📄 সমাজ সংস্কারের চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে কেন?
প্রথমে সে প্রশ্নটি তুলে ধরছি, তাহলে আয়াতটির অর্থ ভালোভাবে বুঝে আসবে। অনেক সময় আমাদের অন্তরে প্রশ্ন জাগে যে, আমরা সমাজ সংস্কার ও অবস্থার উন্নতির জন্য সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন দিক থেকে এবং বিভিন্ন কোণ থেকে অনেক চেষ্টা হতে দেখছি। অনেক সংগঠন, অনেক দল, অনেক জামাত, অনেক ব্যক্তি, অনেক জলসা, অনেক সমাবেশ ও অনেক সম্মেলন হতে দেখছি। বাহ্যিকভাবে সবগুলোর উদ্দেশ্য সমাজে বিস্তৃত দুরাচারসমূহ বন্ধ করা। সমাজকে সঠিক পথে নিয়ে আসা। মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানানোর চিন্তা-চেষ্টা করা। সবার লক্ষ্য ও উদ্দশ্য অবস্থার সংশোধন, সমাজ সংস্কার, উন্নতি ও সফলতা ইত্যাদি বড়ো বড়ো বিষয়। বড়ো বড়ো দাবীও করা হয়ে থাকে। যে সমস্ত দল, সংগঠন ও ব্যক্তি এ কাজে ব্যস্ত, তাদের সংখ্যা হাজার হাজার হবে। হাজার হাজার দল, হাজার হাজার ব্যক্তি এ কাজ করছে।
অপরদিকে বাজার, অফিস এবং ব্যস্ত ও জাগ্রত জীবন কাছে থেকে দেখার সুযোগ হলে অনুভূত হয় যে, সব প্রচেষ্টার বিপরীতে মন্দ কাজের ঢল চলছে। সংস্কার প্রচেষ্টার উল্লেযোগ্য কোনো প্রভাব সমাজের উপর দৃষ্টিগোচর হয় না। বরং মনে হয় যে, জীবনের চাকা একইভাবে ভুল পথে ঘুরে চলছে। উন্নতি হলে মন্দ কাজে হচ্ছে, ভালোর দিকে হচ্ছে না। তাই প্রশ্ন জাগে যে, এতো সব চেষ্টা সমাজ পরিবর্তনে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? দুই-একটি দৃষ্টান্ত অবশ্য এর ব্যতিক্রম রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের প্রতি দৃষ্টি দিলে উল্লেযোগ্য কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। এর কারণ কী?
📄 রোগ নির্ণয়
আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে এই প্রশ্নের উত্তরও দান করেছেন এবং আমাদের একটি রোগও নির্ণয় করেছেন। এটি এমন একটি আয়াত, যা বেশিরভাগ সময় আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। এর অর্থও আমাদের জানা থাকে না এবং এর মর্মও আমাদের সামনে থাকে না।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا ٱهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
📄 নিজের অবস্থা সম্পর্কে গাফেল, আর অন্যদের চিন্তায় মগ্ন
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেরা নিজেদের খবর নাও, তোমরা যদি সঠিক পথে চলে আসো (তোমরা যদি হেদায়েত লাভ করে সঠিক পথ অবলম্বন করো) তাহলে যেসব লোক পথভ্রষ্ট রয়েছে তাদের এই ভ্রষ্টতা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তোমাদের সকলকে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। সেখানে আল্লাহ তোমাদেরকে বলবেন, তোমরা দুনিয়াতে কি করেছো?'
আল্লাহ তা'আলা এ আয়াてে আমাদের অত্যন্ত মৌলিক একটি ব্যাধির কথা বলেছেন যে, সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার একটি বড়ো কারণ হলো, যে ব্যক্তিই সংস্কারের পতাকা নিয়ে দাঁড়ায়, তারই কামনা থাকে অন্য ব্যক্তি নিজেকে সংশোধন ও সংস্কার করতে আরম্ভ করুক। আর যে ব্যক্তি অন্যদেরকে আহ্বান করছে, দাওয়াত দিচ্ছে, ইসলাহের পয়গাম দিচ্ছে, সে নিজের ব্যাপারে উদাসীন এবং নিজের অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে গাফেল।
আমরা সবাই একটু চিন্তা করে দেখি, বিভিন্ন সমাবেশে, বিভিন্ন সভায় আমরা খুব মজা নিয়ে সমাজের মন্দ দিকসমূহের আলোচনা করি আর বলি যে, 'সব মানুষ এই কাজ করছে' 'মানুষের অবস্থা এই', 'সমাজের অবস্থা এতো খারাপ হয়ে গেছে', 'আমি অমুককে দেখেছি সে এই কাজ করছিলো'। এই বিকৃত সমাজে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো অন্যের উপর আপত্তি করা, অন্যের সমালোচনা করা, অন্যের দোষ বর্ণনা করা যে, মানুষ এই করছে, সমাজের মধ্যে এই হচ্ছে ইত্যাদি। আমাদের খুব কম বৈঠকই এবং খুব কম সমাবেশই এসবের আলোচনা থেকে মুক্ত থাকে। কিন্তু কখনো নিজের দিকে তাকিয়ে দেখার তাওফীক হয় না যে, আমি নিজে কতো নষ্ট হয়ে গেছি। আমার নিজের অবস্থা কতো খারাপ হয়ে গেছে। আমার নিজের কর্মপদ্ধতি কতো ভুল। এর কি পরিমাণ সংশোধন প্রয়োজন! শুধু অন্যের সমালোচনার ধারা অব্যাহত থাকে। অন্যের দোষের অনুসন্ধান চলতে থাকে। এর ফল এই হয় যে, সমস্ত আলোচনা কথার ফুলঝুড়ি ফুটানো, আসর জমানো এবং স্বাদ গ্রহণের জন্য হয়ে থাকে। ফলে সংশোধনের দিকে কোনো পদক্ষেপ অগ্রসর হয় না।
টিকাঃ
১. সূরা মায়েদা, আয়াত-১০৫
📄 সর্বাধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি
একটি হাদীসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কি অপূর্ব তার এ বাণী! আমাদের সকলের তা মুখস্থ রাখা উচিত। তিনি বলেন,
إِذَا قَالَ الرَّجُلُ هَلَكَ النَّاسُ فَهُوَ أَهْلَكُهُمْ
যে ব্যক্তি বলে যে, সারা দুনিয়ার মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে (অর্থাৎ অন্যদের উপর আপত্তি করে যে, মানুষ বিগড়ে গেছে, তাদের মধ্যে বদদ্বীনী ছেয়ে গেছে, তাদের মধ্যে বিপথগামিতা চলে এসেছে, তারা মন্দ কাজে লিপ্ত হচ্ছে) সে ব্যক্তি নিজেই সবচে' বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত।” কারণ এই যে, সে অন্যদের উপর আপত্তি উত্থাপনের জন্য বলছে যে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। বাস্তবেই যদি তার ধ্বংস নিয়ে চিন্তা থাকত তাহলে আগে নিজের সম্পর্কে চিন্তা করতো এবং নিজের সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতো।
টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৭৫৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৩১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস মুয়াত্তায়ে মালেক, হাদীস নং ১৫৫৯