📄 সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি
সাহাবায়ে কেরামের দিকে তাকালে দেখতে পাবেন যে, তাঁদের প্রত্যেকে এই চিন্তায় মগ্ন যে, কীভাবে আমি ঠিক হতে পারি? কীভাবে আমার ব্যাধি দূর করতে পারি? হযরত হানযালা রাযি. একজন বিখ্যাত সাহাবী। তিনি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে আসতেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে অবস্থান করে এবং তাঁর কথাবার্তা শুনে অন্তরে কী ধরনের প্রভাব সৃষ্টি হতো, আত্মা কেমন বিগলিত হতো, কেমন আবেগ-অনুভূতি সৃষ্টি হতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিন তিনি অস্থির চিত্তে চিৎকার করতে করতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলেন এবং নিবেদন করলেন,
نَافَقَ حَنْظَلَةُ ، يَا رَسُولَ اللَّهِ
'হে আল্লাহর রাসূল! হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে।”
হযরত হানযালা রাযি. নিজের সম্পর্কে বলছেন যে, আমি মুনাফিক হয়ে গেছি। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে মুনাফিক হলে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার মজলিসে বসা থাকি, আপনার কথাবার্তা শুনি, অন্তরে গভীর প্রভাব সৃষ্টি হয় এবং অবস্থা সংশোধনের দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। কিন্তু যখন বাইরে চলে যাই এবং দুনিয়ার কাজে মগ্ন হই, তখন আপনার মজলিসে বসে যে আবেগ-অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিলো তা লোপ পেয়ে যায়। এটা তো মুনাফিকের কাজ যে, বাইরের অবস্থা থাকবে এক রকম, আর ভিতরের অবস্থা থাকবে অন্য রকম। এ জন্য আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, আমি মুনাফিক হয়ে যাইনি তো!
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, হানযালা! তুমি মুনাফিক হওনি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অবস্থা হয়ে থাকে। সবসময় মনের অবস্থা এক রকম থাকে না। কখনো আবেগ-অনুভূতি বেশি হয়, আর কখনো কম হয়। এর দ্বারা এ কথা মনে করা যে, আমি মুনাফিক হয়ে গেছি, এটা ঠিক নয়।
হযরত হানযালা রাযি.-এর অন্তরে নিজের সম্পর্কে তো চিন্তা জেগেছে যে, আমি মুনাফিক হয়ে গেছি, কিন্তু তিনি অন্য কাউকে মুনাফিক বলেননি। আত্মসমালোচনা করে নিজেকে নিজে মুনাফিক চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়েছেন। নিজের চিন্তা করেছেন যে, আমার মধ্যে মুনাফিকি নেই তো?
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৯৩৭, সুনানে তিরমিযী, হাদসী নং ২৪৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪২২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৬৯৪৯
📄 হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-এর বৈশিষ্ট্য
হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের অনেক রহস্যের কথা বলেছিলেন। তাঁকেই গোপনে মুনাফিকদের পুরো তালিকা বলেছিলেন যে, মদীনা শরীফের অমুক অমুক ব্যক্তি মুনাফিক। এতো আস্থাপূর্ণভাবে বলেছিলেন যে, মদীনা শরীফে কারো মৃত্যু হলে সাহাবায়ে কেরাম লক্ষ করতেন যে, এর জানাযার নামাযে হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি. অংশ নিয়েছেন কি না। যদি হযরত হুযাইফা রাযি. অংশ নিতেন তাহলে এটা আলামত ছিলো যে, এ ব্যক্তি মুমিন। আর যদি তিনি ঐ জানাযায় অংশ না নিতেন তাহলে সাহাবায়ে কেরام অনুমান করতেন যে, হয় তো এ ব্যক্তি মুনাফিক। যদি মুমিন হতো তাহলে হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি. তার জানাযার নামাযে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতেন।
📄 দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর নিজের সম্পর্কের মুনাফেকির আশঙ্কা
হাদীসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, হযরত ওমর ফারুক রাযি. খলীফা হয়েছেন। দুনিয়ার বেশি অর্ধেকের উপর তাঁর রাজত্ব চলছে। প্রসিদ্ধ আছে যে, সবসময় তিনি মানুষের সংশোধনের জন্যে ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন। এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত, এমতাবস্থায় তিনি হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযি.-কে তোষামোদ করে বলছেন যে, হে হুযাইফা! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলো, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে মুনাফিকদের যেই তালিকা বলেছেন তার মধ্যে খাত্তাবের পুত্র ওমরের নাম নেই তো? হযরত ওমর ফারুক রাযি.-এর অন্তরে চিন্তা জাগছে যে, এ তালিকায় আমার নাম নেই তো? আমি তো মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত নই?'
টিকাঃ
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৯
📄 আত্মা থেকে বের হওয়া কথায় প্রভাব হয়ে থাকে
সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা এই ছিলো যে, তাঁদের প্রত্যেকের সবসময় চিন্তা ছিলো যে, আমার কোনো কাজ, আমার কোনো কর্ম, আমার কোনে কথা, আমার কোনো ভঙ্গি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুমের পরিপন্থী নয় তো? এই চিন্তা নিয়ে যখন তাঁরা অন্য কাউকে সংশোধনের কোনো কথা বলতেন, তা মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করতো। এর ফলে জীবনের পরিবর্তন সাধিত হতো। বিপ্লব ঘটতো। বিপ্লব ঘটিয়ে তাঁরা জগতবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন। আল্লামা ইবনে জাউযী রহ. বিখ্যাত বক্তা ছিলেন। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, তাঁর একেক ওয়াযে নয়-নয়শ' মানুষ তাঁর হায়ে গোনাহ থেকে তাওবা করেছে। ওয়ায করেছেন, আর মানুষের মন কেরে নিয়েছেন। তাঁর বক্তৃতা খুব আবেগ উদ্দীপ্ত ছিলো না। তাঁর বক্তব্য সাহিত্য অলংকারপূর্ণ ছিলো না। আসল বিষয় এই ছিলো যে, মন থেকে উত্থি আবেগ যখন মুখে চলে আসে, তখন তা অন্যদের অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি করে।