪, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১২৪।